বিনিয়োগ নামমাত্র, নিজের একচিলতে জমিতে রসুন চাষ মাসে ২ লাখ নিশ্চিত করতে পারে
সামান্য পরিমাণ পুঁজি নিয়ে শুরু করতে পারেন রসুন চাষের ব্যবসা। এই কৃষিকাজের ব্যবসাটি যথেষ্ট লাভজনক এবং সঙ্গেই এই ব্যবসায় আয়ের পরিমাণও ব্যাপক।

প্রতিমাসে ১০টা-৫টার কোন চাকরি না করে নিশ্চিন্তে যদি আপনি মোটা টাকা আয় করতে চান, তাহলে আপনার জন্য রয়েছে একটি দুর্দান্ত আইডিয়া। বর্তমানে দেখা গিয়েছে, এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা বেসরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেদের উদ্যোগে ব্যবসা করা শুরু করেছেন। নতুন প্রজন্মের অনেকেই চাকরির দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করেছেন এবং তাঁরা সকলেই নিজেদের উদ্যোগে শুরু করেছেন ব্যবসা। তবে কৃষিকাজের মাধ্যমেও যে ব্যবসা করা সম্ভব, এটা বর্তমান সময়ে অনেকেই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, এবং সঠিক পদ্ধতিতে কৃষি কাজ করে তাঁরা বাড়িতে বসেই আয় করছেন লক্ষ লক্ষ টাকা। আপনি যদি একঘেয়ে চাকরি ছেড়ে নতুন কিছু একটা করার চিন্তা-ভাবনা করে থাকেন, তাহলে সামান্য পরিমাণ পুঁজি নিয়ে শুরু করতে পারেন রসুন চাষের ব্যবসা। এই কৃষিকাজের ব্যবসাটি যথেষ্ট লাভজনক এবং সঙ্গেই এই ব্যবসায় আয়ের পরিমাণও ব্যাপক। প্রথম ফসলেই, অর্থাৎ প্রথম ৪ মাসের মধ্যেই আপনারা ১০ লক্ষ টাকা সহজেই আয় করতে পারবেন এই কৃষি ব্যবসা থেকে।
রসুনের চাহিদা আমাদের দেশে সারা বছরই থাকে। খাবার সুস্বাদু করার পাশাপাশি ঔষধি গুণ থাকার কারণে ভারতীয়দের রান্নাঘরে রসুন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আচার, সবজি, চাটনি এবং মশলায় রসুনের ব্যবহার হয়ে থাকে। উচ্চ রক্তচাপ, পেটের সমস্যা, মধুমেহ, হজমের সমস্যা, ফুসফুসের সমস্যা, ক্যানসার, বাতের সমস্যা এবং রক্তের সমস্যার ক্ষেত্রে রসুন অত্যন্ত উপকারী। অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়া এবং অ্যান্টি ক্যানসার গুণ থাকার কারণে বিভিন্ন অসুখের চিকিৎসায় রসুন ব্যবহার করা হয়। আর এই রসুনের চাষ করলেই আপনারা হয়ে যেতে পারেন খুব কম সময়ের মধ্যেই লাখপতি। রসুন চাষ করে সেখান থেকে লাভ করা অত্যন্ত সহজ। তবে এই চাষ আহামরি কোনও ব্যাপার না হলেও কয়েকটি বিষয়ের দিকে আপনাকে নজর রাখতেই হবে। এই চাষ শুরু করার আগে কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে আপনার স্পষ্ট ধারণা থাকা দরকার। মাটি পরীক্ষা থেকে শুরু করে কীভাবে রসুনের ফলন বাড়ানো যায়, এই সমস্ত বিষয় সম্পর্কে আপনার স্পষ্ট ধারণা থাকতেই হবে।
রসুন চাষ করতে হলে সব থেকে আগে খেয়াল রাখতে হবে রসুন চাষের সময়টা। বর্ষার পরে অর্থাৎ অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসের রসুনের চাষ করা সব থেকে বেশি লাভজনক প্রমাণিত হয়ে থাকে। মোটামুটি সারা বছরই আপনারা রসুন চাষ করতে পারেন। তবে অক্টোবর এবং নভেম্বর, এই দু'টি মাস রসুন চাষের জন্য সর্বোত্তম বলে মনে করা হয়। তবে শুধুমাত্র মাটি নয়, রসুন চাষের আরও বিভিন্ন ধাপ রয়েছে, যেগুলি আপনাকে চাষ করতে জানতেই হবে।
মাটি
সাধারণত জল জমে না এমন উর্বর দোআঁশ মাটিতে রসুন চাষ ভালো হয়। তবে যদি সেরকম মাটি না পাওয়া যায়, তাহলে এঁটেল-দোআঁশ মাটিতেও এই রসুন চাষ করা যায়। তবে একেবারে এঁটেল মাটি ব্যবহার করা যায় না রসুন চাষের ক্ষেত্রে। রসুন একটি কন্দ তৈরি করে। আর এঁটেল মাটিতে কন্দ সুগঠিত হয় না। জমি থেকে জল বের হয়ে যাবার ব্যবস্থা না থাকলে কন্দ বড় হয় না এবং রসুনের রং খারাপ হয়ে যায়।
বীজ বপন
অন্যান্য সবজির মতো কিন্তু রসুনের চারা তৈরি করা যায় না। শুকনো রসুনের বাইরের সারির কোয়া এই চাষের জন্য বীজ হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জমিতে সরাসরি রসুনের কোয়া বীজ হিসেবে রোপণ করতে হয়। পুষ্ট, নীরোগ, এবং বড় কোয়া বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। বীজ বোনার সময় জমিতে পর্যাপ্ত পরিমাণ আর্দ্রতা থাকলে জৈব সার এবং রাসায়নিক সার একসঙ্গে প্রয়োগ করতে হয়।
একদিন বা দু'দিন বাদে সারি থেকে সারি ৬ ইঞ্চি এবং গাছ থেকে গাছ ৪ ইঞ্চি দূরত্ব বজায় রেখে ১ ইঞ্চি গভীরতায় রসুনের কোয়া বসাতে হয়। তারপরে পর্যাপ্ত আচ্ছাদন দিয়ে কোয়াগুলি খড় দিয়ে ঢেকে দিতে হয়। এর ফলে আগাছা দমন হয় এবং জল সেচ না করেও আশানুরূপ ফলন তোলা যায়। প্রতি হেক্টর জমিতে ৩০০-৩৫০ কিলোগ্রাম বীজ রসুনের প্রয়োজন হয়। অথবা কন্দের আকার অনুযায়ী বিঘা হিসেবে ধরলে প্রতি বিঘায় ৫০-৭০ কিলোগ্রাম পরিমাণ কোয়া বীজের প্রয়োজন হয়।
সার ব্যবস্থাপনা
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পুষ্টিবিদদের মতে বেশ কিছু কারণে অনেকেই ভাত খাওয়া বন্ধ করলেও এর বহুমুখী পুষ্টিগুণ শরীরের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
রসুন চাষ করতে হলে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় আপনাকে সার প্রয়োগ করতে হবে। হেক্টর প্রতি সারের পরিমাণ - গোবর সার ১০ টন, ইউরিয়া ২০০ কেজি, টিএসপি ১২৫ কেজি, এমওপি ১০০ কেজি, জিংক সালফেট ২০ কেজি, বোরাক্স ১০ কেজি এবং জিপসাম ১০০ কেজি। জমি তৈরির সময় সমুদয় গোবর, টিএসপি, জিংক এবং অন্যান্য সার মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করুন। রসুন লাগানোর ৩০ দিন ও ৬০ দিন পর যথাক্রমে প্রথম এবং দ্বিতীয় কিস্তির উপরি সার আপনাকে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি বারে প্রতি হেক্টরে ১০০ কেজি ইউরিয়া এবং ৫০ কেজি এমওপি আপনাকে উপরি সার হিসেবে প্রয়োগ করতে হবে।
আগাছা দমন
রসুন লাগানোর ১৫ দিন পরে যদি আগাছা তৈরি হয়ে যায় এবং রসুনের ছোট চারা ওপরে উঠতে শুরু করে, তখন আপনাকে সেই আগাছা দমন করতে হবে। রসুন গাছের আগাছা দমন করার সবথেকে ভালো উপায় রনস্টার ব্যবহার করা। প্রতি বিঘাতে ৫০ মিলিলিটার রনস্টার ৪০ থেকে ৫০ লিটার জলে মিশিয়ে আপনাকে স্প্রে করতে হবে। অন্য কোনও আগাছা দমনকারী রাসায়নিক ব্যবহার না করাই ভালো। জমিতে আগাছা হলে অবস্থা বুঝে একাধিকবার নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। বন্যাপ্লাবিত এলাকায় জিরো টিলেজ মালচিং-এর মাধ্যমে আপনি রসুন গাছ চাষ করতে পারেন। তবে কোনও কোনও সময় বীজ রোপণ থেকে রসুন উত্তোলন পর্যন্ত আপনাকে নিড়ানি ব্যবহার করতে হবে। তবে, অবশ্যই আগাছার পরিমাণ দেখে তারপরেই নিড়ানি ব্যবহার করবেন।
সেচ ব্যবস্থা
রসুন গাছ লাগানোর পর জমির আর্দ্রতা এবং জমির পুষ্টি বুঝে নিয়ে তারপরেই আপনাকে সেচকাজ করতে হবে। এরপর চারা বের হওয়া না পর্যন্ত জমিতে যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ রস থাকে, তা আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে। চারা একবার তৈরি হয়ে গেলে ১০-১৫ দিন অন্তর আপনি সেচ দিতে পারেন। রোপণের পর প্রথমে আপনাকে একবার সেচ দিতে হবে। এরপর দ্বিতীয় সেচ আপনাকে দিতে হবে ৩-৪ দিন পরে। আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে পরবর্তী ৮ থেকে ১২ দিনের মধ্যে আরও একবার সেচ দেওয়া যেতে পারে, তবে সবসময় এটা প্রয়োজন হয় না।
রসুনের জমিতে বিশেষ করে কন্দ গঠনের সময় উপযুক্ত পরিমাণ রস থাকা প্রয়োজন। তাই সেই সময় অবশ্যই আপনাকে সেচ কাজ করতে হবে। কন্দ যখন পরিপক্ক হতে শুরু করবে, তখন সেচ কম দেবেন। এই ফসল ফলাতে গেলে কম করে হলেও চার থেকে পাঁচবার সেচ করার প্রয়োজন হবে। ড্রেনের দু'পাশের নালা দিয়ে জমিতে সেচ দেওয়া অনেকটাই সুবিধেজনক। তাই আপনার জমিকে সঠিকভাবে পরীক্ষা করে তারপরে নির্দিষ্ট জায়গায় নালা তৈরি করবেন। নালা দিয়ে জমিতে সমভাবে এবং সহজেই জল সেচ দেওয়া যায় এবং জমিতে বেশি জল থাকলে সহজেই তা বের করে দেওয়া যায়।
রোগ প্রতিকার
রসুন গাছে দুই ধরনের পোকার আক্রমণ হতে পারে। প্রথমটি হলো থ্রিপস। এই পোকাটি ছোট কিন্তু পাতার রস শুষে নিয়ে গাছকে দুর্বল করে দিতে পারে। সেই কারণে ক্ষেতের মধ্যে যদি কোনও পাতা বিবর্ণ দেখেন তাহলে সেই পাতাটিকে ভালো করে মনোযোগ সহকারে দেখবেন। এই ধরনের পোকার আক্রমণ হলে গাছের ফলন ব্যাপকভাবে কমে যায়। এই পোকাটি আকৃতিতে অত্যন্ত ছোট। স্ত্রী পোকাটি দেখতে সরু এবং হলুদাভ। অন্যদিকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষ পোকা দেখতে গাঢ় বাদামি রঙের। এদের পিঠের ওপরে লম্বা দাগ দেখা যায়।
এই ধরনের পোকার প্রতিকার করার জন্য সাদা রঙের আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করা হয়। ক্ষেতে মাকড়সার সংখ্যা বৃদ্ধি করে এই পোকা দমন করা যায়। তবে যদি পোকার উৎপাত খুব বেশি হয়ে যায়, তাহলে সাইপারমেক্সিন গ্রুপের সাইপেরিন, সাইবার অথবা ইমেডিক্লোরোফিড গ্রুপের এডমায়ার প্রতি লিটারে এক মিলিলিটার মিশিয়ে স্প্রে করতে পারেন পরপর ৪ থেকে ৫ দিন। কীটনাশক প্রয়োগ করলে সাধারণত এর মধ্যেই থ্রিপস জাতীয় পোকা বিনাশ করা সম্ভব।
রসুন গাছের দ্বিতীয় সব থেকে সাধারণ রোগটি হলো কাণ্ড পচার সমস্যা। স্কেলেরোসিয়াম রলফসি, এবং ফিউজারিয়াম নামের ছত্রাক দ্বারা এই রোগ হতে পারে। যে কোনও বয়সে রসুন গাছ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণত শিকড়ে এই আক্রমণ দেখা যায়। আক্রান্ত রসুনে পচন ধরে যায় এবং আক্রান্ত রসুন বেশিদিন গুদামজাত করে রাখা যায় না।
এই ছত্রাকের উপদ্রব কমাতে হলে আক্রান্ত গাছ পুরোপুরি তুলে ধ্বংস করতে হবে। আপনার ক্ষেতে এই ধরনের ছত্রাকের বৃদ্ধি বাড়লে, মাটি কোনও সময় স্যাঁতস্যাঁতে রাখা যাবে না। আক্রান্ত জমিতে প্রতি বছর রসুন চাষ করা যাবে না। ম্যানকোজেব গ্রুপের কোনও একটি ছত্রাকনাশক ব্যবহার করে তারপরেই বীজ বপন করতে হবে আপনাকে।
ফসল সংগ্রহ
কোয়া লাগানোর প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার মাস পরে রসুন বাজারজাত করার জন্য উপযুক্ত হয়ে থাকে। এছাড়া পাতার ডগা যখন হলদে বাদামি হয়ে শুকোতে শুরু করে এবং বাইরের দিকের কোয়া লম্বালম্বিভাবে ফুলে ওঠে, সেই সময় বুঝবেন দু'টি কোয়ার মধ্যে একটা খাঁজ দেখা যাচ্ছে। সেটাই হলো রসুন তোলার সবথেকে উপযুক্ত সময়। তখন গাছ শুদ্ধ হাত দিয়ে টেনে তুলে মাটি ছেড়ে পরিষ্কার করে রসুন তুলবেন এবং তারপর চার-পাঁচ দিন ছায়ায় শুকোবেন। তারপরে কাণ্ড থেকে কেটে রসুন আলাদাভাবে সংগ্রহ করে বাজারজাত করতে হবে।
রসুনের পরিচর্যা করলে ১ বিঘা জমি থেকে ৭ থেকে ৮ কুইন্টাল মতো রসুন সহজেই পাওয়া যেতে পারে। আপনার জমির ওপর নির্ভর করবে আপনার রসুনের পরিমাণ। জমির পরিমাণ কম হলে রসুনের পরিমাণ কম হতে পারে। রসুন সংগ্রহ করে পরিষ্কার করে আকার অনুযায়ী বাছাই করে আপনাকে বিক্রির জন্য বাজারে পাঠাতে হবে। তবে রসুনের উৎপাদন নির্ভর করবে সম্পূর্ণ আপনার মাটির গঠন, এবং সার প্রয়োগের ওপর। যদি আপনার জমি ছোট হয়, কিন্তু আপনার জমি উন্নতমানের হয়, তাহলে আপনি ভালো জাতের রসুনের ফলন পাবেন। সেক্ষেত্রে আপনার লাভের অঙ্কটাও অনেকটা বাড়বে।
কত টাকা আয় হবে?
রসুন চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা। সহজে আয়ের হিসেব করার জন্য আমরা চাষের জমির আয়তন ১ একর ধরে এগোলাম। যদি আপনি ১ একর জমিতে রসুন চাষের পরিকল্পনা করেন, তাহলে সেখান থেকে প্রায় ৫০ কুইন্টাল মতো রসুন পেতে পারেন। আর প্রতি কুইন্টালে ১০,০০০ থেকে ২১,০০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করার সুযোগ থাকবে আপনাদের কাছে। প্রতি একর রসুন চাষ করার জন্য আপনাকে ৪০ হাজার টাকা মতো খরচ করতে হবে। এই হিসেব অনুযায়ী এক একর জমিতে যদি আপনি রসুন চাষ করেন, তাহলে ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকা আয় করতে পারবেন। অর্থাৎ, রসুন চাষ করতে যদি আপনার চার মাস সময় লাগে, তাহলে গড় হিসেব করলে প্রতি মাসে আপনার ২ লক্ষ টাকার কাছাকাছি আয় করার সুযোগ থাকছে।
















