এই বছরেই শেষ হচ্ছে না অতিমারী, মনে করছেন বিজ্ঞানীরা

তাত্ত্বিকভাবে কোভিড অতিমারী শেষ হতে পারে এবং ধীরে ধীরে তা অতিমারীর দিকেও এগোতে পারে। কিন্তু ড. এরিসের মতে আমরা এখনও জানি না, অতিমারীর পর্যায়ে পৌঁছলেও, কোভিডের রূপ কেমন হবে।

Madhurima Pattanayak
৪ মিনিট
এই বছরেই শেষ হচ্ছে না অতিমারী, মনে করছেন বিজ্ঞানীরা

বিগত দুই বছর ধরে আমরা নভেল করোনাভাইরাসের মতো সম্পূর্ন নতুন একটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছি। এই দুই বছরে প্রায় পঞ্চান্ন কোটির কাছাকাছি মানুষ অসুস্থ হয়েছেন কোভিডে, পঁয়ষট্টি লাখের কাছাকাছি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তারই মাঝে একাধিকবার নভেল করোনাভাইরাসের জিন মিউটেশনের ফলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বেশ কিছু ভ্যারিয়েন্ট ও সাব-ভ্যারিয়েন্ট।

বিগত দুই বছর ধরে যে আর্থ-সামাজিক ক্ষতি হয়েছে, কেবল বিশ্বব্যপী অতিমারীর প্রভাবে, তাতে আমূল বদলেছে আমাদের জীবনযাপন।

আমরা বোধহয় গত দুই বছরে প্রতিদিন প্রশ্ন করেছি, এর শেষ কোথায়? সত্যি-ই তো, এইভাবে সংক্রমণের ভয়, ক্লেশের ভয়, মৃত্যুভয় নিয়ে ক'দিনই বা চলতে পারে? আমরা প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করেছি, সত্যি-ই কি কোনওদিনও এর শেষ হবে না? একের পর এক নতুন ভ্যারিয়েন্ট নতুন রূপ নিয়ে আমাদের আক্রমণ করবে? আমরা এখনও প্রায়শই আতঙ্কে ভুগি এই ভ্যারিয়েন্টগুলি আরও শক্তিশালী হবে, না কি শক্তি হারিয়ে ক্রমেই সাধারণ সর্দি-কাশির ভাইরাসের রূপই ধারণ করবে? বা কোভিডের পরবর্তী ঢেউ যদি আসেও, সেই সময় কি সংক্রমণের হার কমবে?

দেখা যাচ্ছে, ইংল্যান্ডে ইতিমধ্যেই সংক্রমণের হার কমতে শুরু করেছে। শুধু তাই নয়, ২০২১ সালের গ্রীষ্মকালের পর থেকে এই প্রথম সবচেয়ে কম সংক্রমণের হার দেখা গিয়েছে ইংল্যান্ডে।

তাহলে কি আমরা সত্যি-ই অতিমারীর শেষ দেখতে চলেছি খুব দ্রুত? ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ডের বিবর্তন এবং জেনোমিক্স-বিশেষজ্ঞ এরিস ক্যাটজো়কারিসের মতে, এটি অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন। কিন্তু আর কিছু সময় না গেলে আমরা কিছুতেই বলতে পারব না, আমরা অতিমারীর শেষ প্রান্তে পৌঁছলাম কি না।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শ্বাসের মধ্যে ভরে নেওয়া করোনা ভ্যাকসিন বেশি কার্যকরী? এবার জানিয়ে দিলেন গবেষকরা

সম্প্রতি গবেষকরা জানালেন, অন্যান্য কোভিড ভ্যাকসিনের তুলনায় এই নেক্সট-জেনারেশন কোভিড ভ্যাকসিন অনেক বেশি কার্যকরী।

তবে আশা করা যাচ্ছে, কোভিড অতিমারী থেকে মহামারীতে পৌঁছবে। অর্থাৎ, তখন রোগটি বেশ কিছু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। এবং রোগটি অতিমারী স্তরে পৌঁছলেই, জনসংখ্যার সার্বিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ভাইরাসের প্রজননের হারের মধ্যে সমতা আসবে। ফলে বাৎসরিকভাবে কোভিড রোগীর সংখ্যা একটা সময়ের পর আর বাড়বে না।

কত দ্রুত অতিমারীর শেষ আমরা দেখব এবং শেষ পর্যায়ে গিয়ে তার রূপ কী হবে, তা নির্ভর করছে দু'টি বিষয়ের ওপর। সেই দু'টি বিষয় হলো, আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হবে? দ্বিতীয়ত, নভেল করোনাভাইরাস কত দ্রুত ও কীভাবে বিবর্তিত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করবে, এবং আমাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভাইরাসটির বিবর্তনকে কতটা প্রভাবিত করবে।

এই প্রশ্নগুলির উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের আবার বিবেচনা করে দেখতে হবে, দীর্ঘ দুই বছরব্যপী অতিমারী থেকে আমরা কী শিক্ষা লাভ করেছি। সেখানেই লুকিয়ে আছে আমাদের প্রশ্নের উত্তর।

ড. এরিস জানাচ্ছেন, ২০২০ সালে যখন কোভিডের সবথেকে বেশি উৎপাত ছিল, আমরা খেয়াল করেছিলাম, কত দ্রুত সেই ভাইরাস এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তির শরীরে সংক্রমিত হচ্ছে। অবশ্য ২০২১ সালের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আমরা আলফা ভ্যারিয়েন্টের দাপট দেখেছি বিশ্বজুড়ে। নভেল করোনাভাইরাসের প্রাথমিক স্ট্রেনের জায়গা দখল করে আলফা ভ্যারিয়েন্ট এই সময়। প্রাথমিক স্ট্রেনের তুলনায়, এই ভ্যারিয়েন্টটির ফলে অনেক বেশি মানুষ অসুস্থ হয়েছে। এর প্রকোপে রোগের বীভৎসা যেমন মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল, মৃত্যুর হার ছিল অনেক বেশি। আলফা ভ্যারিয়েন্ট প্রাথমিক ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় পঞ্চাশ শতাংশরও বেশি সংক্রামক।

এদিকে যখন বিটা এবং গামা ভ্যারিয়েন্ট মাথা চাড়া দিল, দেখা গেল তারা খুব সহজেই ভ্যাকসিনের প্রভাবে তৈরি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমাদের শরীরে বাসা বাঁধছে। ধীরে ধীরে এল ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট, যা আবার আলফা ভ্যারিয়েন্টের থেকে পঞ্চাশ শতাংশর বেশি সংক্রামক।

পাশাপাশি এটাও সত্যি, ২০২১ সালের শেষ বা চলতি বছরের শুরুতে যখন নভেল করোনাভাইরাসের নতুন ভ্যারিয়েন্টে, ওমিক্রনে পৃথিবীবাসী আক্রান্ত হচ্ছিল, রোগের ভয়াবহতা, মৃত্যুর হার এবং হাসপাতালে কোভিড রোগীকে ভর্তির প্রয়োজনীয়তা অনেক কম হারে আমরা খেয়াল করেছি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোভিড সাধারণ সর্দি-কাশির রূপেই দেখা দিয়েছে। এযাবৎ ওমিক্রনই একমাত্র ভ্যারিয়েন্ট, যার চারটির কাছাকাছি সাব-ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া গিয়েছে। তারাও অনেক বেশি সংক্রামক হলেও, কোনও সাব-ভ্যারিয়েন্টের ফলেই কিন্তু রোগের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করেনি।

কিন্তু তারপরেও সেই ভাইরাস অন্যান্য আর.এন.এ. ভাইরাসের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম হারে বিবর্তিত হয়। অবশ্য হু-এর কোভিড ১৯ টেকনিক্যাল লিড ড. মারিয়া ভ্যান কারকোভ, একটি মাঙ্কিপক্স এবং অন্যান্য ভাইরাস-জনিত অসুখ সম্বন্ধীয় সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন, নভেল করোনাভাইরাস কিন্তু বিবর্তিত হতে থাকবে। অর্থাৎ, একাধিক ভ্যারিয়েন্ট ও সাব-ভ্যারিয়েন্ট তৈরি হতেই থাকবে নভেল করোনাভাইরাসের।

ড. এরিস জানাচ্ছেন, একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যার মানুষ কোভিডে একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু তারপরেও আমাদের অজানা, পরবর্তী কোভিড সংক্রমণের ফলে রোগের প্রকোপ আদৌ কমবে কি না। যদিও দেখা গেছে, যেহেতু প্রাথমিকভাবে আক্রান্ত হওয়ার পরে দেহে নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করবে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েই যায়, ফলে দ্বিতীয়বার সংক্রমিত হলে রোগের প্রকোপ অল্পের ওপর দিয়েই যায়। কিন্তু তারপরেও প্রশ্ন থেকেই যায়। যেহেতু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টিবডির সংখ্যা কমতে থাকে, আবার প্রাথমিক সংক্রমণের দীর্ঘদিন পর কোভিডে আক্রান্ত হলে কতটা ভুগতে হরে পারে রোগীকে? না কি ততদিনে, আমাদের চারপাশে সমস্ত মানুষ কোভিডের বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলায়, কোভিডে মাথাচাড়া দিলেও, তার প্রকোপ বেশি হবে না?

তাত্ত্বিকভাবে কোভিড অতিমারী শেষ হতে পারে এবং ধীরে ধীরে তা অতিমারীর দিকেও এগোতে পারে। কিন্তু ড. এরিসের মতে আমরা এখনও জানি না, অতিমারীর পর্যায়ে পৌঁছলেও, কোভিডের রূপ কেমন হবে। প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, অতিমারী স্তরে পৌঁছলেও, সময়ে সময়ে কোভিড ঢেউয়ের আকারে ফিরে আসবে কি না।

অবশেষে ড. এরিস জানাচ্ছেন, কোভিড অতিমারী এই বছর কোনওভাবেই শেষ হচ্ছে না। কিন্তু উচ্চহারে টিকাকরণ হয়েছে, যে সমস্ত দেশে, সেই দেশগুলি থেকেই আন্দাজ করা যায় এই অতিমারীর ভবিষ‍্যৎ কী হতে চলেছে। আশার কথা হলো, ধীরে ধীরে সংক্রমণের সম্ভাবনা কমবে। শুধু তাই নয়, পুনরায় কোভিডে আক্রান্ত হলে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে সমস্যার সমাধান করা যাবে, সেই ধারণাও আমাদের ইতিমধ্যেই আছে, জানাচ্ছেন ড. এরিস।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।