এ কেমন 'খেলা হবে'! গেমিং অ্যাপ দুর্নীতির সাত কোটি উদ্ধার কলকাতায়, কালো টাকার রাজত্ব অব্যহত?
App Gaming Scam: আবার ফাঁস হলো কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি!

সদ্য ক্লাস সেভেনে পড়ে ছেলে। অনলাইন গেমিংয়ে পটু বাচ্চা ছেলেটি বাবার ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে এক লক্ষ টাকার গেমের সামগ্রী কিনেছে। এই খবর জানতে পেরে তো কপালে হাত ভদ্রলোকের। এ কোনও বানানো কথা নয়, একেবারেই সত্যি ঘটনা। অনলাইন গেমিংয়ের যুগে গাঁটের কড়ি খরচ করে গেম খেলা এবং প্রতারণার খপ্পরে পড়ার কথা প্রায়শই শোনা যায়। এমনই এক অ্যাপের খোঁজ পেয়ে ১০ সেপ্টেম্বর সাতসকালে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরটের (ইডি) আধিকারিকরা হানা দেন গার্ডেনরিচে। শেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গার্ডেনরিচের এক ব্যক্তির বাড়ি থেকে অন্তত আট কোটি টাকা উদ্ধার করলেন ইডির আধিকারিকরা। টাকার অঙ্ক আরও বাড়তে পারে মনে করে ইতিমধ্যেই ব্যবসায়ীর বাড়িতে টাকা গোনার মেশিন আনা হয়েছে। সূত্রের খবর, শুধু গার্ডেনরিচ নয়, এদিন সকাল থেকেই কলকাতার নিউটাউন, পার্ক স্ট্রিট, মোমিনপুরের বন্দর এলাকাতেও তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে ইডি আধিকারিকরা।
অনলাইন গেমে প্রতারণার ছক
১০ তারিখ সকাল সকাল গার্ডেনরিচের পরিবহণ ব্যবসায়ী নাসির খানের বাড়িতে হানা দেয় ইডি আধিকারিকরা। সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী সম্পূর্ণ এলাকা ঘিরে ফেলেন। সূত্রের খবর, ব্যবসায়ীর ছেলে আমির খান ই-নাগেটস নামে একটি অনলাইন গেমিং অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছেন। ওই অ্যাপ ব্যবহার করেই মানুষের থেকে কোটি টাকা নিয়েছেন ব্যবসায়ী। প্রথমদিকে খুব সামান্য অর্থ বিনিয়োগ করে গেমটি খেলার সুযোগ পেতেন ব্যবহারকারীরা। প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার টাকা জেতার টোপ দেওয়া হতো। কমিশনের নামে পাওয়া যেত মোটা অঙ্কের টাকা।আবার খেলায় জেতা অর্থ সহজে তুলেও ফেলতে পারতেন অ্যাপ ব্যবহারকারীরা। ফলস্বরূপ মানুষের বিশ্বাস বাড়তে থাকে এই গেমের প্রতি এবং বেশি পরিমাণে অর্থ বিনিয়োগ করতে শুরু করেন তাঁরা। কিন্তু সময় গড়াতেই মানুষের ভুল ভেঙে যায়। কিছু সময় পরে দেখা যায়, অ্যাপের থেকে আর টাকা তুলতে পারছেন না কোনওভাবেই। নানা বাহানায় কেবল মানুষকে বোকা বানাচ্ছে এই অ্যাপ। কিছুদিন পর দেখা যায়, অ্যাপ ব্যবহারকারীদের সকলের তথ্যই মুছে গেছে সার্ভার থেকে। ব্যস! জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায় পুরো বিষয়টা। তবে ততদিনে এভাবে বাবা-ছেলে মিলে বিশাল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয় ব্যবহারকারীদের থেকে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Justice Abhijit Gangopadhyay: ৫ দিনের মধ্যে বাস মালিককে জরিমানার টাকা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। জরিমানা না দিলে এজলাস থেকে সটান জেলে পাঠানোর কড়া হুঁশিয়ারিও দেন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।
এরপরেই গত বছরের ফেব্রয়ারিতে দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন থানায় এই অ্যাপের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়।সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যবসায়ী নাসির খানের বাড়িতে হাজির হন ইডি-র আধিকারিকেরা।
গার্ডেনরিচে দিনভর নাটক
নিসারের দোতলা বাড়ির খাটের তলা থেকে প্লাস্টিকের থলিতে মোড়া ৫০০ টাকার অসংখ্য নোটের বান্ডিল পাওয়া গেছে। বেশ কিছু ২০০০ টাকার নোটের বান্ডিলও মিলেছে। অভিযান শুরুর তিন ঘণ্টার মাথায় আট কোটি টাকা উদ্ধার করেছে ইডি। প্রায় আট ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তল্লাশি অভিযান চলছে নাসিরের বাড়িতে। কিন্তু ইডি-র ধারণা আরও বাড়তে পারে অর্থের পরিমাণ। ইডি-র ধারণা, নাসির ও তাঁর ছেলে আমির মানুষকে বোকা বানিয়ে প্রায় ৬৫-৭০ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলেছেন। এখনও পর্যন্ত মোট আটটি নোট গোনার মেশিন পৌঁছেছে গার্ডেনরিচে। স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া-র আধিকারিকরাও পৌঁছে গিয়েছেন সেখানে। প্রাপ্ত টাকার উৎস কী তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি ব্যবসায়ী ও ছেলে। এমনকী, টাকার কোনও বৈধ নথিপত্রও দেখাতে পারেননি নাসির। এখনও পর্যন্ত জানা গেছে, নাসির আমদানি-রফতানির ব্যবসা করে। নিউটাউন ও হাইড রোডে তাঁর অফিস রয়েছে বলেও জানা গেছে। অন্যদিকে, গোটা পরিস্থিতি দেখে ইডি-র অভিযানের মাঝেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন এক মহিলা। জানা যায়, ওই মহিলা নিসারের পরিবারেরই সদস্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক অতীতে রাজ্যের চাকরি-সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় তল্লাশি করতে প্রাক্তন মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী অর্পিতার বাড়ি থেকে প্রায় ৫২ কোটি টাকা উদ্ধার করে পুলিশ। তার রেশ কাটতে না কাটতেই ফের একবার নোটের স্তূপ উদ্ধার হতে দিনভর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তরজাও কিছু কম হয়নি। পরস্পরের দিকে দোষারোপের আঙুল তুলেছেন রাজনৈতিক দলগুলি। তৃণমূলের তরফে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, কেন্দ্রীয় এজেন্সি দিয়ে বাংলার নেতা মন্ত্রী তো বটেই, এখন ব্যবসায়ীদেরও টার্গেট করছে বিজেপি। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, কালো টাকার রাজত্ব গড়ে উঠেছে দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানীতে। ফলে ঘটনাকে কেন্দ্র করে জল আরও কত দূর গড়াবে, তার উত্তর মিলবে ভবিষ্যতে।
















