করোনা নিয়েছিল চাকরি! পাঞ্জাবকে পিৎজার স্বাদ চিনিয়ে আজ লাখপতি তিনি

দীপ সিং এখন একজন সফল ব্যবসায়ী শুধু নন, পাঞ্জাবের একজন অনুপ্রেরণা।

Arunima Mukherjee
৪ মিনিট
করোনা নিয়েছিল চাকরি! পাঞ্জাবকে পিৎজার স্বাদ চিনিয়ে আজ লাখপতি তিনি

বেশ চলছিল মানুষের জীবন। স্কুলে গিয়ে ক্লাস করা ছিল, বাড়ি ফিরে পড়াশোনা ছিল, স্কুল শেষে ভাল কলেজ আর কলেজ শেষে আহা-মরিমরি না হোক, তবে একটা চাকরি ছিল। বেশ সাদামাটা সুখের সুন্দর জীবন। কিন্তু ২০২০ সালের কোভিড অতিমারী মানুষের এই সাদামাটা জীবনটুকুকেও বদলে দিল। একদিকে কোভিডের করাল গ্রাসে প্রাণ যাচ্ছিল হাজার-হাজার মানুষের আর অন্যদিকে একের পর এক কোম্পানিতে ঝড়ের গতিতে চলছিল কর্মচারী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে ভারতে প্রায় ৩৯ লক্ষ লোক নিজেদের কাজ হারিয়েছেন। দিল্লির এনসিআর-এ বসবাসকারী ৩৬ বছরের মহবত দীপ সিং চিমারের গল্পটাও খানিকটা সেরকমই ছিল।

কথায় বলে, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়, আবার কেউ কেউ বলেন, পরিস্থিতি মানুষকে অনেককিছুই করতে বাধ্য করে। দীপ সিং চিমারের ক্ষেত্রে সম্ভবত দু'টি কথাই সত্য। আড়াই লাখ টাকার চাকরি হারিয়ে তিনি বাধ্য হয়ে ফিরে গেছিলেন পৈতৃক ভিটেয়। তারপর ছোট্ট একটা দোকান থেকে আজ আবার লাখপতি। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কেমন ছিল এই ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রাপথ।

কেমন ছিল দীপ সিং-এর আগের জীবন?

পাঞ্জাবের ধিলওয়ানে গ্রামে এক অসচ্ছল কৃষি পরিবারে দীপের জন্ম হয়। ছোটবেলায় তাঁদের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, সেই সংকট খানিকটা লাঘব করার জন্য তাঁকে ছয় বছর বয়সেই তাঁর বাবা-মা পাঠিয়ে দিয়েছিল কাকার কাছে, দিল্লিতে। দিল্লি এনসিআর-এ দীর্ঘ ৩০ বছরের জীবনে দারিদ্রর আঁচ যে একেবারেই পড়েনি, তা নয়। কোনওরকমে দিল্লির একটি স্কুলে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েই কাজের খোঁজ করতে থাকেন দীপ সিং এবং একইসঙ্গে চলতে থাকে কলেজের পড়াশোনা। খুব স্বাভাবিকভাবেই কাকার পরিবারের কাছে হাত পাততে ভাল লাগত না তাঁর। তিনি জানিয়েছেন, চাকরিজীবনের প্রথমে তিনি মাত্র পাঁচ হাজার টাকা বেতনের বিনিময়ে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজে যোগ দেন। ছোটবেলা থেকেই অভাব-অনটনে দিন গুজরান করার কারণে দীপের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ছিল, আর্থিক স্বচ্ছলতা লাভ করা। অবশেষে অক্লান্ত পরিশ্রমের সুফল যখন মিলল, বিশ্বজুড়ে তখন ঘনিয়ে এল করোনা অতিমারী, লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের কাজ হারালেন। আর সেই তালিকা থেকে বাদ পড়লেন না তিনিও। ২০২০ সালে যখন তাঁর চাকরি যায়, তখন তাঁর মাসিক বেতন ছিল প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা। সেই সময় কার্যত তাঁর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, আর পড়বে না-ই বা কেন? ছোটবেলায় যে পরিবার ছেড়ে তাঁকে একপ্রকার বাধ্য হয়েই চলে আসতে হয়েছিল, এরপর প্রায় তিরিশ বছর ধরে একাধিক কোম্পানিতে দিনরাত পরিশ্রম করে দিল্লিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার পর কি আর সেই পরিবারে ফিরে যেতে মন চায়! চাকরি চলে যাওয়ার প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল দীপ সিং-এর। তবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, এই কঠিন পরিস্থিতিতে তিনি একা দাঁড়িয়ে নেই, দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ তাঁরই মতো কাজহারা। প্রথমেই তিনি পাঞ্জাবে ফিরে আসতে চাননি, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার আরও অবনতি ঘটলে অগত্যা তিরিশ বছরের মায়া কাটিয়ে পাঞ্জাবেই ফিরে আসতে হয় তাঁকে। পারিবারিক কৃষিকাজে প্রথম থেকেই অনীহা থাকায় তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজের জীবনটাকে সম্পূর্ণ শূন্য থেকে আবার নতুন করে শুরু করার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বাঙালির প্রিয় ফুচকায় মজেছে মার্কিনিরা! শূন্য থেকে সোজা শীর্ষে এই ভেলপুরিওয়ালা

ভাঙাচোরা জীবনকে গোছানোর জন্যই একসময় মেহেরওয়ান আমেরিকার বুকে গড়ে তুললেন ভারতীয় স্ট্রিট ফুডের ছোট্ট এক রেস্তোরাঁ, ‘চা’য়ে পানি’। এরপর আর কখনও ফিরে দেখতে হয়নি তাঁকে।

মাত্র চার লক্ষ টাকা দিয়ে ব্যবসার শুরু

দীপ সিং জানিয়েছেন, পাঞ্জাবে পিৎজা কিংবা বার্গারের চল তেমন বিশেষ একটা ছিল না, আর পিৎজা-বার্গারের নামে যা বিক্রি হতো, তা ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের। তিরিশ বছর ধরে দিল্লির বিভিন্ন নামিদামি জায়গায় খাবার-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা থাকায়, খাবার সম্পর্কে খানিকটা হলেও ধারণা তাঁর ছিল। সম্ভবত এই অভিজ্ঞতার জোরেই তিনি ঠিক করেছিলেন, ধিলওয়ানের গ্রামবাসীকে উন্নত মানের পিৎজা-বার্গার ও ফ্রাইস খাওয়ানোর। মাত্র ৪ লক্ষ টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে তিনি নিজের ব্যবসা শুরু করেছিলেন, যার মধ্যে ১ লক্ষ টাকা এসেছিল স্ত্রী মনপ্রীত কৌর-এর কাছ থেকে। দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় ‘ফুড ট্র‍্যাক’-এর বেশ জনপ্রিয়তা থাকায়, সেইমতোই ২০২০ সালের অগাস্ট মাসে একটি ট্র্যাকের ব্যবস্থা করে সেখানেই খাবারের দোকান দেন দীপ সিং। দোকানের নাম দেওয়া হয় ‘দ্য পিৎজা ফ্যাক্টরি’। কিন্তু ভাগ্য এখানেও যেন তাঁদের সহায় হলো না। পাঞ্জাবের প্রচলিত চপ-সিঙাড়ার কাছে হার মানল পিৎজা-বার্গার। দোকান খোলা থাকলেও খরিদ্দারের দেখা প্রায় মিলত না বললেই চলে প্রথমদিকের দিনগুলিতে। দীপ সিং-এর স্ত্রী মনপ্রীত জানিয়েছেন, প্রথমদিকে এলাকার মানুষজন এই ‘ফুড ট্র্যাক’ নিয়ে সহযোগিতার বদলে বিদ্রূপই করতেন এবং একটা সময় তাঁর এমনও গেছে, যখন তিনি স্বামীর এই ব্যবসার বিষয়ে কাউকে কিছু জানাতেও দ্বিধা বোধ করতেন।

অবশেষে ব্যবসার মোড় ঘুরল ১৯৯ টাকার কম্বো প্যাকের মাধ্যমে। যেহেতু দীপ চেয়েছিলেন তাঁর গ্রামবাসীকে ভালো মানের পিৎজা-বার্গারের সঙ্গে পরিচয় করাতে, সম্ভবত সেই ইচ্ছা থেকেই তিনি স্বল্পমূল্যের এই কম্বো প্যাকটি চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর থেকে তাঁকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে দীপ সিং-এর মাসিক আয় প্রায় দু’লক্ষ টাকা।

ছোটবেলা থেকেই রান্নার প্রতি ভালবাসা ছিল তাঁর

দীপ জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিবারের সকলের জন্য রান্না করতে পছন্দ করতেন এবং একটা সময়ে তিনি হোটেল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনাও করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতি সঙ্গ দেয়নি। চাকরি চলে যাওয়ার পর তাঁর এই ব্যবসা কোথাও যেন অতীতের সুপ্ত বাসনাকেও পূরণ করেছে। তিনি জানান, বিখ্যাত পাঞ্জাবি ইউটিউবার সেফ রণবীর ব্রার-এর থেকেই তিনি পিৎজা বানানো শেখেন। কীভাবে রেডিমেড ‘ডো’ দিয়েই পিৎজা বানানো সম্ভব, কি‌ংবা বাড়িতেই কীভাবে পিৎজার ‘ডো’ বানানো যায়– এই সবকিছুই তিনি শিখেছেন রণবীরের ইউটিউব চ্যানেল দেখে। তাঁর নিজের কথায় ‘রণবীর হলেন আমার গুরু এবং আমি তাঁর একলব্য।'

দীপ সিং এখন একজন সফল ব্যবসায়ী শুধু নন, পাঞ্জাবের ওই অঞ্চলের একজন অনুপ্রেরণা। তাঁর দেখাদেখি, তাঁর ফুড ট্র্যাকের পাশেই চারটি নতুন খাবারের দোকান গড়ে উঠেছে; এবং সর্বোপরি ধিলওয়ানে গ্রামের লোকজনরা এখন আর কেবল চপ সিঙাড়াতেই মজে নেই, বিভিন্ন স্বাদের খাবার আজ জায়গা করেছে তাদের জীবনে।

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।