স্বয়ং জগন্নাথের লীলা না কি অন্য অলৌকিক— পুরীর মন্দিরে যে রহস্যের উত্তর পাওয়া যায়নি আজও 

Sindhu Som
৪ মিনিট
স্বয়ং জগন্নাথের লীলা না কি অন্য অলৌকিক— পুরীর মন্দিরে যে রহস্যের উত্তর পাওয়া যায়নি আজও 

সে বহুদিন আগেকার কথা। আসিসির সেন্ট ফ্রান্সিস তখন অর্ডার অব ফ্রারারস মাইনর প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। তাদেরই এক সদস্যের হাত ধরে চতুর্দশ শতকের আশেপাশে জগন্নাথ দেবের গল্প পৌঁছল ইউরোপে। সেখানকার লোকজন শুনল, ভারতে জগন্নাথ নামে ভগবান বিষ্ণুর এক অবতার রয়েছে, তাঁকে এক বিরাট রথে চড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় একটি বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে। লোকের মুখে মুখে সেই অচেনা গল্প এমন ফুলে ফেঁপে উঠল, যে শোনা যেতে লাগল সেই রথের তলায় অনেক ভক্তই আত্মোৎসর্গ করতে লাফিয়ে পড়ে এবং চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যায়। যথেষ্ট বাড়িয়ে বলা সন্দেহ নেই, কিন্তু ইউরোপের জনমানসে এই গল্প এমন প্রভাব ফেলেছিল যে উনবিংশ শতকে ইংরেজি অভিধানে একটি নতুন শব্দ পর্যন্ত যোগ হয়—জাগারনাট। ব্যুৎপত্তিগতভাবে এই শব্দ যে ‘জগন্নাথে’রই অপভ্রংশ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সাধারণত এই শব্দ যে কোনও বিরাটাকৃতির কিছুকেই বুঝিয়ে থাকে, যা নিজের পথে সমস্ত বাধাবিপত্তি গুঁড়িয়ে এগিয়ে চলে।

এর থেকে গোটা বিশ্বে রথযত্রার অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা কী ব্যাপক— একটা ধারণা করা যায়। এছাড়াও ভারতের বিখ্যাত চারধামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাম পুরী। পুরী, দ্বারকা, বদরিনাথ ও রামেশ্বরম নিয়েই এই চারধাম। পুরীর মন্দিরটির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বহুদিন আগে। সম্ভবত ১০৭৮ থেকে ১১৪৮ সালের মধ্যে। তবে আজকে আমরা মন্দিরটি যেমন দেখি, এই রূপ দিয়েছিলেন রাজা অনন্ত ভীম দেব ১১৭৪ খৃস্টাব্দে। হিন্দুদের অন্যতম পীঠস্থান এই মন্দির রহস্যে ভরপুর। আজ জেনে নেব এমন কয়েকটি রহস্যের কথা।

নিশান রহস্য

মন্দিরচূড়ে নীলচক্রের মাথায় লালে হলুদে জাফরি কাটে আকাশের গায়। পতিতপাবন বনো নিশান। সূর্যালোকে ঝলমল করছে। অদ্ভুত ব্যাপার, এই নিশান ওড়ে হাওয়ার ঠিক বিপরীতে।

ছায়া রহস্য

দুপুর পেরিয়ে বিকেল গড়ায়। আশেপাশের বাড়ি, গাছ-গাছালির ছায়া দীর্ঘতর হয়। কিন্তু যেন দৈবপ্রভাবে পুরীর মন্দিরের ছায়া পড়ে না বিন্দুমাত্র। কারীগরীবিদ্যার আজব জাদুতে অতবড় কাঠামোর ছায়া মিলিয়ে যায় মন্দিরের শরীরেই।

প্রসাদ রহস্য

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রসুইকে বলা হয় পৃথিবীর বৃহত্তম রসুই। ৩২ কামরার এই রান্নঘরে ২৫০-রও বেশি মাটির পাত্রে ভোগ রান্না হয়। রান্না করেন ৬০০ জন রাঁধুনি ও তাদের সাহায্য করে আরো ৪০০ জন। এই ভোগ পুজো শেষে ভক্তদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয় প্রসাদরূপে। আশ্চর্যের ব্যপার, প্রতিদিন একই পরিমাণ ভোগ রাঁধা হলেও প্রসাদ কখনও অপর্যাপ্ত হয় না বা উদ্বৃত্ত থাকে না। অথচ ভক্তের সংখ্যা হতে পারে ২০০০ থেকে ২০০০০ পর্যন্ত। এই বিপুল পার্থক্য কীভাবে যথাযথ পরিমাণে প্রসাদ পায়, তা এখনও রহস্য।

মাটির হাঁড়ির রহস্য

জগন্নাথদেবের ভোগ রান্না হয় শুধুমাত্র মাটির পাত্রে। একের ওপর আরেকটি করে সাকুল্যে সাতটি হাঁড়ি চাপানো হয় একটি উনুনে। অথচ দেখা যায়, সবার উপরের পাত্রটির ভোগ রান্না হয় সবার আগে। শেষের পাত্রটিতে রান্না সম্পন্ন সবার শেষে। এও এক রহস্য।

হাওয়া রহস্য

সাধারণত সমুদ্রতটে সমুদ্রের হাওয়া স্থলভাগের দিকে ছুটে আসে দিনের বেলায়। রাতে স্থল্ভাগের থেকে সমুদ্রের দিকে সেই হাওয়া ফিরে যায়। অথচ জগন্নাথ মন্দিরের সমুদ্রতটে এ ঘটনা ঘটে সম্পূর্ণ উল্টো ক্রমে। দিনের বেলায় মন্দিরের হাওয়া নেমে যায় সমুদ্রে। রাতে আবার তা মন্দিরসংলগ্ন অঞ্চলে ফিরে আসে।

শব্দ রহস্য

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের চারটি প্রবেশদ্বার। মন্দিরের পুবদিক ঘেঁষা সিংহদ্বারটি দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করলে সমুদ্রের গর্জন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে যায়। আবার মন্দিরের বাইরে বেরিয়ে এলে কানে আসে সেই গর্জন। এ এক অতি আশ্চর্য ঘটনা। গোটা মন্দির এমন ভাবেই তৈরি যে বাইরের কোনও আওয়াজ সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। কারিগরী নাকি দৈব ঘটনা? উত্তর মেলেনি আজও।

নীলচক্রের রহস্য

যে চক্রের গায়ে পতিতপাবন বনো নিশান বাঁধা হয়, তার নাম নিলচক্র। লোহা, তামা, দস্তা, পারা, শিসা, পিতল, রুপো ও সোনা দিয়ে তৈরি এই অষ্টধাতুর চক্রের বাইরের ঘের ৩৬ ফুট, ভিতরের ঘের ২৬ ফুট। নানা কারুকার্য্যময় চক্রটি প্রায় ২ ইঞ্চি পুরু। মনে করা হয়, এই চক্র আসলে সুদর্শন চক্র, যা বিষ্ণুর সবথেকে শক্তিশালী অস্ত্র। ২১৪ ফুট উঁচুতে এই চক্রটির অবস্থান বিচিত্র। যে কোনও দিক থেকে চক্রটিকে দেখলে মনে হয় সেটি দর্শকের দিকেই মুখ করে রয়েছে। কী উপায়ে এই বিশাল চক্র মন্দিরের চূড়ায় তোলা হল, তাও এক রহস্য।

উড়ানবিধি রহস্য

ছবিতে প্রায়শই দেখা যায় বড় বড় ইমারত বা স্থাপত্যের উপর দিয়ে বিমান উড়ে চলেছে। অথবা উঁচু জায়গায় পাখিদের আধিপত্য। কুতুব মিনার থেকে তাজমহল, লালকেল্লা–সবই এই ধরনের ঘটনার সাক্ষী। অথচ পুরীর মন্দিরের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উল্টো। কোনও এক আশচর্য কারণে মন্দিরের চূড়ায় বা আশেপাশে কোনও পাখি সচরাচর দেখ যায় না। এমনকী এর উপর দিয়ে বিমানও ওড়ে না বলে দাবি করেন ভক্তরা। রাষ্ট্রের জারি করা কোনও সরকারি নিয়ম নয়; ভক্তদের মতে ভগবান জগন্নাথের দৈববলে জারি থাকে এই উড়ানবিধি।

তথ্যঋণ–

“8 Unexplained Mysteries of Jagannath Temple Puri That Are Intriguing.” 2017. October 9, 2017.

“10 Mysterious Facts of Puri Jagannath Temple.” n.d. Accessed January 17, 2022.

“11 Astonishing Facts About Jagannath Temple In Puri - Holidify.” n.d.

Biswas -, Suchismita. 2016. “10 Mysteries Of Puri’s Jagannath Temple Which Are Still Unexplained.” Noise Break (blog). December 12, 2016.

Dey, Panchali DeyPanchali, and Read More. n.d. “Mysteries of Jagannath Temple That Defy Scientific Logic.” The Times of India.

Dutta, Swarnab. 2020. “10 Mysteries about the Puri Jagannath Temple That Is Unbelievable - Swarnab Dutta.” June 28, 2020.

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।