মুম্বইয়ের গণেশপুজো কতটা বাংলার? ইতিহাসের যে পাতা উল্টোনো হয়নি
বাংলা এবং গনেশ উৎসবের বাড়ন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। গণপতি বাপ্পা মরিয়ার ধার করা শব্দে তাড়িত হয়েছে এই ইতিহাসও।

কেষ্টপুরের 'আমরা সবাই'। প্রতি বছরের মতো এবারও ভীষণ ব্যস্ত সংগঠকরা। পাড়া এবার জমজমাট। রাস্তার পাশেই বিরাট প্যান্ডেল। বাঙালির সেরা খেলা ফুটবলের থিম। দারুণ আলোকসজ্জা। মনিরামপুর বারোয়ারির অবস্থাও প্রায় একইরকম। এদিকে উত্তর কলকাতার বাগবাজারের ব্যবসায়ী কমিটি, মধ্য কলকাতার সিদ্ধি বিনায়ক সংঘ, সৈয়দ স্যালি লেন, মদন দত্ত লেনের অবস্থা গমগম করছে পুজোর সকাল থেকেই। ঠিক কী চলছে সেখানে! রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে দুর্গাপুজো, না কি...
নাহ্! করোনা-কালের দুর্বিষহ স্মৃতি কাটিয়ে কলকাতার অলিতে-গলিতে আরও ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবার 'গণপতি বাপ্পা'। সিদ্ধিদাতা গণেশের পুজোয় মোদক, লাড্ডুর গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। শুধু কলকাতা নয়, জেলায় জেলায় বিশেষত, কলকাতার পার্শ্ববর্তী শহরতলিতে গণেশ বন্দনা এবার চরমে। আগের থেকে যেন একটু বেশি!
তাহলে কি আগে হতো না গণেশপুজো? অবশ্যই। মুম্বইয়ের আবহে মূলত অবাঙালি বঙ্গবাসীর ঘরে, দোকানে, বাজারে অথবা অ-বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় গণপতি বাপ্পার প্রার্থনা বেশ জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। যদিও ২০১৪ সালের পর থেকে এই পুজোর প্রচলন অর্থাৎ বিরাট করে দুর্গাসম গণেশের বন্দনা বাড়তে থাকে বলেই মত অনেকের। যা গত দু'বছরের করোনা আবহে আবার কমে যায়। অর্থাৎ, নানা স্বাস্থ্যগত বিধিনিষেধে রাস্তায় রাস্তায় গণেশ বন্দনা খানিকটা ধাক্কা খায়।
কলকাতার বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার একটি পরিসংখ্যানেই বিষয়টি স্পষ্ট হয় খানিকটা; সূত্রের খবর অনুযায়ী, বিদ্যুতের অতিরিক্ত (পুজো বা অনুষ্ঠান, এই জাতীয় ক্ষেত্রে) চাহিদা এবং বিদ্যুৎ সংস্থার অনুমতির জন্য মোট আবেদনকারীর ৫০ শতাংশ উত্তর কলকাতার। বাকি ২৫ শতাংশ দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন অংশ এবং বাকি শতাংশ মধ্য কলকাতা ও আশপাশের এলাকা থেকে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৯ সালে ১৪০টি পুজো কমিটির পক্ষে ৬০২ কিলোওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদা-সম্বলিত আবেদন জমা পড়েছিল। যা ২০২০ সালে এসে একধাক্কায় কমে যায় ১২-তে। অর্থাৎ, ৬০২ কিলোওয়াট থেকে গণেশপুজোর সময় বিদ্যুতের অতিরিক্ত চাহিদা এসে দাঁড়ায় মাত্র ১২ কিলোওয়াটে। আবার ২০২১ নাগাদ সেটি বেড়ে হয় ২০২ কিলোওয়াট। আবেদন করে ৫৮টি গণেশপুজো কমিটি। এই বছর পুজোর কয়েকদিন আগেই অতিরিক্ত বিদ্যুতের জন্য, দফতরের অনুমতির জন্য আবেদন জমা হয়েছে ২০০-এর বেশি। সেই অনুযায়ী অতিরিক্ত বিদ্যুতের পরিমাণ ওই দিন পর্যন্ত ৪৬৮ কিলোওয়াট অতিক্রম করেছে। যা ক্রমশ বাড়ছে বলেই খবর। এটি শুধুমাত্র কলকাতার পরিসংখ্যান। ওয়েলিংটন থেকে শিয়ালদহ, লেবুতলা পার্কের সোনাপট্টি থেকে মুরলীধর সেন লেন, অধিকাংশ কলকাতাকেন্দ্রিক পুজোর পাশাপাশি গণেশ বন্দনায় পিছিয়ে নেই জেলাও। রায়গঞ্জ থেকে মালদহের বাজার। শিলিগুড়ি বাজার কমিটি থেকে উত্তর ২৪ পরগণার বারাসতের বড়বাজার কমিটি। সব ক্ষেত্রেই গণেশপুজো জমজমাট। সূত্রের খবর, বারাসাত শহরে বারোয়ারি গণেশপুজোর এবারের সংখ্যা ১৮-র বেশি। যার মধ্যে অধিকাংশই নতুন। এমনকী, ওই পুর এলাকার অধিকাংশ ওয়ার্ডেই গণেশপুজো এবার জমজমাট। মধ্যমগ্রাম, সোদপুর, বারাকপুর, ভাটপাড়া, জগদ্দলের বহু এলাকাতেই গণেশ উৎসব এবার জমজমাট। কোথাও নেতা, মন্ত্রী, সাংসদের উপস্থিতিতে উদ্বোধন, কোথাও পুজোর সঙ্গেই তারকা-খচিত অনুষ্ঠান হচ্ছে। যেখানে হিন্দিভাষীদের মধ্যেই নয়, গণেশ আবহ উৎসবের মতো ছড়িয়েছে বাঙালিদের মধ্যেও। প্রায় প্রত্যেক বড় পুজোর উদ্বোধনে দেখা গিয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের। একাধিক পুজো এবং পুঁজির বিতর্কে উঠে এসেছে রাজ্যের শাসক ও বিরোধী দলের প্রসঙ্গ। খানিকটা যেন দুর্গাপুজোর মতোই! অর্থাৎ পুজোর সমারোহ এবং রাজনীতির আবহ জড়িয়ে গিয়েছে গণেশপুজোকে কেন্দ্র করেও।
আর একটি পরিসংখ্যান উঠে এসেছে কুমোরটুলি থেকে। যেখানে, ২০১৪ বা আগে থেকে গণেশের মূর্তি বিক্রি হতো ২০০-৫০০টি। ছোট মূর্তির বিক্রি ছিল ৪০০ শতাধিকের একটু বেশি। সেই বিক্রিই বেড়ে হয়েছে ১০০০-এরও বেশি। এবছর মূর্তি শিল্পীদের কথায়, লক্ষ্মী বা সরস্বতীর মতো এবার ছোট-বড় গণেশ মূর্তি বিকিয়েছে দেড় হাজারের বেশি। যা করোনা-পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক বলে অনেকে মনে করলেও গণেশের এই লক্ষ্মীলাভ, সামগ্রিক আবহে অন্যতম বলেই মত।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মহারাষ্ট্রের গৃহস্থদের অনেকেই গণেশপুজো করতেন, কিন্তু তা কোনওদিনই খুব বড় করে উৎসব আকারে অনুষ্ঠিত হয়নি।
এখানেই উঠছে প্রশ্ন। পুজো নিয়ে আপত্তি নেই কোনও অংশেই। পুজো হবে। গণেশ বন্দনাও যথেষ্ট গুরুত্বের এবং সময়োপযোগী ধর্মীয় বিশ্বাসের কাছে। কিন্তু এই প্রচলন, এই চল, যা ২০১৪ সালের পর থেকে ক্রমশ বাড়তে থাকল, বাঙালির ঘরের ছেলে নাদুসনুদুস গণেশের পরিবর্তন ঘটল গণপতি বাপ্পা মরিয়ায়, ক্রমশ লাড্ডুর গণেশ হয়ে গেলেন মোদক আর ধুমধাম হিন্দি গানের আবহে এক উৎসব আর মোচ্ছবের নাম। ধর্মের অনুভূতির মধ্যেই হয়ে উঠলেন অবাঙালি সংস্কৃতির এক বাহক, মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতির ধারক। তার বহনের মাধ্যম! তার কারণ?
বঙ্গের পুজোর ইতিহাসে গণেশপুজো শুধু মুম্বই বা মহারাষ্ট্র নয়, এই বাংলাতেও সুপরিচিত ছিল। ১৮৯৩ সাল নাগাদ কংগ্রেস নেতা বাল গঙ্গাধর তিলকের উদ্যোগে ছত্রপতি শিবাজীর আদর্শের গণেশপুজোর উত্থান। ১৮৯৫ সালে যার বার্ষিক অনুমোদন ও বিস্তার। যা ক্রমান্বয়ে মহারাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ উৎসবের মর্যাদা পায়। পশ্চিম ভারতের গুজরাত, গোয়া, কর্নাটক, রাজস্থানের একটা অংশ ছাড়িয়ে গণেশ উৎসবের বিস্তার অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুতে পৌঁছয়। যেখানে উত্তর ভারতের কার্তিকপুজো আর গণেশপুজোর এক সূক্ষ্ম বিচ্ছেদ লক্ষ করা যায়। যেখানে পুরাণে বর্ণিত একাধিক কথকতার মতোই কার্তিক না গণেশ বড়, সেই বিতর্কও বর্তমান।
মূলত, মহারাষ্ট্রে তথাকথিত ব্যবসায়ী পরিবার এবং ধনীদের মধ্যে পূজিত হতে দেখা যায় গণেশকে। বাঙালির দুর্গাপুজো এবং কলাবউয়ের সঙ্গে গণেশের পুজো ব্যতীত তাঁর প্রার্থনা শুধু সমস্ত পুজোর শুরুর মন্ত্রেই বেশি করে নিমজ্জিত ছিল বহুকাল। কিন্তু শিব পুরাণ এবং বৈবর্ত পুরাণের মতো একাধিক স্থানে গণেশ বৃত্তান্তের একাধিক মতের মধ্যেই গণেশ এবং বাংলা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় বারবার। পার্বতীর পাহারায় পুত্র গণেশ, শিবকে গৃহপ্রবেশে বাধা, মুণ্ডচ্ছেদ, দেবীর রোষানলে ব্রহ্মার সাহায্যে উত্তর দিকে প্রথম পাওয়া হস্তিশাবকের মুণ্ড দিয়ে গণেশের প্রাণ প্রতিষ্ঠা, আবার গনাসুরের বরলাভ, তার উদরে মহাদেবের প্রবেশ, বিষ্ণুর হস্তক্ষেপে মহাদেব-মুক্তি, হস্তিশাবকের মুণ্ড প্রতিষ্ঠার তত্ত্বের পাশাপাশি, শিব-পার্বতীর প্রার্থনা, বিষ্ণুর সন্তুষ্টি, পুত্রসন্তান, শনির দৃষ্টি, ফের পশুর মুণ্ড প্রতিষ্ঠা- যা বুদ্ধি, স্থিতি, সম্পদের, শান্তির প্রতীক হিসেবে বর্ণিত হয়।
গণেশের সম্পদরূপী অবতারে মূহ্যমান গোষ্ঠী তাঁর পুজোর মহাসমারোহে ব্রতী হন বারবার। এখানেই খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ৫০০ শতাব্দী পর্যন্ত যুদ্ধের দেবতা, শৌর্যের দেবতা হিসেবে সমগ্র ভারত তথা উত্তর ভারতে জনপ্রিয় ছিলেন কার্তিক। যেখানে গণেশ মহাদেব-পার্বতীর কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবেই বর্ণিত হতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গেই সেই বিতর্ক কমেছে। শান্তি, সমৃদ্ধি, স্থিতি, সম্পদের, বুদ্ধির দেবতা হিসেবে হিন্দুর ঘরে ঘরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি। যা বৌদ্ধ ধর্মের আবহ বা ধরন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান শাখার দেবতা হিসেবেও গণেশের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়েছে। যদিও এইরকম রূপের দেবতার অস্তিত্ব-তত্ত্ব বৌদ্ধ নয়, হিন্দু ধর্মের ইতিহাসে জোরালো হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এভাবেই পুরাণ। পুজো। আর ধার্মিক ইতিহাসের আবহে গণেশ আবর্তিত হয়েছেন বারবার। বাংলা এবং গনেশ উৎসবের বাড়ন্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। গণপতি বাপ্পা মরিয়ার ধার করা শব্দে তাড়িত হয়েছে এই ইতিহাসও।
যেখানে উঠে এসেছে মহানায়ক উত্তমকুমারের নাম। যাঁর সঙ্গে গণেশপুজোর সম্পর্ক জড়িয়ে একটি ছবি দেখিয়ে অনেকেই দাবি করেন, এখন নয়, গণেশ এবং ধুমধাম করে তাঁর পারিবারিক বন্দনা অনেক আগে থেকেই বঙ্গে প্রচলিত। কিন্তু উৎসবসম লক্ষ্মীপুজো করা উত্তমকুমারের দ্বারা ধুমধাম করে গণেশ পুজোও হতো কি না, তখন তিনি তা করতেন কি না, সেটার স্পষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায় না। শুটিং স্পট, স্টুডিও এলাকায় বরাবর গণেশ এবং লক্ষ্মীপুজোর একটি প্রচলন আছে। মুম্বইয়ের বলিউড মহলের মতো গণেশ এখানেও পূজিত। সেখানে দাঁড়িয়ে উত্তমকুমার আর গণেশপুজোর ক্ষেত্র জড়িয়ে সমগ্র বাংলার ইতিহাসকে লিখে দেওয়া ঠিক নয় বলেই মত অনেকের।

গণেশের আরাধনা করতেন মহানায়ক?
কলকাতার বিশেষত, মধ্য কলকাতার একটা বড় অংশ অথবা দক্ষিণ কলকাতার একটা বিরাট অংশের মধ্যেই পশ্চিম ভারতীয় মানুষের বসবাস। যেখানে বহু বাজারে অধিকাংশ দোকানের মালিক বাঙালি নন। অর্থাৎ জন্মগত সূত্রে বাংলার বাসিন্দা নন। কেউ কেউ বঙ্গে জন্ম নিলেও তাঁর পূর্বপুরুষের আদি বাসস্থান পশ্চিম ভারতে। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ব্যবসার ক্ষেত্রে গণেশ পুজোর প্রচলন পুরনো। দিকে দিকে সিদ্ধিদাতা বন্দনা পরিচিত। কিন্তু সর্বসাধারণের জন্য, স্থানীয় ক্লাব অথবা সংগঠনের তদারকি, খানিকটা পাড়ায় পাড়ায় কালীপুজো অথবা দুর্গাপুজোর মতো গণেশের পুজোর, গণেশ উৎসবের প্রচলন গত ৭-৮ বছরে বেড়েছে! মহারাষ্ট্রের (Maharashtra Ganesh Puja) ১১ দিনব্যাপী উৎসবের এবং দামামা বাজিয়ে বিসর্জনের আবহের আমদানি এখানে না হলেও সর্বসাধারণের, পুজো কমিটির গণেশপুজো অভিনব। যা কলকাতার কালী, ঘরের লক্ষ্মী, সরস্বতী অথবা দুর্গা মণ্ডপের কলাবউ-গণেশের আবহে ঠিক কতটা রাজনৈতিক বা সামাজিক অথবা সাংস্কৃতিকভাবে ব্যাপ্ত, তা নিয়ে বিতর্ক থাকছেই! অর্থাৎ আজ বাংলা যা ভাবে কাল দেশ তাই ভাবে, এই ধারণা বদলে গণেশ-ক্ষেত্রে হয়তো বলা যায়, গণেশ নিয়ে মহারাষ্ট্র যা আজ ভাবল, তা বাংলা ভেবেছে কাল।
















