ভাত জোটানোর লড়াই! জলেই জীবন কেটে গেল ৭৭ বছরের বৃদ্ধার

পরিবেশ, বয়স, অভাব- নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়েই বেঁচে থাকেন গোবিন্দাম্মা। দু'মুঠো অন্নের সংস্থানের জন্য লড়ে যেতে হয় তাঁকে।

Aritra Dasgupta
৩ মিনিট
ভাত জোটানোর লড়াই! জলেই জীবন কেটে গেল ৭৭ বছরের বৃদ্ধার

চেন্নাইয়ের এন্নোর অঞ্চলের ঠিক মাঝবরাবর বয়ে চলেছে দু'টি নদী। কোসস্তালাইয়ার এবং আরানিয়ার নদী। বহু পরে ব্রিটিশ শাসনকালে নদীগুলির নাব্যতা বৃদ্ধির জন্য খনন করা হয় একটি খাল। নাম বাকিংহাম ক্যানাল। এই দুই নদী ও বাকিংহাম খালের সঙ্গেই জড়িয়ে এক ৭৭ বছর বয়সি বৃদ্ধার জীবন ও রোজগার। সম্প্রতি পি সাইনাথ সম্পাদিত 'পিপলস আর্কাইভ অফ রুরাল ইন্ডিয়া'-য় উঠে এসেছে এই মর্মান্তিক কাহিনি।

সেই কোন ছোটবেলা থেকে আজও তামিলনাড়ুর এক ছোট্ট জনপদে চিংড়ি ধরে পেট চালাচ্ছেন গোবিন্দাম্মা। বয়সের ভারে আর শরীর চলে না। তবুও অন্নের সংস্থানে বৃদ্ধাকে নামতে হয় জলে। এত বছর ধরে চিংড়ি ধরতে ধরতে হাতে অজস্র কাটাছেঁড়া দাগ। আক্ষেপ করে গোবিন্দাম্মা বলেন, "বালি খুঁড়ে খুঁড়ে চিংড়ি ধরতে হয়। এই বুড়ো বয়সে এসে আর জাল ফেলে চিংড়ি ধরার সামর্থ আমার নেই। ২০০ টাকা রোজগারের জন্য হাত দুটো ফালা ফালা হয়ে যায়।"

কোসস্তালাইয়ার নদীর দুই পাশে ম্যানগ্রোভের বাদাবন নিয়ে গিয়ে মেশে পাড়াভেরকডু হ্রদে। এই ২৭ কিলোমিটার লম্বা নদীপথে মেলে অজস্র প্রজাতির চিংড়ি। এই নদীর আশপাশে যাঁরা থাকেন, তাঁদের বেশিরভাগেরই জীবিকা মাছ ধরা। এখানেই প্রতিদিন মাছ ধরতে আসেন ৭৭ বছরের গোবিন্দাম্মা। অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতিতে নদীবক্ষের বালিতে হাত ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে চিংড়ি ধরেন। তারপর সেগুলি জমা হয় কোমরে বাঁধা একটি তালপাতার থলিতে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কালিম্পং থেকে সুইজারল্যান্ড, গানের ভেলায় চেপে ভুবনজয় বাংলার পড়ুয়াদের

এই আন্তর্জাতিক সংগীত উৎসবে সমগ্র ভারত থেকে এই একটি দলই নির্বাচিত হয়েছে। এক অর্থে ইতিহাস গড়তে চলেছে দলটি।

ইরুলার তফিশিলি সম্প্রদায়ের সদস্য গোবিন্দাম্মা প্রথম দিকে থাকতেন চেন্নাইয়ের কামরাজার বন্দরের দিকে। সেখান থেকে খুব সহজেই নিকটবর্তী কোসস্তালাইয়ার নদীতে চিংড়ি মাছ ধরতে যেতেন গোবিন্দাম্মা। কিন্তু ২০০৪ সালের বিধ্বংসী সুনামি সবটা তছনছ করে দেয়।সুনামির দাপটে ভেসে যায় তার কুঁড়েঘর। তার পরের বছরই নিজের যেটুকু সহায়সম্বল রক্ষা করতে পেরেছিলেন, তাই নিয়ে চলে যান ১০ কিলোমিটার দূরের থিরুভাল্লুর জেলার আথিপাটটু শহরে। সুনামিতে ইরুলার জাতির যে সব মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তাদের অধিকাংশের ঠাঁই হয় অরুনোদ্যয়ম নগর, নেসা নগর ও মারিয়াম্মা নগরে।

গোবিন্দাম্মা থাকেন অরুনোদ্যয়ম নগরে। সুনামি-পরবর্তী সময় যে ঘরে স্থান পেয়েছিলেন গোবিন্দাম্মা, নাতনির বিয়ের পর সেই ঘরটাও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। বর্তমানে গোবিন্দাম্মার বাসস্থান একটি নিমগাছের তলায়। রোজ ভোর ৫টায় দিন শুরু হয় গোবিন্দাম্মার। ঘুম থেকে উঠেই দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে পাড়ি দেন আথিপাট্টু স্টেশনের দিকে। সেখান থেকে ট্রেনে চেপে দু'টি স্টেশন পেরিয়ে আম্মা নামেন পুরুনগর স্টেশনে। সেখান থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ হেঁটে আসেন আবার কামরাজার বন্দরের কাছে। এখানে এসেই মাছ ধরার কাজে লেগে পড়েন গোবিন্দাম্মা। কিন্তু এখন আর এই রোজের ধকল শরীর নিতে পারে না। চোখে প্রায়ই ঝাপসা দেখতে পান।

গোবিন্দাম্মা আক্ষেপের সুরে বলেন, "এত ধকলের পর যদি ২০০ টাকার বেশি না জোটে, কেমন করে পেট চালাব! কোনও কোনওদিন কপাল ভালো থাকলে ৫০০ টাকা রোজগার হয়, কিন্তু বেশিরভাগ দিনই ১০০ টাকা রোজগার করতে দম বেরিয়ে যায়।" চোখে ভালো জ্যোতি না থাকলেও আন্দাজে চিংড়ি ধরতে ওস্তাদ গোবিন্দাম্মা। দীর্ঘ এত বছরের অভ্যেস তাঁকে শিখিয়েছে মাছ ধরার অব্যর্থ কৌশল।

গোবিন্দাম্মার স্বামী খুব অল্প বয়সেই মারা যায়। তখন থেকেই এক ছেলে ও এক মেয়ের দায়ভার এসে পড়ে আম্মার কাঁধে। চিংড়ি মাছ ধরে হাটে বেচে বেচেই ছেলে ও মেয়েকে মানুষ করেছেন আম্মা। বিয়ে দিয়েছেন তাঁদের। গোবিন্দাম্মার রুটিরুজির ওপরেও থাবা বসিয়েছে উন্নয়ন। বাকিংহাম খালে এসে মেশে এন্নোর অঞ্চলের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির আবর্জনা। এছাড়াও রয়েছে আরও বিভিন্ন পেট্রো-কেমিক্যাল শিল্প ও সারের কারখানা। এইসব কারখানার বর্জ্যের ছাপে নদীগুলির অবস্থা খুবই সঙ্গিন হয়ে উঠছে দিন দিন। কমছে জলজ সম্পদও। উন্নয়নের ছাপে নদীগুলির এই পরিণতি দেখে গোবিন্দাম্মা চিন্তিত গলায় বলেন, "এককালে মুষলধারে বৃষ্টি নামলে প্রচুর চিংড়ি মিলত নদীতে। এখন তার অর্ধেকও মেলে না। বর্ষাকালে যাহবা কিছু বেশি পরিমাণ চিংড়ি মেলে, অন্য সময় চিংড়ি খুঁজে পেতে পেতেই বেলা গড়িয়ে যায়।"

পরিবেশ, বয়স, অভাব- নানা প্রতিবন্ধকতা নিয়েই বেঁচে থাকেন গোবিন্দাম্মা। দু'মুঠো অন্নের সংস্থানের জন্য লড়ে যেতে হয় তাঁকে।

লিখেছেন
Aritra Dasgupta
Aritra Dasgupta
1 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।