ভাতের খিদে কি মানুষের মেরি বিস্কুটে মেটে?

Amrita Bhattacharya
৪ মিনিট
ভাতের খিদে কি মানুষের মেরি বিস্কুটে মেটে?

একেকদিন আর রান্নাঘরে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। রান্নাঘর অবশ্য না বললেও চলে। কাঠের জ্বাল ঠেলে ঠেলে রান্না, তাও আবার উঠোনের একপাশটিতে। এই গরমে মানুষ পারে! সুখলতা তাই মুখের ওপর বলে দিয়েছে। বলে দিয়েছে, ওর দ্বারা কাঠের জ্বাল ঠেলা আর হবে না, সে তোমরা যা পারো করে নাও! সংসারে এমন কত হয়! কত মানুষ কত কাজ পায়ে ঠেলে চলে যায়! তা সংসার কি তাতে চলে না? দিব্যি চলে। সংসারের নিয়মই এই। এই যেমন সুখলতা আবার নিত্যদনের মতো জ্বাল ঠেলে ঠেলে রান্না করছে, এরকমই। স্বাভাবিক। মেয়েলোকের এসব কথা আবার কেউ গেরাজঝি করে নাকি! তবে সুখলতার ব্যাপার যদিও খানিক আলাদা। শওরের মেয়ে গাঁয়ে এলে যেমন হয় আর কী। তাও তো কত বচ্ছর হয়ে গেল! এখন বাটনা বাটা বলো, মুড়ি ভাজা বলো- সবই ওর হাতে বসে গেছে। এই শেকড় গজিয়ে যাওয়ার মধ্যে সুখলতার আনন্দ কতখানি, বলা মুশকিল যদিও। মানুষকে বাধ্য হয়ে কত কী-ই তো করতে হয়! তা বলে ভাত রাঁধা আর কে না শিখে আসে! শিখে আসাটাই তো শ্বশুরঘরের দস্তুর। তবে মিথ্যে বলব না বাপু, সুখলতা এখন সবই পারে। শুধু মাঝে মধ্যে গরম খানিক বাড়লে এদিকসেদিক থেকে মুখঝামটা ভেসে আসে। সে আসুক, ওটুকু সওয়া যায়। অন্তত রান্নাঘরে ঢুকে গতর নাড়ানোর চেয়ে ও ভালো।

ওই তো দাওয়ার পাশটিতে বসে বসে সুখলতা একমনে ডেঙ্গোডাঁটা কাটছে। এবারে ডাঁটাশাক হয়েওছে বাগানভরে। সকাল সকাল কাস্তে হাতে নিজেই কেটে এনেছে বড় বড় ডাল। এ-বাড়ির সকলেই কী যে ভালোবাসে মাখোমাখো করে ডেঙ্গোডাঁটার চচ্চড়ি। একটু বেশি করে না বানালে তাই হয় না। ডাঁটাই জড়ো করেছে এই অ্যাত্তো! এর ওপরে আবার কুমড়ো পড়বে, ঝিঙে পড়বে, পটল পড়লে, আলু তো আছেই। সব মিলে তা ধরো ওই বড় কড়াইয়ের এক কড়াই তো হবেই! তাও তুমি দিয়ে কুলোতে পারবে না। এই ডাঁটা খাওয়া সুখলতা এ-বাড়িতে এসে শিখেছে। এখন ওরও বেশ লাগে। অনেকক্ষণ ধরে চিবোতে চিবোতে মনে মনে বেশ একে-তাকে গাল পাড়া যায়। এই এখন যেমন এদের বাড়ির গুষ্টিশুদ্ধ লোকের মুণ্ডপাত করতে করতে কুটনো কাটছে সুখলতা। এসব না করলে কাজে ওর এনার্জি আসে না ঠিক। এর মধ্যে এ একবার চা চাইবে, ও একবার জল চাইবে! তা তমাদের কি ভগবান চার হাত-পা দিয়ে পাঠায়নি নাকি! চা-জলটাও চেয়ে খেতে হয় বাপু! ভাগ্যি আকাশে খানিক মেঘের পলি পড়েছে, নইলে এতক্ষণে সুখলতার গলা ওই শিউলি গাছের ওপার থেকে শোনা যেত।

রান্না বসিয়ে জ্বাল খানিক ঠেলে দেয় সুখো। নাহ্, এ নামখানা খোয়া গেছে কবেই। সুখই নেই সুখোর জীবনে, তার আবার নাম নিয়ে মাথাব্যথা। জোরে জোরে খুন্তি নাড়তে নাড়তে মনে মনে তাই একখান গান ধরে সুখো। তেমন কিছু না, বাংলা ছবির গান। গান গাইতে গাইতে আলু-কাঁচকলা কেটে নেয় ও। চচ্চড়ি নামিয়েই মাছের ঝোলখানা বসিয়ে দেবে। এরকম গরমের দিনে কাঁচাকলার ঝোল খেয়ে যে কী আরাম! সুখোর বর অবশ্য খেতে বসেই ভুরু কোঁচকাবে। তা কুঁচকাগগে যাক, সবার মন জোগাতে গেলে জীবন চলবে না সুখোর।

উনোনের তাপে ওর ডানহাতখানা গরম হয়ে উঠছে। সুখো তবু উনোনের পাশেই শিল পেতে মশলা বাটছে। জিরে-ধনে আর শুকনো লঙ্কার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বাড়ির উঠোনে। এমন গন্ধে সুখোর ছেলেবেলা থমকে আছে। তাই তো সুখো বাটনা বেটে মাছের ঝোল রাঁধে! টগবগ করে ঝোল ফুটছে ওই। ভাত এক ফুট দিয়ে নামানো আছে। আরেকবার বসিয়ে দেবে। ভাতের ভেতর থেকে ডালসেদ্ধর কৌটোখানা বের করে নেয় ও। জল ঢেলে ঢেলে ঠান্ডা করছে খানিক। ডালে বাগাড় দেওয়া হলে উচ্ছেপাতার বড়া করবে। ব্যস! পাতলা ডালে এক ফালি লেবু ডলে নিয়ে উচ্ছেপাতার বড়া দিয়ে খেতে কী যে আরাম! সকাল সকাল নেহাত মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল। আর ক'খান বেশি পাতা তুলে আনলেই হত ভন্টাদের বাড়ির ওপাশ থেকে। তা মাথা গরম হবে নাই-ই বা কেন! না বাপু, অক্ষয় তৃতীয়ায় সরষে বেটে কাসুন্দি করতে পারবে না সুখলতা। সে তোমরা যা পারবে করে নাও! শ্বশুরের এই ইতিহাসের পাতা থেকে রান্না খুঁজে খুঁজে বের করার স্বভাব মোটে পছন্দ নয় সুখোর। সে তোমরা যা খুশি ভাবতে পারো! এই গাঁয়েও তো দিব্যি কাসুন্দি কিনতে পাওয়া যায়, তা যাও না, কিনে খাও না! বাড়িতে একখান বউ আছে বলেই কি তাকে সব করতে হবে! শাশুড়ি মা সগ্‌গে গিয়ে বেঁচেছেন। এতই যদি খাওয়ার সাধ নিজেরাই তো খানিক খানিক শিখে নিলে পারো। সেকথা কি আর বলতে ছেড়েছে সুখো! সেই এক কথা, এসব কি আর পুরুষমানুষের কাজ! শুনলে পিত্তি জ্বলে যায় সুখোর। তা মেয়েমানুষের কাজ কি কেবল বোশেখের দিনে কাঠের জ্বাল ঠেলা!

এসব ভাবতে ভাবতে এই আমাদের সুখলতা আরও দু’মগ ঠান্ডা জল ঢালে মাথায়। জল ঢালতেই খিদেটা এবারে চনমনিয়ে ওঠে ওর। এখন এই খিদে চেপে সেই শেষবেলায় খেতে হবে ভেবেই আবার মাথায় আগুন জ্বলে ওর। চুল আঁচড়ে চারটে মেরি বিস্কুট খেয়ে নেয় তাই। ভাতের খিদে কি মানুষের মেরি বিস্কুটে মেটে! সুখো তাই এক গেলাস জল খেয়ে নেয় এবারে। জল-টল খেয়ে সুখো ভাত বাড়তে বসে। ভাতের থালা সাজাতে সাজাতে ওর ঘুম নামে এবারে। নাহ্‌, শরীরটা জ্বালালে দেখছি!

শ্বশুরমশাই ভারি যত্ন করে ডাঁটাচচ্চড়ি খাচ্ছেন। এখন খানিক খারাপই লাগছে ওর, বুড়ো মানুষটাকে অমন করে না বললেই হত! কাসুন্দি বানানো তেমন করে শেখা হয়নি, একথা তো আর বলা যায় না! সুখো তাই আরেক হাতা ভাত তুলে দিতে দিতে বলে, বিকেলে খানিক সরষে এনে দেবেন বাবা? সুখোর শ্বশুরমশাই একথার কী উত্তর দেবেন ভেবে পান না বুঝি। সুখো তাই স্পষ্ট করেই বলে, ভাবছি কাসুন্দি বানাব। ওপার থেকে খানিক হতাশা ভেসে আসে বোধহয়। অক্ষয় তৃতীয়াই পেরিয়ে গেল! এখন আর কী! জানেনই তো সুখোর মাথায় খানিক ব্যারাম, সুখো তাই বলে বসে, এর আর দিন-অদিন কী! অক্ষয় তৃতীয়া তো মনে! তাই না বাবা! নাও তোমরা এমন পাগল মেয়ের অনাছিষ্টি কথার কী বিহিত করবে করো!

লিখেছেন
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।