ধান কাটতে কাটতেই ভাত খাওয়া ফজল আলিদের

জষ্টিমাস পড়তে পারল না কেমন জল হতে লেগিছে দেখ দিকি! সময় নেই, অসময় নেই, ঝড়বাদলে জেরবার মানুষের জেবন। এমন জেবন নে মানুষ পারবে ক্যামনে বলো! রোজার দিনে আগুনের তাপে মানুষের ছাতি ফেটে গেল, কত মানুষের রোজা ছুটে গেল, আকাশের দেবতা মুখ ফিইরে নেলেন। সে আগুনে চুলোর কাঠের মতো ভাজা-ভাজা হতে হতে মানুষ যখন কেলান্ত, তখন ইদের সকালে আকাশ কাঁপিয়ে ভেস্যে গেল চরাচর। খোদাতালার ওপরে মানুষের হাত নেই, একথা এ-গাঁয়ের ছেলে-বুড়ো, ও গাঁয়ের ভাতিজা সকলে একবাক্যে কবুল যাবে। ইদগাহ-র মাঠে মানুষের তাই আর জায়নামাজ পেতে বসা হলো না, বড় মসজিদেই ইদের নামাজ হলো। সে তমার যত বড়ই মসজিদ হোক না কেন, আকাশের তলে বসে ঈদের নামাজ না পড়লে কি ভালো লাগে! সেই আকাশ কাঁপিয়ে দেখ, কেমন ঝড়বাদল হতি লেগেছে।

 

মাঠে মাঠে এখন পাকা ধানের মরশুম। মাঠের ধান এখনও ঘরে তুলতে পারেনি চাষি। এ তোমার কেমন বিচার কী জানি! কেটে রাখা ধান চুবচুবিয়ে ভিজে সার হলো কত মানষের। সে ধান আবার সূয্যি উঠলি পর উল্টে-পাল্টে বেঁধে দিতে দুই বেলা গেল! এমন দিনে কি চাইলেই হাতের কাছে মুনিষ, বাগাল পাওয়া যায়! খরার ধানে ঝামালি বড় বেশি। আয় দেয় বটে, তবে ঘরে না তুললি আর আয় কী, ব্যয় কী! সেই কোন ভোরে ফজল আলি মাঠে এসেছে, এসেছে ও-পাড়ার হারু, নোটে। মাঠে মাঠে এখন কেবল জলের খবর। ঘরে ঘরে এখন বাপের জন্য, ভাতারের জন্য ভোর ভোর পান্তা সাজানোর তোড়জোড়। মুড়ি কি আর মানষের প্যাটে থাকে! কাজকাম না থাকলি ফজল আলি এমন ফাস্ট সকালে চাট্টি গরম ভাতে মরিচ জলে খায়। শীতের দিনে কাঁটা বেগুনের সালন দিয়ে ভাত খেতে মজা কত! বোশেখের দিনে বরং জালি কুমড়োর পাতলা ঝোল খেতে মন চায়। তা এত ভোরে মাঠে আসতি হলে কোথায় গরম ভাত কোথায় কী! রাতে রাতে তাই মুঠোখানেক চাল বেশি নেয় ওর মা।

 

সেদিন তো আর নেই! স্বর্ণ আর ছত্তিরিশ এখন মাঠে মাঠে। ফজল আলির নানা পানি-কলসের চাষ দিত বিঘেখানেকে। সে ভাতে পান্তা খেতে সুখ কত! এখন যাতে পান্তা, তাতেই মাড় ভাত, তাতেই খিচুড়ি। সেদিন কি আর আছে! খেজুরছড়ির মুড়ি ভাজা সেসব দিন মনে পড়ে ফজল আলির মায়ের। সেসব কথা মনের মধ্যে একেকখানা জেবনের দাস্তান বুনি দিতি চায়। সে দাস্তানে মন ডোবালে চলবে ক্যামনে বলো!

 

আরও পড়ুন:ভাতের খিদে কি মানুষের মেরি বিস্কুটে মেটে? 

 

পোলায় গেছে মাঠে, সেই কোন ফাস্ট সকালে! মায়ে তাই অ্যালুমনিয়ামের ক‍্যানে পান্তা ঢালছে। লবণ দে, নুন দে, কাঁচা মরিচ দে- ডলে ডলে পান্তা খাবে ছেলে। জলে ডোবা ভাতের ওপরে তাই আলু-সানার বাটি ভাসিয়ে দিচ্ছে মা। কেমন নৌকার মতো আলু-সানার বাটি ভাসছে দেখো! জলে-কাদায় মাখামাখি ক্ষেতের পাশটিতে বসে জলে ডোবা ভাত খাবে ফজল আলি। জলে জলে ফারাক কত কও! এই জলেই মানষের ব্যাবাক ধান নষ্ট, আবার এই জলেই ভাতের জেবন কেমন পান্তার মধ্যে থিতু হয়ে আছে। ফজলের ভাত খাওয়া দেখতি দেখতি নোটে ঘাড় উঁচু করে ওদিকপানে চায়। ঘরের লোকের উপর ভারি রাগ হতে থাকে ওর। মরদের খিদে বোঝে না, এ আবার কেমন বউ! মায়ের ওপর রাগ হয়, বউয়ের ওপর রাগ হয়, রাগ হয় হাতের কেস্তেখানার ওপরেও। প্যাটের খিদে নোটের মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়।

 

ধানের গোছা কেটে নিতে নিতে নোটে আকাশ দেখে। এসব দেখতে ওর খাবার এসে পড়ে। চিকচিকি খুলে মুড়িতে-ঘুঙনিতে বেশ জম্পেশ করে মেখে নেয় ও। কষের দাঁত দিয়ে মরিচে কামড় বসায়। খেতে খেতে মা-বউ-বাড়ির নেড়িকুকুর- সক্কলের ওপর থেকে ওর রাগ গড়িয়ে পড়তে থাকে ওই আকাশের মেঘ ধোয়া জলের মতো। কাঁদড়ের জলে হাত ধুতে ধুতে আকাশের ভাবখানা বুঝবার খানিক চেষ্টা করে ও। ফজল আলি অবিশ্যি একমনে ধান কাটতে লেগেছে। পাঁজা করা ধান গোছানো হলেই বাড়ির তে-মোষের গাড়িখান নিয়ে আসবে। মোষেরা তখন আলে আলে চড়ে নতুন জলের নরম সবুজ ঘাস ছিড়ে ছিড়ে খাবে। তবু ভাবলেই কি আর হয়! কাজ যেন ফুরোতিই চায় না গো! হাতের কেস্তে হাতেই রয়ে যায়।

পশ্চিম আকাশে ধোঁয়া ধোঁয়া ভাব। তবু আকাশের গোড়া এখনও খালি, এটুকুই ভরসা! দুপুরের ভাতও আজ মাঠেই খেতে হবে লয়? এমন প্রশ্ন করে বসে ও তাই আচমকা। নোটে বোঝে, ফজলের খিদা লাগছে। খিদা লাগলে কি মানুষ আর পারে! দু'-কাঠায় এবারে অল্প করি বাদাম বুনেছিল, সেগুলো বোধহয় গেল! আফসোস আর আফসোস! জেবনটাই আফসোসে ভরা। তবু ভালো, ফজলের ভাতিজা ভাতের টিপিনখানা নামিয়ে দে' গেল এইমাত্তর। হাতের কাজ খানিক সামলে নে ফজল ভাত খাবে খানিক পরে। প্যাটে কুনকুনায়, ফজল তবু আকাশ দ্যাখে আর হাত চালায়। নোটে, হারু বাড়ি গেল ওই। ফজল এবারে কেস্তেখান নামিয়ে রেখে বেশ করে হাত মুখ ধুয়ে নেয়। ধানের ক্ষেত থেকে কী আশ্চর্য যে একখান ভাপ উঠতে থাকে, সে ধান যে কাটে সেই জানে গো। সেই ভাপে ফজলের মুখ-বুক তেতে উঠেছে খুব। আলের ধারটিতে আকাশমণি গাছের তলে বসে ফজল খাচ্ছে ওই। গোটা গোটা ভাতে চাপ চাপ লালতে শাকের ডাল মেখে হুসহাস করে ভাত খাচ্ছে জোয়ান ছেলে ফজল আলি। কমলা কমলা পাকা পটল পুড়িয়ে কেমন সুন্দর করে মেখেছে ওর মা! ওই দিয়েই থাল থাল ভাত খেয়ে নিতে পারে ও। এতেই কি শেষ আছে! কাল রাতের বাসি মুরগি ভুনা ভুনা করে ভেজে দেছে মায়ে। নাক টানতে টানতে ভাত খাচ্ছে মায়ের ব্যাটা ফজল আলি। মেঘ, শালিখ, বুলবুলি আর ফিঙেরা দেখছে সেসব। ভরা প্যাটে ওই আলের ওধারে গামছা পেতে ফজল এখন নামাজ পড়বে। আহা! এমন সোনালি শস্যের ওপারে কোন সে পশ্চিমের মেঘের রঙ ছড়িয়ে পড়েছে ফজলের মুখে। ভরা প্যাটে মানুষের মুখ বড় সুন্দর। আহা! খোদাতালার পিরথিবিতে মানুষের ভাত জুটে যাক, আলুসানা জুটে যাক। এটুকুই তো! ফজল ওই কেস্তে হাতে নেমে যাচ্ছে মাঠে। ওই যে…

More Articles

;