সমুদ্রে সোনালি রথ কোথা থেকে এল! অশনির একমাত্র অভিঘাত কি তবে অলৌকিক আশীর্বাদ?

Jagannath Temple: কোথা থেকে এসেছে এই রথ? কী এর রহস্য? উত্তর খুঁজে নেওয়ার আগে ঢুঁ মারা যাক ইতিহাস আখ্যানের এ বাঁক, সে বাঁকে।

Sindhu Som
৪ মিনিট
সমুদ্রে সোনালি রথ কোথা থেকে এল! অশনির একমাত্র অভিঘাত কি তবে অলৌকিক আশীর্বাদ?

রথযাত্রা আসন্ন প্রায়। ১ জুলাইয়ের জন্য এখন থেকেই দিন গুনছে লোকে। ছোট বড় নানা আকৃতির রথ নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় বেরোবে বাচ্চারা। পুরীর রথযাত্রা দেখতে, রথযাত্রায় অংশ নিতে যাবেন অনেকেই। হালকা বৃষ্টিতে সেদিন রাস্তায় সোঁদা গন্ধ। এ চিত্র সবারই চেনা। কিন্তু এরই মধ্যে অশনি ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে এবার অন্ধ্র উপকূলে ঘটে গেল এক আশ্চর্য ঘটনা। ভেসে এল এক সোনালি রথ। কোথা থেকে এসেছে এই রথ? কী এর রহস্য? উত্তর খুঁজে নেওয়ার আগে ঢুঁ মারা যাক ইতিহাস আখ্যানের এ বাঁক, সে বাঁকে।

রথযাত্রা বা রথদ্বিতীয়া আষাঢ় মাসে হয়ে থাকে। ভারতীয়দের অন্যতম প্রধান একটি উৎসব এই রথযাত্রা। বিশেষত উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গে রথযাত্রা মিশে গিয়েছে জনজীবনের সঙ্গে। রথ বললেই মনে পড়ে বাংলায় সনৎ সিংহের সেই গান, “রথের মেলা রথের মেলা বসেছে রথতলায়”। রথের মেলা এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির সঙ্গে মিশে রয়েছে। সমুদ্রে ভেসে আসার ব্যাপারটিও বেশ পুরনো। পদ্মপুরাণে অনুসারে মালবরাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন ছিলেন বিষ্ণুর পরম ভক্ত। শ্রীক্ষেত্রের আদি মন্দিরটি নাকি তাঁর হাতেই গড়া। কিন্তু তখনও এই মন্দিরে কোনও বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ইতিমধ্যে রাজসভায় কেউ একজন নীলমাধব বিগ্রহের কথা রাজার কানে তোলেন। নীলমাধব বিষ্ণুর এক অপ্রচলিত রূপ। বিগ্রহ তেমন সুলভ নয়। ইন্দ্রদ্যুম্ন নীলমাধব খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কিন্তু এই বিগ্রহ পাওয়া যাবে কোথায়?

কেউই বলতে পারে না। রাজার বিশাল আয়োজন বিফলে গেল। যে সমস্ত লোক বিগ্রহের খোঁজে গিয়েছিলেন, ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন সবাই। কেবল বিদ্যাপতিকে খুঁজে পাওয়া গেল না। বিদ্যাপতি ফেরেনি। রাজা প্রায় হতোদ্যম। এদিকে বিদ্যাপতি এগিয়ে গিয়েছিল জঙ্গলের দিকে। পথ অত চেনা না থাকায় জঙ্গলের মধ্যে বেমালুম হারিয়ে গেল সে। পথ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে জঙ্গলের মধ্যে তার দেখা হল শবররাজ বিশ্ববসুর কন্যা ললিতার সঙ্গে। ললিতাই তাকে পথ চিনিয়ে নিজেদের আস্তানায় নিয়ে এল। ধীরে ধীরে বিদ্যাপতি ও ললিতার বন্ধুত্ব প্রেমে পরিণত হল। বিয়ে করে জঙ্গলে তারা সংসার করতে শুরু করলেন। জঙ্গলে থাকতে থাকতেই বিদ্যাপতি লক্ষ্য করল তার শ্বশুরমশাই রোজ সকালে স্নান সেরে কোথাও একটা যান। ব্যাপার কী? বিদ্যাপতি কৌতূহলী হয়ে উঠল। ললিতাকে জিগ্যেস করে জানা গেল, গভীর জঙ্গলে রয়েছে এক পর্বত। নীলপর্বত তার নাম। সেই নীলপর্বতে অধিষ্ঠিত নীলমাধব। বিশ্ববসু সেই নীলমাধবেরই পুজো দিতে যান।

নীলমাধবের কথায় বিদ্যাপতি যেন হাতে চাঁদ পেল। কী উদ্দেশ্যে সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিল তা তার মনে পড়ে গেল। একপ্রকার হারিয়ে গিয়েই ভগবানের খোঁজ পেল সে। অনেক বলেকয়ে বিশ্ববসুকে শেষমেশ রাজি করানো গেল। নীলমাধবের দর্শন পেয়ে ভক্তিভরে পুজো করল বিদ্যাপতি। ঠিক তখনই আকাশ থেকে দৈববাণী শোনা গেল, “এতদিন দীন-দুঃখীর পুজো নিয়েছি, এইবার মহা-উপাচারে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের পুজো নিতে চাই।” পড়ি কি মরি করে খবর পাঠানো হল রাজাকে। হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন ইন্দ্রদ্যুম্ন। হঠাৎ এই আনন্দের খবরে তাঁর সে কি বিস্ময়! সমস্ত ব্যবস্থা করে রাজা হাজির হলেন জঙ্গলের মাঝে। কিন্তু নীলমাধব কই? তাঁকে আর দেখা যায় না। খোঁজ খোঁজ খোঁজ খোঁজ। তখন আবার দৈববাণী শোনা গেল, “সমুদ্রের জলে ভেসে কাঠ আসবে, তাতে আমার (নীলমাধবের) মূর্তি তৈরি কোরো”। সবাইকে অবাক করে দিয়েই একদিন সমুদ্রের জলে কাঠ ভেসে এল। রাজার নির্দেশে মহাসমারোহে সেই কাঠ দিয়ে বিগ্রহ তৈরি করতে লেগে পড়ল আবাই। কিন্তু এ তো আর যে সে কাঠ না। ছেনিই বসে না এত শক্ত। ইন্দ্রদ্যুম্ন পড়লেন বিপদে। তাঁর অবস্থা দেখে দেবতার করুণা হল।

জগন্নাথ নিজে শিল্পীর রূপ ধরে এসে বললেন তিনিই গড়বেন বিগ্রহ। কিন্তু শর্ত রয়েছে। কাজ শুরু করার তিন সপ্তাহের মধ্যে কেউ বিগ্রহ দেখতে পারবে না। রাজা সম্মত হলেন। সেই অনুযায়ী শুরু হল মূর্তির কাজ। কিন্তু রানি গুণ্ডিচা থাকতে পারেন না, কৌতূহলে ছটফট করেন। শেষমেশ একদিন মূর্তি যে ঘরে হচ্ছিল সেই ঘরে আড়ি পেতে দেখেন কোনও শব্দ নেই। ব্যাপারখানা কী? উত্তেজনায় দরজা ঠেলে ঢুকেই পড়লেন রানি। অমনি কারিগর উধাও হয়ে গেল তাঁর চোখের সামনেই। তিনটি আধখেঁচড়া মূর্তি দেখে রানি অনুশোচনায় ভেঙে পড়লেন। রাজা-রানি দুজনেই ভাবলেন শর্তভঙ্গের ফলেই দেবতার এই বিরূপতা। তখন স্বপ্নে জগন্নাথ জানালেন, অনুশোচনার কারণ নেই। এ সবই পূর্বপরিকল্পিত। এই রূপেই পুজো পেতে ইচ্ছুক তিনি। এই বিগ্রহ তিনটিকে নিয়েই পুরীর রথযাত্রা উৎসব।

সেই বহুকাল পূর্বে লোকেদের কথায় কথায় যেমন সাগর বেয়ে ভেসে এসেছিল বিগ্রহের পবিত্র কাঠ, তেমনই এ বছর, সোনালি রথ ভেসে এসেছে। অবশ্য শান্ত সমুদ্রে এ অঘটন আদৌ ঘটত কিনা বলা মুশকিল। কিন্তু সেই পৌরাণিক কাহিনির পালে হাওয়া দিতেই বুঝি বঙ্গোপসাগরে উঠল ঘূর্ণিঝড় অশনি। গুরুতর ঘূর্ণিঝড়ে অন্ধ্র, উড়িষ্যার পাশাপাশি বাংলারও উপকূলবর্তী এলাকার ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল যথেষ্ট। কিন্তু সেই গুরুতর ঘূর্ণিঝড় শক্তি হারিয়ে বর্তমানে নিম্নচাপ হয়ে গিয়েছে। অন্ধ্রের উপকূলে এই ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছে যদিও। সঙ্গে হয়েছে ঝড়। সেই উত্তাল সমুদ্রেই গত মঙ্গলবার একটি রহস্যময় স্বর্ণালি রথ দেখতে পান স্থানীয়রা। অন্ধ্রের শ্রীকাকুলামে সুন্নাপল্লি বন্দরের কাছে এই রথটি দেখতে পাওয়া যায়। ধীরে ধীরে কৌতূহলী জনতা রথটিকে ঠেলে সমুদ্রতটে নিয়ে আসে। শ্রীকাকুলাম জেলার নৌবাহিনীর সাব-ইনস্পেক্টর জানান, “অন্য কোনও দেশ থেকে ভেসে আসতে পারে এই রথ। আমরা তদন্তের ব্যবস্থা করেছি এবং উপরমহলেও জানানো হয়েছে।” তবে রথযাত্রার দিনকতক আগেই এই রথ ভেসে আসার ঘটনায় ফের পদ্মপুরাণের ঘটনা স্মরণ করছেন ভক্তেরা। তাঁদের মতে, এও ভগবানেরই ইঙ্গিত। অশনির হাত দিয়ে পাঠানো জগন্নাথের আশীর্বাদ।

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।