উপহার দিয়ে কেনার চেষ্টা! কর্নাটকের ঘটনা সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলছে

Freedom of Press: কর্নাটকের ঘটনা সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলল নতুন করে।

Ramen Das
৮ মিনিট
উপহার দিয়ে কেনার চেষ্টা! কর্নাটকের ঘটনা সাংবাদিকের স্বাধীনতা নিয়ে যে প্রশ্ন তুলছে

চামচ চোর সাংবাদিক! ২০১৭ সালে এ-রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লন্ডন সফরে রুপোর চামচ চুরি করে মুখ পুড়িয়েছিলেন বঙ্গের এক বিখ্যাত সাংবাদিক! শাসক দল-সরকার, সরকারি আমলাদের সঙ্গে বরাবর ভালো সম্পর্কে লিপ্ত থাকা এক শ্রেণির সাংবাদিকের ভূমিকা নিয়ে সেবারও সমালোচনা হয়েছিল বিস্তর। কিন্তু এবার আর সাংবাদিকের চামচ চুরি কাণ্ড নয়, উল্টে তাঁদের মনচুরির উদ্যোগে তোলপাড় দেশ!

কী ঘটেছে

দীপাবলির উপহার ইস্যুতে বিপাকে পড়েছে কর্নাটক সরকার। অভিযোগ, সে-রাজ্যের একাধিক সাংবাদিককে দীপাবলির মিষ্টির বাক্সে টাকা পাঠিয়েছে সরকার! খোদ মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকে সাংবাদিকদের জন্য গিয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকার বান্ডিল! আর এখানেই উঠেছে প্রশ্ন। বিজেপি শাসিত সরকারের বিরুদ্ধে চুরি-চুরি খেলার এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগে সরগরম হয়েছে দেশ। কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী বাসবরাজ বোম্মাইয়ের দফতরের নামে উঠেছে অভিযোগ। দাবি, মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য মিডিয়া-উপদেষ্টা শঙ্কর পাগোজি নাকি দীপাবলির শুভেচ্ছা-বাক্সে লক্ষাধিক টাকা পাঠিয়েছেন একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রধান রিপোর্টারদের।

'টাকা উপহার-দুর্নীতি'

এখানেই প্রশ্ন তুলেছে কংগ্রেস। রাজ্য পুলিশের লোকায়ুক্তে অভিযোগ দায়ের করেছে 'জনাধিকার সংঘর্ষ পরিষদ' নামে একটি সংগঠন। সমালোচনার মুখে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী বোম্মাই। উপযুক্ত তদন্তের দাবি জানিয়েছে বিজেপি-ও। রাজ্যজুড়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে কর্নাটক কংগ্রেস। উঠেছে দুর্নীতির অভিযোগও‌‌।

'সাংবাদিক ক্রয়'-এর ইতিহাস

এই সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যম কেনার ঘটনা কি প্রথম? না কি বারবার শাসকের বিরুদ্ধাচরণ আর চুপ করিয়ে দেওয়ার প্রথম কৌশল হিসেবে সাধিত হয়েছে উপহার-টোপ! আর এই উদ্যোগ বিফলে গেলেই নেমে এসেছে আঘাত। নড়বড়ে হয়েছে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ! সমগ্র বিশ্বের আঙ্গিকে এই দেশ, এই রাজ্যেও এমন উদাহরণ রয়েছে বারবার।

যেখানে পক্ষে বলা এবং শাসকের ভালোর প্রকাশের দোলাচলে ব্যতিব্যস্ত সংবাদমাধ্যমের অবস্থা ছিল সূচনাপর্ব থেকে করুণ। যে আঙিনায় বারবার দাবার ঘুঁটি হয়েছেন সাংবাদিকরা। যেখানে কিছুলোক নীতি বাঁচানোর তাগিদে বিরোধ করে গিয়েছেন জেলে। অভিযোগ উঠেছে অযথা অত্যাচারের। আবার কেউ কেউ ইচ্ছা করেই পুরস্কার আর পদের লোভে পা বাড়িয়েছেন শাসক-বাজারে পণ্য হয়েছেন।

আর যে প্রশ্ন আজ কর্নাটক সরকারের তরফে মিষ্টির বাক্সে টাকা পাঠানোর অভিযোগে উঠছে, তা কেন সংবাদমাধ্যমের জন্য চিরন্তন। কেন, কিনে নেওয়া আর নিজের করে নেওয়ায় আসলে যুগে যুগে কাঠিন্য পেয়েছে? যেখানে আমার অর্থাৎ শাসকের মনঃপুত না হলেই, শাসকের উপহারের ফাঁদে পা না দিলেই নেমে এসেছে আঘাত। যদিও এর ইতিহাস ভারতের স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী আমল থেকেই বিস্তৃত। ঠিক কেমন ছিল সেই পরিস্থিতি?

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী অবস্থান

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হু হু করে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা! গাফিলতি কার, গুজরাতে ঠিক কীভাবে ঘটল এত বড় দুর্ঘটনা

Gujrat Bridge Accident: ভোটমুখী গুজরাতে এহেন ঘটনা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি-কে একটি বড় ধাক্কা দেবে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত। সবেমাত্র পলাশির যুদ্ধের আবহ শেষে ১৭৮০ সাল নাগাদ শুরু হল 'বেঙ্গল গেজেট'। কিন্তু শুরুর সময় থেকেই চাপ বাড়ল এর ওপরেও। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি-র বিরুদ্ধাচরণ করতেই কোপ পড়ল দেশের প্রথম সর্বজনীন সংবাদপত্রের ওপরে।

১৭৯৯ সাল। রিচার্ড ওয়েলেসলি-র তত্ত্বাবধানে পাশ হলো সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ-সংক্রান্ত আইন। মুঘল-যুগের স্বল্প ক্ষত ফিরিয়ে ফের শাসকের বিরুদ্ধে গেলেই নামল কোপ!

১৮২৩। গভর্নর জন অ্যাডামসের হাত ধরে এবার ভারতীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রে লাগল বিধিনিষেধ। রামমোহন রায়দের বিরোধেও অনড় থাকল ব্রিটিশ সরকার।

১৮৩৫ এর প্রেস আইনের (Press Act) ছত্রে ছত্রেও ছিল সেই নিষেধের কথায়। ১৮৫৭ সালে লর্ড ক্যানিং এঁর সাহায্যার্থে আরও কঠিন হলো সংবাদমাধ্যমের চলার পথ। শুরু থেকেই বাড়ল বিপদ! ১৮৩৫-এর ওই আইনের পরিবর্তে ১৮৬৭ সালে চালু হলো রেজিস্ট্রেশন আইন।

১৮৭৮ সালে ভাইসরয় লিটনের কৃতিত্বে এল ভার্নাকুলার আইন (Vernacular Act) । যা উদীয়মান স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের গতিপথ রুদ্ধ করল ফের। শেষ হল একটা সময়কালের।

১৯০৮-এর সংবাদপত্র আইন। ১৯১০ সালের ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আইন। ১৯২১-এ তেজবাহাদুর সাপ্রির সংবাদমাধ্যম সংক্রান্ত প্রস্তাব। ১৯৩১-এ ফের ডামাডোল। যা বারবার সংবাদমাধ্যমের সামগ্রিক স্বাধীন সত্তার সর্বনাশে উদ্যত ছিল প্রথম থেকেই। ঠিক এর মধ্যেই কেউ বিকিয়ে গিয়েছেন, কেউ আবার শিরদাঁড়া সোজা করতে গিয়েও আসল সত্য তুলে ধরেছেন নিরন্তর। বিপ্লবের ভাষার প্রকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করা, মানুষের কথার মাধ্যমের বিকাশ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সাড়া জাগাল নতুন করে। অমৃতবাজার পত্রিকা, আনন্দবাজার পত্রিকা-সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে শুরু হলো নতুন পথ। কিন্তু সেখানেই সাংবাদিকতার নীতি-আদর্শ এবং নিরপেক্ষ সত্তা ধরে রাখার বিফল চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন উঠল ফের।

জরুরি অবস্থা ও সংবাদমাধ্যম

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়কালে, কংগ্রেসমুখী হওয়ার বিতর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যম এগিয়ে গেলেও এই সমগ্র পরিস্থিতি পরিবর্তিত হয় ইন্দিরা গান্ধী এবং ভারতে জারি হওয়া জরুরি অবস্থার সময়ে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন। নিজের 'গদি বাঁচাতে' দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করালেন ইন্দিরা গান্ধী। কিছুদিন আগেই গুজরাতে কংগ্রেসের পরাজয়, ইন্দিরার গদি টালমাটাল হতেই এই দিনের পথে হাঁটলেন তিনি। ইন্দিরা বিরোধিতা, বিশেষত কংগ্রেস বিরোধিতার শাস্তি নেমে আসল ভয়ানক। একের পর এক বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা থেকে শুরু করে তাবড় তাবড় সংবাদমাধ্যম, একধাক্কায় চুপ করানোর চেষ্টা হল সর্বত্র। গ্রেফতার হলেন একাধিক নেতা। ইন্দিরা-বিরোধের শাস্তিতে জেলবন্দি হলেন অনেকেই। ছাড় পেলেন না একাধিক সাংবাদিক। তাঁদের কণ্ঠ-কলম আটকে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হল। বাদ পড়লেন কয়েকজন ইন্দিরা গান্ধীর 'কাছের লোক'।

পরিস্থিতি বদল হল ফের। ইন্দিরার ক্ষমতা শেষ হলো। পরবর্তীকালে খুন হলেন তিনি। সরকার বদল হতেই পাল্টা জেলে যেতে হলো একাধিক কংগ্রেস নেতাকে।

বাম, বিজেপি, তৃণমূল এবং সংবাদমাধ্যম

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ব্রাজিলের গদি উল্টোনো কতটা বাঁচাবে পৃথিবীর ফুসফুস আমাজনকে

Amazon forest: বিশ্বজুড়ে পরিবেশবিদরা এবং বিজ্ঞানীরা এখন এই আশাতেই বুক বাঁধছেন, যে সুসময় আসবে, আমাজন আবারও স্বমহিমায় পৃথিবীর বুকে রাজত্ব করবে।

সময় বদলেছে। সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের ভূমিকার পরিবর্তন হলেও খবরের গতিপথ, সমালোচনার উপাদেয় নির্বাচিত বা নির্দিষ্ট রূপ পেলেও একাধারে শাসককে তোষামোদ করে প্রমোশন, অন্যদিকে নিজের দিকে নানা অছিলায় সাংবাদিকদের টানার কৌশল কিন্তু বদল করেনি শাসক। আর এই দুই ক্ষেত্রের অন্যথা হলেই নানা কারণে নিরন্তর ঘটেছে ভিন্ন কিছু। যেমন, অটলবিহারী বাজপেয়ী বা মনমোহন সিংয়ের সরকারের আমলে সাংবাদিকদের গ্রেফতার, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ঠিক যতটা পরিমাণ অভিযোগ উঠত, নরেন্দ্র মোদীর রাজত্বে নাকি তার চেয়ে ঢের বেশি হয়েছে। দাবি, বিজেপি বিরোধিতার অতলে ঘটেছে মুখ বন্ধ করার কৌশল। যা এই রাজ্যেও কম হয়নি! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সরকারের বিরোধিতা করে প্রকাশ্যে বা গোপনে বিরাগভাজন হতে হয়েছে বহু সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে। দাবি, মমতার 'প্রিয় না হতে পেরে বকা শুনতে হয়েছে' কারও কারও। আবার বাম-আমলে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের সময়েও এই 'সংবাদপত্র পড়বেন না, এঁরা মিথ্যা লেখেন,' এহেন অভিযোগে বিধ্বস্ত হতে হয়েছে কোনও কোনও প্রতিষ্ঠানকে। নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমের নাম করে সেটি না দেখার বা পড়ার আহ্বান করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও।

'কাছের লোক না হওয়ার ফল'

কিন্তু সার্বিকভাবে এই 'আমার লোক' না হওয়ার ফল কী ঘটেছে? অনেকেই বলছেন, এর ফল ঠিক কী হতে পারে, তা দু'টি সর্বভারতীয় হিন্দি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের দুই সংবাদ সঞ্চালককে দেখলেই বোঝা যায়। এক, অর্ণব গোস্বামী। দুই, রবীশ কুমার। অর্ণব অঘোষিতভাবেই নরেন্দ্র মোদির পক্ষে খবর করেন এই অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরের সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করে, তাঁকে জেলবন্দি হতে হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। আবার রবীশের বিরুদ্ধে মামলা অথবা তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার ক্ষেত্রেও এই 'আমার লোক না হওয়া'র কারণ জড়িয়ে রয়েছে বলে দাবি। সম্প্রতি এই রাজ্যের একটি বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যম কলকাতা টিভি-র দফতরে আয়কর হানা, চ্যানেল বন্ধ হওয়ার ভ্রুকুটির মধ্যেও এই কাছের লোক না হওয়ার ইঙ্গিত জড়িয়ে রয়েছে বলেই অভিযোগ ওঠে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সমকাল

কলকাতা টিভি থেকে এএলটি নিউজের অন্যতম কর্ণধার জুবেইর খানের গ্রেফতারি, বারবার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে কেন্দ্রকে। এদিকে শুধু শাসকের পক্ষে না গেলেই সমূহ বিপদের সম্ভাবনা, এই অভিযোগের নিদর্শনই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে জম্মু-কাশ্মীরে সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতা, তাঁদের সার্বিক অবস্থান নিয়েও রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন।

উপত্যকায় সাংবাদিক হেনস্থা

সাজাদ গুল। কাশ্মীরের নবীন সাংবাদিক একটি বিক্ষোভের ভিডিও প্রকাশ করে আটক হন। বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। অভিযোগ ওঠে, সরকারের বিরুদ্ধে খবর করে হেনস্থা হতে হয়েছে তাঁকে।

প্রায় একই অভিজ্ঞতা হয় গওহর গিলানির ক্ষেত্রেও। মাসরাত জারাও মুখোমুখি হন মামলার। কঠিন ধারার প্রয়োগে আটকে যান ওঁরা। আবার কিছুদিন আগেই 'দ্য কাশ্মীর ওয়ালা'র সম্পাদক ফাহাদের গ্রেফতারির পর জরুরি দায়িত্ব নেন যশরাজ। প্রায় একই অভিজ্ঞতা হয় তাঁরও। বেশ কিছুদিন বন্দি করা হয় সাংবাদিক আসিফকে। 'কাশ্মীর নিউজ সার্ভিসে'র দফতর বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগেও সরগরম হয় দেশ।

উপত্যকায় সাংবাদিক হেনস্থা সংক্রান্ত একটি রিপোর্টে দেখা যায় নানা অজুহাতে বন্ধ হয়েছে একাধিক ছোট ছোট সংবাদমাধ্যম। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কাজ। এমনকী, ৫০-এর বেশি মামলা হয়েছে একাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। ইউএপিএ ধারায় মামলা হয়েছে অনেকের বিরুদ্ধে।

প্রায় একই অবস্থা অন্যান্য রাজ্যেও। অভিযোগ, কেরলের সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান গ্রেফতার হন উত্তরপ্রদেশের হাথরস যাওয়ার পথে। নয়াদিল্লি-র নিউজ ক্লিকে-র অফিসে ইডির তল্লাশি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এমনকী, ২০১৭-২০১৮ সাল নাগাদ একাধিক সাংবাদিকের খুনের কারণে সেই 'পক্ষে না বলা'র তত্ত্বও খাড়া করেন কেউ কেউ।

সাংবাদিক স্বাধীনতার বর্তমান অবস্থান

সম্পাদকদের জাতীয় সংগঠন 'এডিটরস গিল্ড অব ইন্ডিয়া' সম্প্রতি দাবি করে, দেশে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসের ১৭ থেকে ৩১ তারিখের মধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ১৫ জন সাংবাদিক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছেন একাধিক। এমনকী অনেককে দীর্ঘসময় জেলে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। একটি ঘটনা নিয়ে ফেসবুক পোস্টের জন্য মেঘালয়ে 'শিলং টাইমস পত্রিকা'র সম্পাদক প্যাট্রিসিয়া মুখিম মামলার মুখোমুখি হন।

সিদ্ধার্থ বরদারাজন 'দ্য হিন্দু'-র প্রাক্তন সম্পাদক, পরবর্তীতে 'দ্য ওয়ার'-এর প্রধান হন, মামলা হয় তাঁর বিরুদ্ধেও। সেই সময় এনডিটিভি-র সঙ্গে কাজ করা রাজদীপ সরদেশাই, 'দ্য ক্যারাভান'-এর বিনোদ যশ। 'হিন্দুস্থান টাইমস'-এর মৃণাল পাণ্ডে-সহ একাধিক সাংবাদিকদের ওপর নেমে এসেছে শাসকের খাড়া।

এমনকী, অভিযোগ উঠেছে, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগে ও পরে শাসকের রোষে পড়ে চাকরি হারিয়েছেন বহু সাংবাদিক। এদিকে মণিপুরের তিন সাংবাদিক পাওজেল চাওবা, সাদকপাম ধীরেন এবং এম জয় লুয়াংকে বিশেষ নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করার ঘটনায় উত্তাল হয়েছিল দেশ। 'দ্য ফ্রন্টিয়ার মণিপুর' নামে একটি সংবাদ-বিষয়ক পোর্টালের প্রধান সম্পাদক ধীরেন ও কার্যনির্বাহী সম্পাদক চাওবা-র বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযোগ ছিল, মণিপুরের সশস্ত্র নিষিদ্ধ সংগঠন নিয়ে একটি প্রতিবেদনে তাঁরা যা লিখেছিলেন, তাতে বিপ্লবী চিন্তাভাবনাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। জয় লুয়াংয়ের নামেও একই প্রতিবেদনে তথ্য সরবরাহের অভিযোগ আনা হয়। পরে মণিপুরি সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা মামলা তুলে নেওয়া হয়।

কৃষকদের প্রতিবাদের সময় পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে দিল্লির দুই সাংবাদিক মনদীপ পুনিয়া ও ধর্মেন্দ্র সিংকে গ্রেফতার করা হয়। আবার একাধিক ক্ষেত্রে শাসকের বিরুদ্ধে বলে তীব্র রোষের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ উঠেছে বারবার।

পশ্চিমবঙ্গ এবং সাংবাদিক স্বাধীনতা

এই অভিযোগ থেকে বাদ যায়নি এই রাজ্যও। বাম আমলে একাধিক অভিযোগ উঠলেও মমতার সময়ে আনন্দবাজার পত্রিকা-র প্রাক্তন সম্পাদক অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়ের পদত্যাগ নিয়েও উঠেছিল প্রশ্ন। আরামবাগ টিভির সফিকুল ইসলামের গ্রেফতারি নিয়েও ওঠে প্রশ্ন। কংগ্রেস নেতা-সাংবাদিক বর্তমানে বিজেপি নেতা সন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতার নিয়েও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় এই রাজ্যের সরকারকে। সম্প্রতি সাংবাদিক মানব গুহের গ্রেফতারি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে সরকারের বিরুদ্ধে।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করে আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস’। ২০১৯ এ ১৮০টি দেশে সমীক্ষা চালিয়ে সংগঠনটি বলেছিল, তাদের তালিকায় ভারতের স্থান ১৪২। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে ভারত আরও দুই ধাপ নিচে নেমে যায়। অবশ্য এই সমীক্ষা মানেনি ভারত সরকার। ফ্রান্সে ভারতের রাষ্ট্রদূত রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে ভারতের আপত্তির কথা জানানো হয়।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই অনেকে বলেন, ওপরে বর্ণিত এই এই ফলাফলের বা মারাত্মক পরিণতির আশঙ্কার জন্যই ক্রমশ মুখাপেক্ষী হতে হয় সাংবাদিকদের! অর্থাৎ 'ঝামেলায় কাজ নেই' মনোভাব পোষণ করেই বিক্রীত হতে হয় বিকৃত নীতির কাছে। যেখানে অন্যরা কাজের ছুতোয় চুলোয় গেলেও একটা অংশের তোষামোদ চলতে থাকে প্রতি মুহূর্তে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই অবস্থানে দাঁড়িয়েই নিজস্ব আঙ্গিকে সাংবাদিক এবং নীতি-আদর্শ ক্রয়ের পথ রপ্ত করে শাসক। যেখানে উপহার আর খানিকটা সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার টোপে তথাকথিত ক্রয় করা হয় সাংবাদিকদের একটা অংশকে। যার মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে থাকে নির্বাচন। সুবিধাজনক আসনে জিতে যাওয়ার সুবিধার টিকিট! যার ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে এই রাজ্যেও। আর এই ফাঁদেই বন্দি হয় সাংবাদিকতার টিকে থাকা আদর্শ। সাংবাদিকতার চূড়ান্ত নিজস্বতা। আর এই দোলাচলেই একটা ব্যতিক্রমী অংশ বাদে, এই শ্রেণির বড় অংশের মাথা কিনে নেয় রাষ্ট্র!

অনেকেই বলছেন, কর্নাটকে যে অভিযোগ সামনে এসেছে তার সত্যতা আছে কি নেই, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও একথা সত্যি যে, এই ভাবেই আসলে বিক্রির পথ পায় সত্তা। যেখানে সফরের 'চামচ চুরি' অথবা ভাইফোঁটায় দামি মিষ্টির ভেট, করোনা কালে বাছাই ফল, মিষ্টির সওগাত সার্বিকভাবে টাকা জোগান না দিলেও আদতে শাসকের কাছাকাছি থাকার অঙ্গীকার আরও গাঢ় করে দেয় নিমেষেই। যেখানে জড়িয়ে যায় কৌশল আরোপের সঙ্গেই সাংবাদিকতার দোদুল্যমান নৌকার নিরপেক্ষতা হেলে যায় সমকালীন রাজনৈতিক মতবাদের কাছে। যেখানে মাথাদের বিকিয়ে যাওয়া প্রশ্ন তোলে মানুষের কথার রূপকেও। এই তত্ত্ব জোরালো হওয়ার সঙ্গেই আবার বিপরীতই বলছেন কেউ কেউ। ওই অংশের দাবি, এই বিকিয়ে যাওয়ার মধ্যেও তোষামোদ কৌশলের আঙ্গিকেও রয়েছে সত্তার কাঠিন্য। যেখানে কংগ্রেস, তৃণমূল, বিজেপি, বাম বা পক্ষ ভেদ করে আসলে স্বাধীন সত্তার তাগিদে সাংবাদিক সত্তা আর নীতির বিস্তার ঘটান অনেকেই। কেউ পারেন, আবার কেউ থাকেন অপেক্ষায়। কিন্তু আদতে সত্য আর সত্তার মিশেলে ভারতজুড়ে ধ্বনিত হয় মানুষের সাংবাদিকদের কথায়, যেখানে শাসকের মিষ্টি বা টাকাও হয় ঠুনকো!

লিখেছেন
Ramen Das
Ramen Das
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।