Film Review: পোস্তা ব্রিজ ভাঙার ভয়াবহ স্মৃতির সঙ্গে ভালবাসার গল্প মেশাল 'কলকাতা চলন্তিকা'
গাঢ় বুনন আর অনুভব আর আবেগের পাখায় ভর করা এক গল্প জানতে একবার দেখে ফেলা যায় 'কলকাতা চলন্তিকা'।

-স্যর, আপনি কি একা?
-কেন? তুমি কী করে বুঝলে?
-কনফিডেন্স স্যর! আমিও যে একা!
-আপনার পরিবার?
-আগুন নিয়ে নিয়েছে সব!
-আমার আয়লা, ঝড়!
('কলকাতা চলন্তিকা' ছবির সংলাপ)
বহমান জীবনের আবহে ক্রমশ একাকী পথের আলোয় চলতে চলতে একটুর জন্য থমকে যাওয়া যেন 'কলকাতা চলন্তিকা'। পাভেলের 'কলকাতা চলন্তিকা'। কলকাতা; একটি শহর, একাধিক স্বপ্ন। টুকরো টুকরো ভালবাসার, ভালো থাকার বুনন আর একটি ধ্বংসস্তুপে তলিয়ে যাওয়া রড, বালি, চুনসুড়কির মতো এক-একটি জীবন আর বিচ্ছেদকে যেন এক সূত্রে বেঁধে দিয়েছেন পাভেল। মাধ্যম এই ছবি। যে বুননে যোগ্য সঙ্গত দান করেছেন তাঁর ছবির অভিনেতা, অভিনেত্রীরা। অযাচিত চরিত্র, খানিকটা তড়িঘড়ি গল্প বলার ঝোঁকের সামান্য খুঁত বাদ দিলে পাভেলের 'রসগোল্লা', 'অসুর'-এর পর এই ছবিও যে বঙ্গের সিনেমামহলে শোরগোল ফেলতে পারে, তা নিয়ে অবকাশ নেই সন্দেহের।
এই ছবির বিশ্লেষণের প্রাকমুহূর্তে মনে পড়ে ২০১৬ সাল। ৩১ মার্চের সেই ভেঙে পড়া পোস্তা উড়ালপুল। এক সত্যঘটনা অবলম্বনে তেমনই এক ভয়ানক কিছু দিয়েই হয়তো শেষ হতে পারত পাভেলের 'কলকাতা চলন্তিকা'। নিমেষেই বলে যেতে পারত, সেই দিনের সেই ভয়াবহতা, ভালো না থাকার এক অবিস্মরণীয় গল্প, সত্যি কথা। নাহ্, পরিচালক তেমন করে এই বিষয়ে বললেন না। সত্য ঘটনা এবং একটি উড়ালপুলের ভেঙে পড়া, ক্ষতবিক্ষত ইতিহাসকে আলতো করে ছুঁয়ে গিয়ে দেখিয়ে দিলেন এক অন্য গল্প। যা বিচ্ছেদ, বেদনার থেকে বেশি সংসারের কথা বলে। জীবনের কথা বলে। ভালবাসার কথা বলে।
যখন সিনেমাটি শুরু হচ্ছে, একের পর এক চরিত্রের উপস্থাপন ঘটছে পরস্পর। অসুস্থ, মানসিকভাবে অপরিণত এক ভাই, বোনের কথা। যেখানে পুলিশকর্মী দেবী অর্থাৎ অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য এবং তাঁর অসুস্থ দাদার ভূমিকায় দেখানো হয়েছে অভিনেতা রজতাভ দত্তকে। দেবী সংসারের প্রতিকূলতা সামলে পুলিশের চাকরি করে। এদিকে যুবতী আদর বেসরকারি অফিসে কর্মরত (দিতিপ্রিয়া রায়), তারই অফিসের এক সহকর্মী আবেশের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে সে। এখানেই যেন ভাবুক সূত্রধারের ভূমিকায়, ছোট্ট করে নিজেকে উপস্থাপিত করেছে কবিদা (পাভেল)।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোনও কোনও সিনেমা কবিতা দিয়ে যায় হৃদয়কক্ষে, হল ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর। তেমনই এক অনুভূতি এনে দিল সম্প্রতি অভিনন্দন দত্ত পরিচালিত 'অনন্ত' ছবিটি।
এদিকে কলকাতার বস্তি, ব্রিজের তলায় বাস বাইচুংয়ের (সৌরভ দাস) প্রেম টুম্পার সঙ্গে (ইশা সাহা), যারা ঘর পাওয়ার আশায়, একচিলতে বসতি পাওয়ার জন্য যেতে পারে পার্টির মিছিলে। না জেনেও দিতে পারে স্লোগান। ওরাও ভালবাসে, নেশা করে বাইচুং। একচিলতে ঘর পাওয়ার জন্য, থাকার আস্তানার জন্য টাকা দিতে থাকে বাপ্পাকে।
রাজনৈতিক দলের দাপুটে নেতা বঙ্কিম (খরাজ মুখোপাধ্যায়)। তার চাকরি আছে। বাজারে দাপট আছে। সঙ্গে আছে দাবা খেলাও। এদিকে অধ্যাপক শিবাজী রোজ কলেজে আসেন। অনলাইন ক্লাস নেন কলেজে বসেই। সব (অনির্বাণ চক্রবর্তী)। এদিকে, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের বাড়িতে কাজ করে শোভামাসি (অনামিকা সাহা)।
কাট টু , একের পর এক চরিত্রের ঘনঘটা এবং দ্রুত একাধিক চরিত্রের উপস্থাপন ঘটেছে। আর এর মধ্যেই টুকরো টুকরো করে খেলে গিয়েছে প্রেম। যেখানে মধ্যবয়সের এক পুরুষের প্রেমে পড়েছে সহযাত্রী, প্রায় একই বয়সি দেবী। আবেশের জন্য অফিসের লিফ্টম্যান, সহকর্মীদের সাহায্যে আরও প্রেম বেড়েছে আদরের। কাগজকুড়ানি টুম্পার সঙ্গে প্রেম, সংসার পাতার স্বপ্ন দেখেছে নেশাখোর বাইচুং। শোভামাসিকে ভালবেসেছে, মায়ের মতো কাছে টেনেছে ঘুষখোর, উড়নচণ্ডী সিভিল ইঞ্জিনিয়ার।
প্রত্যেকের জীবনের চলার পথ এবং ভালবাসাকে এভাবেই একত্রিত করেছে 'কলকাতা চলন্তিকা'-র চিত্রনাট্য। গল্পের বুনন, অসমবয়সি হোক অথবা সমাজের তথাকথিত নিম্ন রুচির, নিম্ন অবস্থানের, প্রত্যেকেই ক্ষেত্রেই ভালবাসা হয়েছে এখানে মুখ্য, বাকিটা গৌণ।
যেখানে ভালবাসার ভরা এই মরশুমে জমে উঠছে গল্প, তখনই 'গীতবিতানের দিব্যি' দিয়ে ভালোবাসায় মেতে উঠেছে আবেশ, আদর।
টুইস্ট। জ্বলন্ত জীবনের গতিপথ বদলে দেওয়ার আচমকা আতঙ্কের মধ্যেই, সেই মুহূর্তেই যেন আচমকা সবটা শেষ করে দিল একটি সেতু। একটি উড়ালপুল। দ্বিখণ্ডিত করল ভালবাসার পথকে। ক্রমেই চুরমার করল সব। হাহাকার, চিৎকারের মধ্যেই ব্রিজের তলায় খুঁজে নেওয়া এক টুকরো গল্প। এখানেই নটে গাছটি মরতে পারত। কিন্তু তা করলেন না পরিচালক!
আর সমস্ত বিচ্ছেদ, দ্রুত ভেঙে পড়ার মধ্যেও প্রাণ, ভালবাসা জিইয়ে রাখল এক উদ্ভিদ। এক পাওয়ার আবহকে সঙ্গী করেই। এভাবেই একটি সেতু, ভেঙে পড়ার তীব্র দহন। ঘর হারানো। আবার চলে হওয়া একাকী শোভার ঘরে বাইচুং টুম্পার ঘর পাওয়া।
যেন, এক সম্পর্কের একাধিক রূপ, এক সুতোয় একাধিক বুননকে এখানে যেন মুখ্য করেছেন পরিচালক। যেখানে অধ্যাপক শিবাজীর একাকীত্ব আর এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা, আগুন, আমরি হাসপাতালের আবহ তুলে এনেছে একেকটি দুর্ঘটনা আর তার দায়ের কথা। তার বর্তমান ফলের কথা। একাধিক সত্তার বিচ্ছেদের কথা। ২ ঘণ্টা কয়েকমিনিট ধরে এভাবেই একের পর এক স্বপ্নকথা, সত্যকথা যাপন করেছেন পরিচালক। যেখানে একটু একটু রূপক হিসেবে আবর্তিত হয়েছে চলন্তিকার চরিত্রগুলি। সঙ্গতে সার্থকতা পেয়েছে ছবির গানগুলি। যেখানে কবিদাদার বলা শব্দগুলি মহিয়ান হয়েছে একাধিক আবেগের মাঝে। একাধিক ভালবাসার অন্দরে। একাধিক ভালথাকার বেদনার গহিনে।
আসলে এই ছবিতে শুধু এক সেতু নয়, তার অনুষঙ্গে, তার ছত্রে ছত্রে উঠে এসেছে সমকালের কথা, সাম্প্রতিক সময়ের একাধিক টানাপোড়েনের কথা। রাজনীতির কথা। সমাজের কথা। নানা রূপকে, কখনও রাজনৈতিক বঙ্কিম, তাঁর দল, চাকরি, প্রভাব, দুর্নীতি কখনও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের ঘুষ নিয়ে, পরিবারের চাহিদা পূরণ। ছোট ছোট আবহে যেন এই ছবি সমস্তকিছুর আড়ালে বলে দিয়েছে একাধিক কথা। যা সমগ্রতা জুড়ে একাধিক সত্তার প্রকাশ ঘটিয়েছে নিমেষেই। যা পরিণতি পেয়েছে একটি ব্রিজ ভাঙার রূপকে। যার প্রভাবে, অচিরেই পরিবর্তিত হয়েছে নেতা বঙ্কিম। ঘুষহীন পরবর্তী পথ বেছেছে ইঞ্জিনিয়ার।
এবার আসি এই ছবির প্রযুক্তিগত দিকে। ছবির প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে চিত্রগ্রহণ, সঠিক আবহসংগীত এবং ছবিতে গীতবিতানের দিব্যির মতো গান, অন্য মাত্রা যোগ করেছে। যেখানে একেকটি চরিত্র এবং তার সঙ্গে জড়িত ছোট ছোট কথকতা, পরিস্থিতির চিত্রায়ণ সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে ছবির চিত্রনাট্য, সংলাপ এমনকী, গানের কথা। যা বরাবর খেই হারাতে দেয়নি। যা এক মুহূর্তের জন্যও ছবির গঠনে অসুবিধার সৃষ্টি করেনি।
কিন্তু কলকাতা চলন্তিকা কি সম্পূর্ণ সার্থক? কোনও ছবিই যে সম্পূর্ণ সার্থক হবে, এমন ভেবে কোনও পরিচালক বা কলাকুশলীরা কাজ করেন না এখন। কারণ, প্রত্যেকটি সৃষ্টি দর্শন এবং দর্শকভেদে আলাদা আলাদা মর্যাদা পায়। এই ছবির ক্ষেত্রেও তাই। যেখানে একটি ছোট্ট ভালবাসা, সম্পূর্ণ ছবিতে ওর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আবহে (আদর, আবেশ) কেন কিরণ দত্তকে সংলাপহীন অভিনয়েও ব্যবহার করা হলো, সেটাও একটা ত্রুটি হিসেবে মনে হয়েছে। এছাড়াও এই ছবির গল্প বলার ক্ষেত্রে একটা তাড়াহুড়ো পরিলক্ষিত হয়েছে। সেটি সময় বাঁচাতে না কি অন্য কোনও কারণে, বুঝতে অসুবিধে হয় মাঝে মাঝেই। শোভামাসি (অনামিকা সাহা) ও সিভিল ইঞ্জিনয়ার-পর্বে শোভাকে আরও বিস্তারিত দেখানোর সুযোগ থাকলেও কেন তা না করে তুলনায় কম গুরুত্বের বিষয় হাইলাইট করা হলো ছবিতে, এটাও খানিকটা দৃষ্টিকটু লেগেছে। আবার অনবদ্য সৌরভের পাশে একপ্রকার কম গুরুত্বের চরিত্র ইশার প্রেসেন্স এই ছবিতে বেশ অমানানসই। উড়ালপুল ভাঙনপর্ব এবং পরবর্তীতে সেই সূত্রে নানা ঘটনার, আবহের চিত্রায়ণ, অভিনয়; এই ছবিকে অন্যতম করে তুলেছে।
তারপরও অনবদ্য চিত্রগ্রহণ, গানের ব্যবহার এবং রজতাভ, অপরাজিতা, সৌরভ, অনির্বাণ, ইশা, দিতিপ্রিয়ার মতো অভিনেতাদের অভিনয়ে গৌণ ভাঙা সেতু এবং মুখ্য ভালবাসার গল্প আরও জীবন্ত হয়েছে। যা বাংলা সিনেমার জগতে জ্বলন্ত। অভিনবও বটে। অর্থাৎ ভুলত্রুটি কাটিয়ে, শুধুই গাঢ় বুনন আর অনুভব আর আবেগের পাখায় ভর করা এক গল্প জানতে একবার দেখে ফেলা যায় 'কলকাতা চলন্তিকা'।
















