উদ্বোধন করতে এসেছিলেন নেতাজি, সব ঐতিহ্য মুছে 'মিত্রা' সিনেমা হল এখন শপিং মল
ঐতিহ্যের পীঠস্থানের নাম 'মিত্রা'। সেই স্মৃতিবিজড়িত কাঠামো মুছে ফেলে আজ সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বাজার কলকাতা।

৮৩, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, অর্থাৎ আজকের ব্যস্ত হাতিবাগানের বিধান সরণি।
একাকী পর্দার গমগমে আওয়াজ আজ হারিয়ে গেছে শপিং মলের ঔদ্ধত্যে। কয়েক মাস আগেও এই রাস্তার পাশ দিয়ে গেলেও উঁকি দিত সিনেমা হলের মানচিত্রে হৃদি ভেসে যাওয়া শহরের আকুলতা। ঐতিহ্যের পীঠস্থানের নাম 'মিত্রা'। অনেকদিন আগেই হলের শেষ আলোটা নিভিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন কর্মীরা। সেই স্মৃতিবিজড়িত কাঠামো মুছে ফেলে আজ সেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বাজার কলকাতা। পুজো এসে গেছে। ফলে ঐতিহ্যের দীর্ঘশ্বাসকে পাথর চাপা দিয়ে আজ সেখানে উৎসবের কলরোল।
ঝকঝকে মাল্টিপ্লেক্স, পপকর্ন-কোল্ড ড্রিংকস-সহযোগে নরম গদিতে ঠাসাঠাসি, পেল্লায় সাইজের সিনেপর্দা… এসবের যুগে সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমাওয়ালাদের হাহাকারটাই কোথায় যেন এক্কেবারে ব্রাত্য হয়ে গিয়েছে। শহরের ইতিকথায় ইট-কাঠ-পাথরের পাঁজরে গড়ে উঠেছে হাল ফ্যাশনের শপিং মল। তাতে থাকছে মাল্টিপ্লেক্স। কিন্তু ‘মিত্রা’ নেই। নেই পুরনো সেই ব্যালকনির রেলিং, নিচের চেয়ারে বসে থাকা দর্শকদের চিলচিৎকার। গলা ফাটানো আওয়াজ- 'হাম কিসিসে কম নেহি’। সভ্যতা এগিয়ে যায়, রেখে যায় ‘মিত্রা’-র ইতিকথা।
কালের নিয়মে আবেগেও যে ভাটা পড়ে। বোঝে না সে ঐতিহ্য-নবীনের ফারাক। মাল্টিপ্লেক্সের ভিড়ে বর্তমানে সিনেমা হলগুলোরও সেই একই পরিস্থিতি। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় দুশোটিরও বেশি সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সেই খাতায় আগেই নাম লিখিয়েছে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী 'মিত্রা’ সিনেমা হলও। যেখানে কিনা একসময় চলচ্চিত্রজগতের ডাকসাইটে নাম সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ-দের যাতায়াত ছিল। সেই 'মিত্রা' সিনেমা হলের অস্তিত্ব কলকাতার বুক থেকে উবে গেছে, পুরনো শহরটা শুধু ইতিহাসের ভার বহন করে চলেছে।
'মিত্রা’ নিশ্চিহ্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই শহরের বুকের থেকে কোন ইতিহাস মুছে গেল? একবার ফিরে দেখা যাক সেই দিনগুলো।
১৯৩০ সাল। স্বদেশি আন্দোলনে ততদিনে বাংলা উত্তাল। দিকে দিকে স্বদেশি পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ। প্রশস্ত হচ্ছে স্বনির্ভরতার পথ। ঠিক তেমনই একটা সময় পথ চলা শুরু হয়েছিল ‘মিত্রা’-র। কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা হল ‘মিত্রা’। যদিও তখন তার নাম ছিল ‘চিত্রা’। দু'বছর আগে চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায় 'মিত্রা' সিনেমা। আজ সেখানে মাথা তুলেছে শপিং মল। ন’দশক পেরিয়ে আসা সেই ঐতিহাসিক থিয়েটারকে গুঁড়িয়ে ফেলে নতুন করে গড়ে উঠেছে মল, মাল্টিপ্লেক্স।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মিত্রা ভাঙা হচ্ছে শপিং মলের জন্য। তালা পড়ে গেছে দর্পণায়। রাধা, উত্তরা, শ্রী ইতিহাস।
কথা হচ্ছিল স্বদেশি আন্দোলন নিয়ে। তিনের দশকের উত্তর কলকাতা তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের পীঠস্থান। বিলেত থেকে সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে দেশে ফিরলেন বীরেন্দ্রনাথ সরকার। সুখের জীবন, মোটা মাইনের চাকরির সুযোগ ফিরিয়ে দিলেন তিনি। মাথার মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে অন্য এক চিন্তা। ব্রিটিশ রাজের ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে বাঙালি যুবকদের জন্য। যেমন ভাবনা, তেমনই কাজ। নেতাজির অনুগামী বীরেন গাঁটছড়া বাঁধলেন দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ঠিক হল, ৮৩ কর্নওয়ালিস লেনে গড়ে তুলবেন প্রেক্ষাগৃহ। নাম, ‘চিত্রা সিনেমা হল’। সেই মতো লিজে জমিরও বন্দোবস্ত হয়ে গেল। জায়গা দিলেন উত্তর কলকাতার অন্যতম উদ্যোগপতি নীরেন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র।
সেই প্রেক্ষাগৃহের দরজা খুলে গেল ১৯৩০ সালের ২০ ডিসেম্বর। ইতিহাসের সাক্ষী হলো কলকাতা। কারণ তখনও পর্যন্ত কলকাতায় একাধিক সিনেমা হল থাকলেও, তা সবই নিয়ন্ত্রিত ব্রিটিশ সাহেব কিংবা পার্সি-মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের দ্বারা। এই প্রথম চলচ্চিত্রের ব্যবসায় পা দিল বাঙালিও।
সেদিন মানুষের ভিড়ে উপচে উঠেছিল কলকাতা। না, শুধু বাঙালি পরিচালিত সিনেমা হল— সেজন্য নয়। প্রেক্ষাগৃহের উদ্বোধন করতে এসেছিলেন খোদ সুভাষচন্দ্র বসু। ফলত ভিড় সামলাতে নাজেহাল হয়ে পড়েছিল বাংলার বাঘা বাঘা পালোয়ান থেকে শুরু করে লেঠেলরাও। প্রথম ছবি হিসেবে দেখানো হয়েছিল ‘শ্রীকান্ত’।
চিত্রা যখন দর্শকদের জন্য খুলে দেওয়া হল, তখন অতিথি হিসেবে এসেছিলেন নেতাজি। তিনি বীরেন্দ্রনাথ সরকারকে দু’টি অনুরোধ করেছিলেন। এক, সেদিনের অনুষ্ঠানের জন্য যেন ব্রিটিশ পুলিশের সাহায্যে নেওয়া না হয়। (হাজির ছিলেন পালওয়ান ও লেঠেলরা, ছিল না ব্রিটিশ পুলিশ)। দুই, ভবিষ্যতে যেন শুধুমাত্র বাংলা ছবি দেখানো হয়। মালিকপক্ষ বহুকাল তাঁর সেই অনুরোধ ধরে রেখেছিলেন। পরে অবশ্য বাণিজ্যিক কারণে হিন্দি ও ইংরেজি ছবি সেখানে দেখানো হয়। ততদিনে অবশ্য চিত্রা হয়ে গেছে মিত্রা।
১৯৬৩ সাল সেটা। চিত্রা-য় তখন দেখানো হচ্ছে ‘উদয়ের পথে’। সদ্য সিনেমা হলের মালিকানা পাওয়া হেমন্ত মিত্র ঠিক করলেন সপরিবারে দেখতে যাবেন সেই বায়োস্কোপ। ‘ল্যান্ড লর্ড বক্স’-এর বন্দোবস্ত তো রয়েইছে। তবে সিনেমা হলের দোরগোড়ায় পৌঁছে ফিরে আসতে হবে তাঁকে, ভাবতে পারেননি হেমন্ত। দর্শকদের চাহিদা মেটাতে ‘ল্যান্ড লর্ড বক্স’-এর টিকিটও বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল সেদিন।
তখনও জীবিত রয়েছেন নীরেন্দ্রকৃষ্ণ মিত্র। শেষ বয়সে এসে এমন অপমান সহ্য করতে পারলেন না। ঠিক করলেন বাড়ির কোনও সদস্যই আর পা রাখবে না ‘চিত্রা’-তে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, বদলে দেওয়া হবে সিনেমা হলের নাম।
মাস ঘুরতে না ঘুরতেই পুরো ভোল পাল্টে গেল প্রেক্ষাগৃহের। বদলে দেওয়া হল সিনেমা হলের সমস্ত সজ্জা। মালিকের উপাধি অনুকরণ করে নতুন নামে জন্ম নিল ‘মিত্রা’। দিনটা ছিল ১৯৬৩-র ১৫ এপ্রিল। পয়লা বৈশাখ। সেদিন নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন বিএন সরকারও।
তবে বদল থেমে থাকেনি সেখানেই। ১৯৬৩ সালের পর থেকে ক্রমাগত যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে একটু একটু করে নিজেকে পাল্টে নিয়েছে মিত্রা। একদিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছিল দর্শকাসনের সংখ্যা; তেমনই হার্কনেস স্ক্রিন, ডলবি সাউন্ড, পুশ-ব্যাক সিট— সব ক্ষেত্রেই আধুনিকীকরণের পথে হেঁটেছিল মিত্রা সিনেমা। বসেছিল শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রও। এমনকী, কলকাতায় ডিজিটাল প্রজেক্টরের ব্যবহার শুরু হয়েছিল মিত্রার হাত ধরেই। অন্য সব সিনেমা হলে তখনও আর্কল্যাম্প প্রোজেক্টর।
তবে এসবের পরেও মানিয়ে নেওয়া সম্ভব হলো না দ্রুত পাল্টে যাওয়া পরিপার্শ্বের সঙ্গে। দিন দিন কমছিল সিঙ্গল স্ক্রিনের জনপ্রিয়তা। কমছিল দর্শকদের আনাগোনাও। কাজেই ২০১৯ সালে দরজা বন্ধ করেছিলেন বর্তমান মালিক দীপেন মিত্র। আশা ছিল, আবার একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবে ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হলটি। সঞ্জীবনী এনে দেবেন কোনও না কোনও উদ্যোগপতি। হলো না সে আশা পূরণ। সেই গুড়ে বালি!
যে মিত্রায় দেখানো হয়েছিল ভারতের সর্বপ্রথম কার্টুন চিত্র ‘পি. ব্রাদার্স’, যেখানে আনাগোনা লেগে থাকত সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে উত্তমকুমারের মতো তারকাদের— সেখানেই আজ শপিং মলের দাপট। এই শহরের বুকে মিত্রা রেখে গেল না ইতিহাস সংরক্ষণের দাবি। বিদায় নিল ঐতিহ্যের দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে।
















