পুজো হতো শুধু গৃহস্থবাড়িতে, কীভাবে মহারাষ্ট্রে শুরু হয়েছিল গণেশ উৎসব?

মহারাষ্ট্রের গৃহস্থদের অনেকেই গণেশপুজো করতেন, কিন্তু তা কোনওদিনই খুব বড় করে উৎসব আকারে অনুষ্ঠিত হয়নি।

rudranjan
৪ মিনিট
পুজো হতো শুধু গৃহস্থবাড়িতে, কীভাবে মহারাষ্ট্রে শুরু হয়েছিল গণেশ উৎসব?

১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হচ্ছে মুজফ্‌ফর আহ্‌মদ-এর গ্রন্থ ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’। নিজের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের মধ্য দিয়ে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অগ্নিযুগ পর্বের খানিক সমালোচনাই করছেন মুজফ্ফর। তিনি লিখছেন, "হতাশা হতেই বিপলবের সৃষ্টি হয়। শিক্ষিত বাঙালী ‘ভদ্র’ যুবকদের মন বিদ্রোহ ঘোষণা করল এবং তাঁরা পথ বেছে নিলেন সন্ত্রাসের। এইভাবে আরম্ভ হলো ‘ভদ্র’ যুবকদের বিপ্লবান্দোলন। এই আন্দোলনের ফিলসফি হলো বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘আনন্দমঠ’ এবং অন্যান্য লেখা। তাই এই বিপ্লব আন্দোলন হলো হিন্দু পুনরুত্থানের আন্দোলন।" ‘আনন্দমঠ’-কে কেবলমাত্র হিন্দু পুনরুত্থানবাদী উপন্যাস বলা চলে কি না, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু মুজফ্ফরের লেখায় যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা উঠে আসে তা হলো, ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বিশ্লেষণ করছেন কীভাবে।

বঙ্গভঙ্গের সময় বাংলার মুসলমানদের নানাবিধ প্রতিশ্রুতি দিলেন ইংরেজরা। তাদের বোঝানো হলো, বাংলা ভাগ হলে মুসলমানদের সুযোগ-সুবিধে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে উচ্চবংশীয় মুসলমানদের একাংশ ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে দুরত্ব তৈরি করলেন। এর কাছাকাছি সময়ে বাংলায় মাথাচাড়া দিল চরমপন্থী আন্দোলন। এবং এই আন্দোলনের কাণ্ডারিদের একাংশের ঝোঁক গেল হিন্দু পুনরুত্থানবাদের প্রতি। তাঁদের অনেকেই মনে করেছিলেন, এই পুনরুত্থানবাদের বাণী প্রচার করেই দেশের সাধারণ জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা যাবে। এই সময়ে ব্যারিস্টর প্রমথনাথ মিত্রর উদ্যোগে গঠিত হলো অনুশীলন সমিতি। পরবর্তীতে এই সমিতি ভাগ হয়ে যায়, কিন্তু অখণ্ডিত সমিতির ইস্তেহারে স্পষ্ট লেখা ছিল, "No one is to be admitted who is non-Hindu or who has any spite against the Hindus." কিন্তু এসবের ফল হলো উল্টো। ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার দেখাচ্ছেন, কীভাবে বাংলার চরমপন্থীদের এই হিন্দু পুনরুত্থানবাদের প্রতি ঝোঁকের ফলে বাংলার মুসলমানদের একাংশ তাঁদের আন্দোলনের প্রতি বিমুখ হয়ে রইলেন। অর্থাৎ, স্বাধীনতার আন্দোলনের গোড়ার দিকেও, খুব ঘোষিতভাবে না হলেও, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে একটা টানাপড়েনের সম্পর্ক ছিলই। এ তো গেল বাংলার কথা। এবার আসা যাক মহারাষ্ট্র প্রসঙ্গে।

১৮৮৪ সালের কথা। সিপাহি বিদ্রোহের পর তখন ভারতের শাসনব্যবস্থা সরাসরি গিয়ে পড়েছে ইংরেজ সরকারের হাতে। এই অবস্থায় মহারাষ্ট্রে রুকমাবাঈ নামে এক কিশোরী আদালতে তাঁর স্বামী দাদাজি-র সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন জানালেন। অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল রুকমার। নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচন করার মতো জ্ঞান তখনও তাঁর হয়নি। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার দরুন নিজগৃহেই থাকতেন তিনি। শ্বশুরবাড়িতে ওঠেননি। একটা সময়ের পর তাঁর মনে হলো, যে মানুষটাকে তিনি সেভাবে কোনওদিন চোখেই দেখেননি, যাঁকে ভালো করে কোনওদিন চেনেননি, তাঁকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবেন কীভাবে? এই ভেবে তিনি আদালতে বিবাহ-বিচ্ছেদের আবেদন জানালেন এবং যথারীতি মামলায় হারলেন। পিতৃতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আর কবেই বা নারীদের অধিকারের দাবির কাছে মাথা নত করেছে?

রুকমার ঘটনার পর নানান মহল থেকে ইংরেজদের ওপর চাপ বাড়তে লাগল। ইতিপূর্বে মহিলাদের বিয়ের নূন্যতম বয়স ছিল ১০। বুদ্ধিজীবীদের একাংশ দাবি করলেন, এবার তা বাড়িয়ে করতে হবে ১২। চাপের মুখে পড়ে ইংরেজরাও ‘এজ অফ কনসেন্ট অ্যাক্ট’ বা ‘সম্মতি আইন’ পাশ করাতে বাধ্য হলেন। কিন্তু এর ফলে রে রে করে উঠলেন মহারাষ্ট্রের হিন্দুরা। প্রাচীন আচার-আচরণে ইংরেজদের হস্তক্ষেপের ফলে নাকি তাঁদের অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কাজেই, সারা ভারতে গড়ে উঠল হিন্দুদের অস্তিত্বরক্ষার আন্দোলন। মহারাষ্ট্রে এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং বালগঙ্গাধর তিলক। তাঁর ‘পুনা সর্বজৈনিক সভা’-এর দৌলতে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত রাজনৈতিক সমাবেশ আয়োজিত হতে লাগল। এছাড়াও ‘কেশরি’ এবং ‘মারহট্টা’ প্রভৃতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে লাগল।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
হিন্দুরাই ভাঙতে চেয়েছিল, সাহসী যৌনতার চিহ্ন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে খাজুরাহো

এটা জানলে সবচেয়ে অবাক হবেন যে, মন্দিরের এসব নগ্ন মূর্তি কিন্তু শিল্পীদের কল্পনা ছিল না। সঙ্গমরত যুগলমূর্তিরা সবাই ছিলেন রক্তমাংসের মানুষ। শিল্পীরা জীবন্ত মডেল সামনে রেখেই নির্মাণ করতেন মূর্তি।

একেই সম্মতি আইনের দৌলতে হিন্দুদের অস্তিত্ব খানিক নড়বড়ে হয়ে উঠেছিল, তার ওপর দেখা দিল এক নতুন সমস্যা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গোহত্যাকে কেন্দ্র করে দাঙ্গার খবর আসতে লাগল। পাঞ্জাব, বিহার এবং উত্তর-ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলে হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক হানাহানি হল। বাদ গেল না মহারাষ্ট্রও। ‘গো-মাতা’-র রক্ষা হয়ে দাঁড়াল হিন্দুদের একাংশের অন্যতম লক্ষ। বম্বেতে এক গুজরাতি ব্যবসায়ীর উদ্যোগে তৈরি হলো ‘গো-রক্ষিণী সভা’। এমতাবস্থায় তিলক হিন্দুদের ঘুরে দাঁড়ানোর বাণী প্রচারের উদ্দেশ্যে ‘গণেশ উৎসব’-এর পরিকল্পনা করলেন। মহারাষ্ট্রের গৃহস্থদের অনেকেই গণেশপুজো করতেন, কিন্তু তা কোনওদিনই খুব বড় করে উৎসব আকারে অনুষ্ঠিত হয়নি। তিলক মনে করেছিলেন, হিন্দুদের এই অস্তিত্ব সংকটের দিনে গণেশকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন। যথারীতি, ১৮৯৪ সালে মহারাষ্ট্রের পূনা শহরে ব্যাপক ধুমধামের সঙ্গে আয়োজিত হল গণেশ উৎসব। নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে এক কাল্পনিক শত্রুর প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল মহারাষ্ট্রের হিন্দুদের। এবং আমরা তো অনেকেই জানি, নানা সময়ে মুসলমানরাই হিন্দুদের এই কাল্পনিক শত্রুর ভূমিকা পালন করে এসেছে।

ইতিপূর্বে মহারাষ্ট্রে মহরম কেবলমাত্র মুসলমানদের উৎসব ছিল না। হিন্দুরাও তাতে সমানভাবে অংশগ্রহণ করতেন। কিন্তু গণেশ উৎসব থেকেই তার বিরুদ্ধে নানাবিধ বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচারিত হতে লাগল। কালক্রমে গণেশ উৎসবের জনপ্রিয়তা বাড়ল। পূনা থেকে তা ছড়িয়ে পড়ল ডেকানের নানান অঞ্চলে। অর্থাৎ, বিনা প্রশ্নে যাকে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়, তার আড়ালেই লুকিয়ে ছিল ধর্মীয় বিদ্বেষ। অথচ, স্কুলপাঠ্য ইতিহাস গ্রন্থে একথা বলাই হয় না।

ইতিহাসবিদ শেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন ‘polyphonic nationalism’-এর কথা। তুরীয় জাতীয়তাবাদের ধারণা যে ঠিক কতটা ভ্রান্ত, তা আজ পদে পদে প্রমাণিত হচ্ছে। ভারতের মূলধারার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে স্বীকৃতি পাননি দলিতরা। যার ফলে একটা সময়ের পর পেরিয়ার কংগ্রেস ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। তাছাড়া, হিন্দু-মুসলমান সমস্যার কোনওরকম মীমাংসাও সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হয়নি। এর জলজ্যান্ত নিদর্শন মেলে স্বাধীনতা-পরবর্তী অজস্র দাঙ্গায়। ১৯৪৭-এর পর বামপন্থী শিবির থেকে স্লোগান উঠেছিল, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’। এর ফলে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাদের। তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, ভারতের মূলধারার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন আসলে কোন স্বাধীনতা এনে দিল ভারতবাসীকে? দেশ স্বাধীন হওয়ার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে দিকে দিকে পালিত হচ্ছে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’। অথচ, এই প্রশ্নের উত্তর আজও অধরাই থেকে গেছে।

সূত্র:

Modern India

From Plassey to Partition

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।