Film Review: সিনেমায় কবিতা পড়ার অনুভূতি, তীব্র ভালবাসার ছবি 'অনন্ত'

কোনও কোনও সিনেমা কবিতা দিয়ে যায় হৃদয়কক্ষে, হল ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর। তেমনই এক অনুভূতি এনে দিল সম্প্রতি অভিনন্দন দত্ত পরিচালিত 'অনন্ত' ছবিটি।

Shrabanti Mitra
৩ মিনিট
Film Review: সিনেমায় কবিতা পড়ার অনুভূতি, তীব্র ভালবাসার ছবি 'অনন্ত'

বিকেলের আলোর কাছে আমরা বড় ঋণী। যা কিছু বলা হয় না সারাদিনের যাপনে, বহু চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়া সেই সমস্ত শব্দই যেন বিকেলের আলো এসে শুষে নেয় তার আপন রঙে। আমরা ক্লান্ত হয়ে বসি সেই আলোর কাছে, মনের কথারা কার্নিশ ঘেঁষে বোগেনভেলিয়া হয়ে যায়। আমাদের আর কিছু বলা হয় না। আলোর মায়ায় স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি তারই দিকে, যাকে রোজ বিকেলে কিছু বলব বলে ভাবতাম। বলা হয়নি, কেবল সন্ধে হলেই অনন্ত অপেক্ষার ধোঁয়া উড়িয়েছি, তার ফিরতি পথের পাশে দাঁড়িয়ে।

সিনেমাকে কবিতা বলা যায় কি না, জানি না, তবে কোনও কোনও সিনেমা কবিতা দিয়ে যায় হৃদয়কক্ষে, হল ছেড়ে বেরিয়ে আসার পর। তেমনই এক অনুভূতি এনে দিল সম্প্রতি অভিনন্দন দত্ত পরিচালিত 'অনন্ত' ছবিটি। কেবল একটা হল, তাতে গুটিকয়েক কিছু মানুষ, একটা ছোট্ট প্রেক্ষাগৃহ পূর্ণ করে বসে আছেন। বাংলা ছবির পাশে দাঁড়ানোর নিয়মমাফিক প্রথাপালন নয়, নয় কোনও বড় ব্যানারের প্রযোজনায় খ্যাত বিজ্ঞাপনী জনপ্রিয়তার অংশ, কেবল আলো, ছায়া, অ্যাকশন, ক্যামেরার অনুভূতিপ্রবণতা, আর বহুদিন পর প্রেক্ষাগৃহে ঢুকে দু'দণ্ড শান্তি পাওয়ার মুহূর্ত, যা প্রতিদিন হাউজফুল করে চলেছে 'অনন্ত'-কে। অতিমারী-পরবর্তী সময় দাঁড়িয়ে এমন একটা আটপৌরে ছবি, অনেকেই আর ভাবতে পারেন না। কিন্তু পৃথিবী যতই কঠিন হোক, ভালবাসা নামক এক সুগভীর যাতনার কাছে আমরা সকলেই বাধা পড়ে যাই বারবার। আর সেই অনুভূতিকে নানা স্তরে দেখতেই আমাদের বারবার ফিরে আসা।

শিশুকালে মায়ের আঁচলে যে ঘ্রাণ জড়িয়ে ছিল, সে ঘ্রাণ আজও স্বপ্নে খুঁজে পাওয়া যায় প্রেমের ঝরনায় পা ডোবালে। মনে হয় পৃথিবীর সব শুষ্কতা বোধহয় বসন্ত পেল তারই অচেতন প্রভাবে। কলহ যা ছিল প্রতিদিনের পাপক্ষয়ে, তাও যেন ধুয়ে গেল স্বচ্ছ জলের আয়নায়।

ছবির একটি দৃশ্যে সোহিনী সরকার

এ ছবির মিষ্টু তেমন করেই দিয়েছিল এক রোরো নদীর খোঁজ। যে পাহাড়ি নদীর তীরে বসে তার কল্পপ্রেমের জলছবি আঁকত সে রোজ। কখনও পৌঁছে যেত আবার হাঁটতে হাঁটতে শিশুকালের অন্দরে। যেখানে জমে আছে আজও অপ্রাপ্তি আর অনাদরের অভিমান, এই দরজা ভেঙে বেরোতে পারেনি সে। ঘুরে বেড়িয়েছে বারবার তারই নাগপাশে, যা কিছু বড় বেশি করে সামাজিক এবং মেনে নেওয়াটাই একান্ত স্বাভাবিক, তার কাছে।

ভালবাসা বেড়ে ওঠে একভাবে, আর পরিণতি পায় অন্যভাবে, হয়তো যাপনের নিয়মই এমন। যে কারণে এই ছবির শুভও সরে আসে একদিন আলোর থেকে। কনে দেখা হলদে আলো যেদিন বকুলবিছোনো পথ ধরে ফুলের গাড়িতে পাড়ি দেয় নতুন জীবনকক্ষে, সেদিন নিজেকে বড় একা মনে হয় তার। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, "বলো তোমার নতুন মানুষ কেমন? সে কি রোরো নদীর তীরে ঘর গড়ে দেবে তোমায়?"

উত্তর আসে না। বিকেলের আলো আসে। একইভাবে প্রতিদিন।

ছবির একটি দৃশ্যে ঋত্বিক চক্রবর্তী

যে আলোর আঁচল মায়াময় মনে হত এতোদিন, তার থেকেই সরিয়ে নেয় শুভ আরক্ত দু'টি পা। আলোয় হাত পাতা বারণ বুঝি এবার থেকে? কিন্তু ভালবাসা তো সে কথা বলে না। যতবার বিষন্নতা কুঁকড়ে দেয় শরীর, ততবার আরও বেশি করে ভালবাসা যাপন করে তাকে। বলে যে নেই, তার আলো আছে, তার নদী আছে, আছে তার চলার পথের গন্ধ, তাকেই যাপন করো তুমি রোরো নদীর পাড়ে বসে। পা ডুবিয়ে ছন্দ নাও তার, একদিন ভালবাসা হয়ে আবার ফিরে আসবে সে, ততদিন তুমি অপেক্ষা করবে তো?

ছবি: অনন্ত

পরিচালক: অভিনন্দন দত্ত

অভিনয়: ঋত্বিক চক্রবর্তী, সোহিনী সরকার

লিখেছেন
Shrabanti Mitra
Shrabanti Mitra
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

কেতকী কুশারী ডাইসনের গবেষণায় রবীন্দ্রনাথের বর্ণান্ধতা: কবির দেখা রঙের পৃথিবীটা কেমন ছিল?

Ketaki Kushari Dyson about Rabindranath Tagore color blindness: ডাইসনের ক্ষেত্রে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’-এর ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ বয়সে তাঁর নিজের দৃষ্টিশক্তি গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছিল। ডাইসনের নিজের বিবরণ অনুযায়ী ১৯৫৯-৬০ সালে তাঁর চোখে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রোপচার হয়।

‘ভারতের সঙ্গে খাপ খায় না ধর্মনিরপেক্ষতা’: মোহন ভাগবতের দাবি কতটা সত্য?

Mohan bhagwat's anti secularism: উজ্জয়নীর যুব ধর্ম সংসদে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত বলেন, ধর্মনিরপেক্ষতা পশ্চিমা ধারণা, ভারতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর সঙ্গে এটি খাপ খায় না। সত্যিই কি তাই? মোহন ভাগবতের ‘সর্ব-পন্থ-সমভাব’-এর যুক্তি এবং আরএসএসের ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অবস্থানের প্রেক্ষিতে নিবেদিতা মেননের ‘মিসডিরেকশন’ তত্ত্ব কী প্রশ্ন তুলছে?

পাতে মাছ, হাতে ‘সনাতনী’ সার্টিফিকেট, কোনটা চায় বাঙালি?

Dhirendra Shastri fish meat controversy: বিতর্কের সূত্রপাত বাগেশ্বর ধামের ধর্মগুরু ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রীর মন্তব্যে। তিনি সম্প্রতি বাংলায় এসে দুর্গাপুজোর সময় হিন্দু বাঙালিদের মাছ-মাংস না খাওয়ার আহ্বান জানান। আমিষাশী হিন্দু বাঙালিদের ‘পাখণ্ডী’ বিশেষণ উপহার দেন।

ছবির পরিকল্পনা থেকে পলিফোনিক সুর: মণিদার যে কাজগুলি শেষ পর্যন্ত হলো না

Gautam Chattopadhyay: একদিন মণিদা বলল, ‘চল তো, জয়ন্ত বোসের বাড়ি যাব। ওকে দিয়ে ছবিতে একটা পলিফোনিক আবহ সংগীত তৈরি করাব।’ তখন আমরা দূরদর্শনের জন্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ তৈরি করছি—ময়মনসিংহ গীতিকার একটি জনপ্রিয় লোকপালা।

এক রাজকন্যার স্মৃতি যেভাবে হয়ে উঠল রাঢ় বাংলার মেয়েদের নিজস্ব উৎসব

Bhadu Festival: অবিভক্ত মানভূম জেলার পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেবের অপরূপা কন্যা ভদ্রেশ্বরী দেবীর অনূঢ়া অবস্থায় অকালে মৃত্যু ঘটে। রাজকন্যার এই আকস্মিক প্রয়াণে রাজার সঙ্গে প্রজাসাধারণও শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কন্যার স্মৃতি অমলিন রাখতে শোকার্ত রাজা রাজ্যজুড়ে এক বিশেষ উৎসব পালনের নির্দেশ দেন।

আলো দিয়ে অন্ধকার দেখাতেন, ব্যঙ্গ দিয়ে সমাজের মুখোশ খুলে দিতেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর

Gaganendranath Tagore: আধুনিক ভারতীয় শিল্পের প্রেক্ষাপটে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের অবদান বুঝতে হলে তাঁকে কেবল ‘ঠাকুরবাড়ির মানুষ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; বিচার করতে হবে একজন অনুসন্ধিৎসু ও আধুনিক শিল্পী হিসেবে।

বুদ্ধের হাত, বিশ্বকর্মার যন্ত্র! ইলোরার ১০ নম্বর গুহায় আসলে কে বসে আছেন?

The caste history of vishwakarma's: ইলোরার 'সুতারের ঝোপড়ি' থেকে আধুনিক কারিগরের কর্মশালা, বিশ্বকর্মার হাজার বছরের যাত্রা আজও অব্যাহত। ইলোরার দশ নম্বর গুহায় বুদ্ধের মূর্তিকে ভক্তরা ডাকেন বিশ্বকর্মা বলে, যিনি কারিগরদের পূর্বপুরুষ, দেবতাদের স্থপতি। ঋগ্বেদের 'সর্বকর্তা' থেকে পুরাণের 'দেবশিল্পী', ব্রাহ্মণত্বের দাবি থেকে ওবিসি সংরক্ষণ—বিজয়া রামাস্বামী, জ্যান ব্রাউয়ার ও কিরিন নারায়ণের গবেষণায় উন্মোচিত হয়েছে, বিশ্বকর্মাদের ঘিরে গড়ে ওঠা বর্ণবাদ, কারিগরি ও ক্ষমতাকাঠামোর জটিল ইতিহাস।

লেপচাদের দার্জিলিং যেভাবে হয়ে উঠল ব্রিটিশদের শৈলশহর

Darjeeling history: ভারতের প্রথম ‘জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন’ (জিআই) ট্যাগ প্রাপ্ত পণ্য বিশ্বখ্যাত ‘দার্জিলিং টি’। অথচ এই চা গাছ কিন্তু দার্জিলিং-এর ‘ভূমিপুত্র’ নয়। সাহেবরা নিজেদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে শান দিতেই এখানকার আদি বাস্তুতন্ত্রের খোলনলচে বদলে দিয়েছিল। দেশীয় বনভূমি ধ্বংস করে পাইন আর চা রোপণের মাধ্যমেই জন্ম নিয়েছিল আধুনিক পর্যটন মানচিত্রের এই ‘খাদের ধারের দার্জিলিং’।