এক বাসেই দিল্লি থেকে লন্ডন! যেতে হলে যে তথ্য জানতে হবে
এবার হয়তো বাসে চেপেই দিল্লি থেকে লন্ডন পৌঁছে যেতে পারবেন। ৭০ দিনে ১৮টা দেশ পেরিয়ে আপনি পৌঁছে যাবেন লন্ডন।

মন উড়ে যাক লন্ডন। ঘুরে আসা যাক রানি ভিক্টোরিয়ার দেশ। তাও আবার বাসে, সড়ক পথে। ছয়ের দশকে এক ‘বাস'-এই সাতসমুদ্র, তেরো নদী পার করত বাস! রোমাঞ্চকর ছিল সেই কলকাতা টু লন্ডন যাত্রা। প্রায় আট হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিত যে বাসটি, তার নাম ছিল 'অ্যালবার্ট'। আবার হয়তো সেই অভিজ্ঞতার সাক্ষী হতে চলেছেন এই দেশের ভ্রমণপিপাসুরা। এই সুযোগ আসতে পারে এই সেপ্টেম্বরেই।
বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন রয়েছে? অন্যদিকে আবার বিমানে উঠতে ভয়? তাহলে বাসকে বেছে নিতে পারেন বিদেশ ভ্রমণের জন্য। এবার হয়তো বাসে চেপেই দিল্লি থেকে লন্ডন পৌঁছে যেতে পারবেন। ৭০ দিনে ১৮টা দেশ পেরিয়ে আপনি পৌঁছে যাবেন লন্ডন। এই ভ্রমণের সুযোগ নিয়ে এসেছে হরিয়ানার 'অ্যাডভেঞ্চারস ওভারল্যান্ড' নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। কবে থেকে চালু হচ্ছে এই পরিষেবা? ওই সংস্থার তরফ থেকে জানানো হয়েছে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে পারে দিল্লি থেকে লন্ডন বাস পরিষেবা। জানা গিয়েছে, যদি ভারত-মায়ানমার সীমান্ত শান্ত থাকে, তাহলে দ্রুত চালু হবে এই বাস পরিষেবা।
প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে আপনি পৌঁছে যেতে পারবেন লন্ডনে। সময় লাগবে ৭০ দিন। পথে পড়বে ১৮টি দেশ। দিল্লি থেকে যাত্রা শুরু করবে বাস। তারপর তাইল্যান্ড, লাওস, চিন, কিরঘিজস্তান, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, রাশিয়া, লাতভিয়া, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম এবং ফ্রান্স হয়ে লন্ডন পৌঁছবে। অত্যাধুনিক সুবিধেযুক্ত এই বাসে ২০টি আসন থাকবে। প্রতি যাত্রীর জন্য আলাদা কেবিনের ব্যবস্থা থাকবে। শুধু তা-ই নয়, যাত্রীদের ভিসা-সহ বিদেশ ভ্রমণের জন্য যাবতীয় জরুরি নথির ব্যবস্থা করে দেবে সংস্থাটি। ৭০ দিনে ২০ হাজার কিলোমিটার সফর করে লন্ডনে পৌঁছবে এই বাস। মাথাপিছু খরচ ১৫ লাখ টাকা।
এবার শুরু হলে বাস যাবে কিরঘিজস্তান, চিন, থাইল্যান্ড, মায়ানমার হয়ে ফ্রান্স৷ বাসের পাশাপাশি থাকবে বিলাসতরী৷ ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার জন্য৷ ফ্রান্সের কালেই থেকে ইংল্যান্ডের ডোভার অবধি বাসটিকে নিয়ে যাওয়া হবে ফেরি সার্ভিসে৷ তার জন্য সময় লাগবে প্রায় ২ ঘণ্টা৷ তারপর বাস আবার লন্ডন থেকে চলতে শুরু করবে৷ বাসে প্রত্যেক যাত্রীর জন্য থাকবে আলাদা কেবিন৷ সেখানে খাওয়া, ঘুম-সহ সবরকম সুযোগসুবিধে থাকবে৷ ভিসা, পাসপোর্ট এবং অন্যান্য নথিপত্র নিয়েই আপনি যাতায়াত করতে পারবেন এই বাসে৷ অর্থাৎ বিদেশ ভ্রমণের জরুরি সব উপকরণ আপনাকে সঙ্গে রাখতে হবে। এ-ব্যাপারে সাহায্য করবে বাস পরিষেবা সংস্থা।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এই বাসযাত্রা আমাদের দেশে নতুন নয়। ভারত থেকে লন্ডন পর্যন্ত বাস পরিষেবা প্রথম চালু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। সেই সময় ব্রিটেনের একটি সংস্থা এই পরিষেবা চালু করেছিল। কলকাতা থেকে দিল্লি হয়ে লন্ডন পৌঁছত বাস। ‘হিপ্পি রুট’ নামে জনপ্রিয় এই বাস রুটটি। বেশ কয়েক বছর চলেছিল এই পরিষেবা। কিন্তু তারপরেই বাসটি একটি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয় এবং সেই থেকে এই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
১৯৩১ থেকে ২০২২-এ কম ঘটনার সাক্ষী আমাদের পিতামহ বেবি অস্টিন ৭ নন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা, দেশভাগ, বাংলাদেশের জন্ম- সব ঘটনার নীরব সাক্ষী তিনি।
যদিও এখানেই শেষ নয়। এরপরও অন্য একটি বিদেশি সংস্থা সিডনি থেকে ভারত হয়ে লন্ডন পর্যন্ত দোতলা বাস পরিষেবা চালু করে। সেই পরিষেবাও বেশ জনপ্রিয় ছিল। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সেই পরিষেবা ঠিকঠাক চলেছিল। কিন্তু ইরানের রাজনৈতিক সমস্যা এবং ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে টানাপড়েনের জেরে সেই পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
কেমন ছিল কলকাতা টু লন্ডন যাত্রা?
“এসপ্ল্যানেড, চিড়িয়াখানা, সল্টলেক...”, হাওড়া স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে পড়তেই এইরকম একটা কানফাটানো চিৎকার রোজকার যাত্রীদের যেন সঙ্গী হয়ে আছে বহুকাল। বাসে ওঠার তাড়াহুড়োয় ছুটতে থাকেন নিত্যযাত্রীরাও। শুধুই হাওড়া নয়, শহরের অধিকাংশ বাস স্টপেই এমন পরিবেশ অতি-সাধারণ একটা ব্যাপার। কন্ডাক্টরদের এমন চিলচিৎকার প্রায় প্রতিদিনই কানে তালা ধরায় সাধারণ যাত্রীদের। কিন্তু ভেবে দেখুন, এই বাসগুলির মধ্যেই খানিকটা অন্যরকম সজ্জার একটি বাস থেকে ডাক লন্ডন যাওয়ার। না, মোটেই রূপকথা নয় এটা। কারণ, এই ডাকটাই আপনাকে নিমেষে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ছয়ের দশকে।
তিলোত্তমায় তখন ব্রিটিশদের রমরমা। এক বাসেই কলকাতা থেকে লন্ডন চলছেন শহরের ভিনদেশি সাদা চামড়ার মানুষরা। প্রায় আট হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিত 'অ্যালবার্ট'। ডবল ডেকার বাস, বিলাসিতা ভরপুর। কিছুরই যেন অভাব নেই। তৎকালীন যুগের একেবারে চলন্ত হোটেল। যা আজও মানুষের কাছে আশ্চর্যের। অবশ্য, ইতিহাসের পাতা খুঁড়ে মানুষের কাছে মাঝেমধ্যেই উঁকি দিত অ্যালবার্ট। কিন্তু, অনেকের কাছে বিশেষ তথ্য প্রমাণ না থাকায় অ্যালবার্টের অস্তিত্ব নিয়ে অনেকটাই ধন্দ ছিল সকলের মনে। তবে এবার যেন সেই সকল ধন্দের সমাপ্তি ঘটল নেটমাধ্যমের হাত ধরেই। সম্প্রতি, সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ভাইরাল হওয়া একটি ছবিতে দেখা গিয়েছে, বাস থেকে কিছু যাত্রী ওঠা-নামা করছেন। এমনকী, গন্তব্যের স্থানে সেই বাসে লেখা রয়েছে, লন্ডন-ক্যালকাটা-লন্ডন। চক্ষু চড়কগাছ! হতবাক নেটিজেনরা!

অ্যালবার্ট, ছয়ের দশকের সেই বাস পরিষেবা
জানা গিয়েছে, ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, পশ্চিম জার্মানি, অস্ট্রিয়া, যুগোস্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, তুরস্ক, ইরান, আফগানিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে ভারতে ফিরে আসত অ্যালবার্ট। এরপর তৎকালীন বাংলা রেঙ্গুন হয়ে থাইল্যান্ড ও তৎকালীন মালয়, সিঙ্গাপুর হয়ে পৌঁছে যেত অস্ট্রেলিয়া। প্রায় ১৫ বার কলকাতা থেকে লন্ডন সফর করেছিল ওই বাসটি। এক সময় টাইটানিককে বলা হতো ‘স্বপ্নের জাহাজ’। অন্যদিকে, অ্যালবার্টও নিজের জৌলুসে কিছু কম ছিল না। জানা যায়, খাওয়া থেকে শোওয়া- সমস্ত রকমের বিলাসিতার সুবিধে ছিল এই বাসে। দেশের পর দেশ ঘুরতে ঘুরতে লন্ডনে পৌঁছে যেত অ্যালবার্ট– সেই স্বপ্নের সফর হয়তো স্বর্গে বিচরণের থেকে কম নয়। তৎকালীন সময় লন্ডন থেকে কলকাতা আসার জন্য ৭ হাজার ৮৮৯ টাকা খরচ হতো প্রত্যেক যাত্রীর।
বাসে করে গড়িয়াহাট, শ্যামবাজার...। কিন্তু বাসে করে লন্ডন? এবার সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে দিল্লিতে আপনার জন্য অপেক্ষা করবে সেই বাস। বাসের চাকা গড়গড়িয়ে একেবারে রানির দেশ। তাহলে কি এবার বলবেন, উঠল বাই তো কটক, থুরি, লন্ডন যাই?
















