অসুখী ভারতের বিবাহিত মহিলারা, তবু কেন বিচ্ছেদ না-পসন্দ তাদের?

সমীক্ষকরা জানাচ্ছেন, বিবাহবিচ্ছেদের হারের নিরিখে ভারত তালিকার সর্বনিম্ন দেশ হলেও গত দু'দশকে এদেশে বিবাহিত নারী-পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে।

Arnab Dutta
৪ মিনিট
অসুখী ভারতের বিবাহিত মহিলারা, তবু কেন বিচ্ছেদ না-পসন্দ তাদের?

বৈবাহিক জীবনে নারী-পুরুষের সম্পর্ক নির্ভর করে অনেক বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সমঝোতা এবং দায়বদ্ধতা অন্যতম প্রধান বিষয়। বৈবাহিক জীবনে বিচ্ছেদের হার প্রসঙ্গে নানান সমীক্ষা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি-র একটি সমীক্ষার ফলাফল ভারতের পক্ষে ভরসার কথা হতে পারত। ওই সমীক্ষা অনুসারে, পৃথিবীর অন্য দেশগুলির তুলনায় ভারতে বিবাহবিচ্ছেদের হার সর্বনিম্ন। প্রতি এক হাজার বিয়ের মধ্যে ১৩টি বিয়ের পরিণাম বিবাহবিচ্ছেদ। বাকি ক্ষেত্রে বিয়ে টিকে থাকছে। ভারতের মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক এগারো শতাংশ নাগরিক বিবাহবিচ্ছিন্ন।

সমীক্ষা যাই-ই বলুক না কেন, পিতৃতান্ত্রিক ভারতীয় সমাজে মহিলাদের প্রতি বঞ্চনা আজও চিন্তার বিষয়। বৈবাহিক জীবনেও মহিলারা লাগাতার পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকারগুলি এবং স্বেচ্ছাসেবীরা।

প্রাসঙ্গিকভাবে আরও কিছু প্রশ্নও উঠছে। বিবাহবিচ্ছেদ হ্রাসের নিরিখে সারা পৃথিবীর চেয়ে ভারতের সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক ফলাফল সত্যিই কি শুভ লক্ষণ? একই ছাদের নিচে বিবাহিত নারী-পুরুষ কি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সুখে দিনযাপন করছেন? নাকি বিবাহবিচ্ছেদকে যেহেতু আজও ভারতীয় সমাজে বাঁকা চোখে দেখা হয়, সেকারণে মনের অমিল হলেও মেনে নিচ্ছেন দম্পতিরা? বিশেষত মেয়েরা।

বিবাহবিচ্ছেদের পরে ভারতীয় সমাজে মহিলারা নানা ধরনের বিপদে পড়েন। এদেশে বিয়ে করতে হলে সামাজিক অনুষ্ঠান পালন করাও ব্যয়বহুল। এরপর যদি সেই বিয়ে ব্যর্থতা-বিচ্ছেদে পর্যবসিত হয়, অভিভাবকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ তাতে বাড়েই। স্বেচ্ছাসেবীদের মতে, এজন্য অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতন সয়েও মহিলারা সহজে বিয়েটা ভাঙতে চাইছেন না। তবে বিয়ে না ভাঙলেও পরিবারের অন্দরে অশান্তি কমছে না। উপরন্তু বাড়ছে। আর মধুর দাম্পত্য তিক্ততায় পর্যবসিত হচ্ছে।

বিবাহবিচ্ছিন্ন মহিলারা অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক পরিসরে, এমনকী, পরিবারে এবং বন্ধুবান্ধবদের কাছেও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। একারণে যতই অশান্তি চলুক, দাম্পত্য সম্পর্ক 'যা আছে তাই থাক' মেনে নিয়ে নীরবে চোখের জল ফেলছেন বহু মহিলাই। পিতৃতান্ত্রিক নিগড়ে আবদ্ধ ভারতে কেন বিবাহবিচ্ছেদের হার কম, এর কারণ নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন সমাজবিজ্ঞানীরা। আশাপ্রদ তেমন কোনও তথ্য মেলেনি। বরং দেখা গিয়েছে, সন্তানের ভরণপোষণ, পারিবারিক সমর্থন না পাওয়া অথবা সমাজ বাঁকা কথা বলবে, এইসব নানা কারণে মেয়েরা চট করে বিবাহবিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন না। মেনে এবং মানিয়ে নিচ্ছেন। না হলে বিবাহবিচ্ছেদের হারের ক্ষেত্রে ভারত তালিকায় সর্বনিম্ন থাকার সমীক্ষালব্ধ ফলাফল দেশের পক্ষে অতীব শুভ খবর হতে পারত। আসলে একেই বলে, বিধি বাম!

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
নেই নিজস্ব রোজগার! সংসারেই সময় কেটে যায় বেশিরভাগ ভারতীয় মহিলার

ভারতীয় নাগরিক মহিলাদের ভেতর অনেকেই করোনা পরিস্থিতিতে জীবিকা খুইয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারি তথ্য অনুসারে, করোনা পরিস্থিতিতে কাজের বাজারে থাকা মহিলাদের হার রেকর্ড সংখ্যক কমেছে।

প্রতি এক হাজার বিয়ের মধ্যে ১৩টি ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের যে ঘটনাগুলি ঘটছে, সেই সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুসারে, স্বামীর আচরণের বিরুদ্ধে প্রথমে অভিযোগ তুলছেন স্ত্রী-ই। এদেশের মেয়েরা শিক্ষাদীক্ষায় পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন। মহিলাদের মধ্যে একাংশ এখন শিক্ষিত ও স্ব-নির্ভরও। সমাজের এই শ্রেণির মহিলারা শহরাঞ্চল অথবা শহর-সংলগ্ন এলাকাগুলির বাসিন্দা। এই এলাকাগুলিতেই সর্বাধিক বিবাহবিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে গ্রামাঞ্চলের তুলনায়। তাছাড়া বিবাহবিচ্ছেদের আগে-পরে অনেক মহিলার মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি হচ্ছে। এদিকে অস্তিত্বরক্ষার তাগিদে মহিলারা পুরুষ সঙ্গীটিকে ত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোনও উপায়ও দেখছেন না।

কোন পরিস্থিতিতে বিবাহিত নারী-পুরুষের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা নিয়ে কাজ করেছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। এ-ব্যাপারে ভারতে চলা প্রত্যেক সমীক্ষাতেই মোটামুটিভাবে একই ধরনের কারণ উঠে এসেছে। একনজরে দেখে নেওয়া যাক, আধুনিকতার এই ঢক্কানিনাদ এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রবল অগ্রগতির যুগে কেমন আছেন বিবাহিত ভারতীয় মহিলা সমাজ।

একেবারেই ভালো নেই। সমীক্ষা জানাচ্ছে, ৩৩ শতাংশ ক্ষেত্রে স্ত্রী প্রায়ই স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিয়ের পর স্ত্রীকে মারধর করাটা পুরুষের কাছে ভারতে এখনও জলভাত। অন্যদিকে, এদেশের নাগরিক ৫০ শতাংশ পুরুষ বিয়ের পরেও তাঁদের বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকেন। অনেক সময়ই দেখা যাচ্ছে, ছেলের বউয়ের সঙ্গে শ্বশুর-শাশুড়ির সম্পর্ক নানা কারণে খারাপ হচ্ছে। অন্যতম প্ৰধান কারণ শ্বশুরবাড়িতে ছেলের বউয়ের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছেন ওঁরা।

ভারতে বিবাহবিচ্ছেদ সংক্রান্ত মামলায় কয়েক বছর আগে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মন্তব্য স্মরণীয়। বিচারপতিরা বলেছিলেন, বিবাহবিচ্ছেদ আটকাতে সুপ্রিম কোর্ট কি বেডরুমে ক্যামেরা লাগানোর ব্যবস্থা করবে? সে তো অসম্ভব। সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ অতি স‌ংগত। কারণ দেখা যাচ্ছে, পুরুষরা বেডরুমেও বিবাহিত স্ত্রীর প্রতি এমন আচরণ করছেন, যেন স্ত্রী তাঁর কেনা দাসী। অনেক ক্ষেত্রে আবার বিবাহিত নারী-পুরুষের জীবনে পরকীয়া প্রেম ঢুকে পড়ায় বিবাহবিচ্ছেদ ঘটছে। বিবাহবিচ্ছেদের আরেক কারণ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মানসিক সম্পর্ক গড়ে না ওঠা। এছাড়া যৌন হতাশার কারণেও বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।

একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, ভারতীয় সমাজে বিবাহবিচ্ছেদের যে ঘটনাগুলি ঘটছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েটি মা হয়ে যাওয়ার পরেই। এতে বিবাহবিচ্ছিন্না ওই মহিলার জীবনে চাপও যে বাড়ছে, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

স্বেচ্ছাসেবীদের মতে, বিবাহবিচ্ছেদ হতেই পারে। তাতে জীবন সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ফের জীবনের নিয়মেই জীবন নতুন পথে এগিয়ে চলবে। তিক্ততার স্বাদ পেলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের পরে মিলে যাচ্ছে সুখী জীবনযাপন করার মতো আরেকজন সঙ্গী।

আন্তর্জাতিক সমীক্ষাগুলিতে এও দেখা যাচ্ছে, ভারতের বাসিন্দা পুরুষদের ৭৩ শতাংশ প্রেম করে বিয়ে করায় আস্থাশীল নন। তাঁরা সম্বন্ধ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে ইচ্ছুক। এতে মূল অসুবিধা হলো, নারী-পুরুষের পরস্পরকে আগেভাগে জানাবোঝার তেমন কোনও সুযোগও থাকছে না।

ভারতের বিবাহবিচ্ছেদের হার ১ শতাংশ। এছাড়া দুনিয়ার অন্য কিছু দেশে বিবাহবিচ্ছেদের হার সম্পর্কিত তথ্য দেখে নেওয়া যাক। যেমন, চিলিতে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৩ শতাংশ, কলম্বিয়ায় ৯ শতাংশ, মেক্সিকোতে ১৫ শতাংশ, তুরস্কে ২২ শতাংশ। এই দেশগুলিতে বিবাহবিচ্ছেদের হার তুলনায় কম বিশ্বের অন্য কিছু দেশের তুলনায়। যেমন, লুক্সেমবার্গে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৮৭ শতাংশ, স্পেনে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৬৫ শতাংশ, ফ্রান্সে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৫৫ শতাংশ, রাশিয়ায় ৫১ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহবিচ্ছেদের হার ৪৬ শতাংশ।

সমীক্ষকরা জানাচ্ছেন, বিবাহবিচ্ছেদের হারের নিরিখে ভারত তালিকার সর্বনিম্ন দেশ হলেও গত দু'দশকে এদেশে বিবাহিত নারী-পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপক অবনতি হয়েছে।

লিখেছেন
Arnab Dutta
Arnab Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।