হরিশ সালভের বিয়েতে ফূর্তিতে ললিত মোদি! বড় অস্ত্র পেয়ে গেল কংগ্রেস...
Harish Salve wedding: হরিশ সালভের বিয়েতে মদের গ্লাস তুলে নবদম্পতির জন্য 'টোস্ট'ও করেন ললিত মোদি। দেখা গেছে মইন কুরেশিকেও।

রবিবার লন্ডনে তিন নম্বরবার বিয়ে করেছেন বিখ্যাত আইনজীবী হরিশ সালভে। করতেই পারেন, সে নেহাতই তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু সমস্ত ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিষয় নিছকই 'ব্যক্তিগত' নয়। তাতে জড়িয়ে পড়ে আস্ত দেশ, জড়িয়ে পড়ে অর্থনীতি এবং রাজনীতি। হরিশ সালভের বিয়ে শুধু তো বিয়ে নয়, বিশ্বজুড়ে জন্ম দিল বিতর্কের। মূলত দুই কারণে। এক, ললিত মোদিকে দেখা গিয়েছে হরিশ সালভের বিয়েতে। শুধু দেখা গেছে নয়, হরিশ সালভের বিয়েতে মদের গ্লাস তুলে নবদম্পতির জন্য 'টোস্ট'ও করেন তিনি। দেখা গেছে মইন কুরেশিকেও। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, হরিশ সালভে একজন প্রাক্তন সলিসিটর-জেনারেল। দেশে একযোগে সমস্ত নির্বাচন আয়োজনের সুপারিশ করতে যে উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি গড়া হয়েছে তার সদস্য নিযুক্ত হয়েছেন সালভে। আর এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ!
ললিত মোদি ছিলেন আইপিএলের পোস্টার বয়। তাঁর সেই পোস্টার বয় ইমেজে এসে লেগেছে তছরুপের কাদা। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এখন দেশ ছেড়ে, পালিয়ে গিয়ে ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে রয়েছেন ললিত মোদি। তবে ললিত বলছেন, পালাননি মোটেও। কোনও আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্তই করেনি, ফলে পালাবার প্রশ্নই নেই।
২০১৯ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় রাহুল গান্ধির সেই 'মোদি' বিতর্কে ফিরে যাওয়া যাক। সেই সময় কেন সব চোরের নামই মোদি প্রসঙ্গে রাহুল যে তিনজন মোদির নাম উল্লেখ করেছিলেন ললিত ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। এই মন্তব্যের জেরেই কংগ্রেস সাংসদের বিরুদ্ধে মামলা হয়, ওয়ানাড়ের সাংসদ পদ খারিজ করা হয়। পরে অবশ্য তা আবার ফিরেও পান রাহুল। এবার কংগ্রেস এই ললিত-সালভে বিতর্ককে ব্যবহার করতে পারে বিজেপির বিরুদ্ধে বড় অস্ত্র হিসেবে।
মইন কুরেশি কে? মইন কুরেশি হচ্ছেন মূলত একজন মাংস রপ্তানিকারক। অন্তত দুইজন সিবিআই পরিচালকের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তিনি। কর ফাঁকি এবং আর্থিক তছরুপের সঙ্গেও জড়িত তিনি। এই সব অভিযোগের প্রেক্ষিতেই নরেন্দ্র মোদি সরকার পদক্ষেপ করে। সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বা সিবিআইয়ের দুই শীর্ষকর্তা অলোক ভার্মা এবং রাকেশ আস্থানার বিরুদ্ধে চরম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরে তাঁদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়৷ শুরু তো অলোক ভার্মা বা রাকেশ আস্থানা নন, তার আগে আরও দু'জনের গায়েও লাগে দুর্নীতির কলঙ্ক। আর এই সকলের সঙ্গে একটিই নাম জড়িত। উত্তরপ্রদেশের একজন মাংস ব্যবসায়ী, তিনি মইন আখতার কুরেশি।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
ললিত মোদি আইপিএল-এর জনক। আইপিএল-এর প্রথম চেয়ারম্যান এবং কমিশনারও ছিলেন তিনি। শুধু তাই নয়, বর্তমানে লন্ডনে বসবাসকারী এই শিল্পপতির সম্পত্তির পরিমাণ শুনলে চোখ মাথায় উঠবে।

মইন কুরেশি প্রথম আয়কর বিভাগ, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট এবং সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির রাডারে আসেন ২০১১ সালে। পাকিস্তানের বিখ্যাত গায়ক রাহাত ফতেহ আলি খান মইন কুরেশির মেয়ের বিয়েতে গান গাইতে ভারতে এসেছিলেন। পাকিস্তান ফেরার পথে, রাহাত ফতেহ আলি খান ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাজস্ব গোয়েন্দা অধিদপ্তরের আধিকারিকদের হাতে নগদ ৫৬ লক্ষ টাকা সহ ধরা পড়েন। গায়ক দাবি করেছিলেন, দিল্লির একটি ফার্ম হাউসে, যেখানে মইন কুরেশির মেয়ের বিয়ে হয়েছিল সেখানে গান গাইতেই তাঁকে এই টাকা দেওয়া হয়।
এর পরের তিন বছর কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি মইন কুরেশিকে নজরে রাখে। দেখা যায় সর্ষের মধ্যেই রয়েছে ভূত! তদন্তের সময় প্রাক্তন সিবিআই ডিরেক্টর- এপি সিং এবং রঞ্জিত সিনহার নামও উঠে আসে৷
এবার প্রশ্ন উঠছে, এক-দেশ এক-নির্বাচন প্যানেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটির একজন সদস্য আর চরম দুর্নীতির অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের একই অনুষ্ঠানে একইসঙ্গে আনন্দ করা কতখানি নৈতিক? নৈতিকতার প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়েছেন হরিশ সালভে। তাঁর দাবি, মইন কুরেশি এবং ললিত মোদিকে কোনোভাবেই 'পলাতক' বলা যায় না। এসব নিতান্তই 'বাজে কথা!’
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পলাতকের এই প্রত্যক্ষ প্রেম উদযাপন অনেকেই ভালো চোখে দেখছেন না। ভারতীয় সরকারের অকর্মণ্যতার উদাহরণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে একে। আবার অনেকে তাঁদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের নজির টানছেন। যাই হোক, ফের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছেন ললিত মোদি।
মইন কুরেশি ভারতে থাকেন। ললিত মোদি পলাতক নন। ললিতের হয়ে সুপ্রিম কোর্টে লড়েছেন হরিশ সালভে এবং তাঁদের এই বন্ধুত্বের বিষয়েও কোনও রাখঢাক নেই। সালভে বলছেন, মইন কুরেশি ভারতে থাকেন এবং তাঁকে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে বলেই তিনি ঘন ঘন যুক্তরাজ্যে যান। এর মধ্যে অন্য কোনও ব্যাপারই নেই। যারা অন্য ব্যাপার খুঁজছেন তারা 'হিংসা' করছেন মূলত। এখানে উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে পদ্মভূষণ সম্মান পান হরিশ সালভে। ভারতীয় নাগরিক কুলভূষণ যাদবকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে একটি পাকিস্তানি আদালত মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার পরে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে তার মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তি দেন সালভে। তখন সালভে নামমাত্র পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন, ১ টাকা। সালভে যতই আইনের ভাষায় বিষয়টিকে নৈতিক প্রমাণের চেষ্টা করুন না কেন, বিজেপির পক্ষে মোটেই সুখকর নয় ঘটনাটি।
২০২৩ সালে, অসদাচরণ এবং শৃঙ্খলাভঙ্গের জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড বা বিসিসিআই ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের প্রথম কমিশনার ললিত মোদির উপর আজীবনের নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিসিসিআই বলেছিল, প্রশাসক হিসাবে ললিতের সমস্ত অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও কোনও পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার অধিকারী হবেন না ললিত। কোনও কমিটিতে বা বোর্ডের কোনও সদস্য অবধি হতে পারবেন না তিনি।
২০১৩ সালে দেশে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ ক্ষমতায় ছিল ঠিকই কিন্তু বিসিসিআই শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য ছিলেন প্রয়াত বিজেপি নেতা অরুণ জেটলি। ২০১০ সালে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি নিলামের সময় ললিত মোদির আর্থিক কারচুপির অভিযোগের তদন্তের পর এই শৃঙ্খলা কমিটি বিসিসিআইয়ের কাছে তার প্রতিবেদন পাঠায়। ওই কমিটি ললিত মোদিকে আর্থিক অনিয়ম সহ আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে।
শৃঙ্খলা কমিটিতে অরুণ জেটলির থাকা ছিল বড় ব্যাপার। বিসিসিআই-এর সহ-সভাপতি এবং দিল্লি ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি থাকাকালীন ক্রিকেট আমলাতন্ত্রের একজন বিশিষ্ট সদস্য ছিলেন জেটলি।কমিটিতে ছিলেন জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। তখন কংগ্রেসে ছিলেন, এখন আছেন বিজেপিতে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও তিনি ছিলেন। কেন্দ্রের মোদি সরকার আসার পরেই যে কেলেঙ্কারিগুলি সামনে আসে তারই অন্যতম ছিল ললিত মোদির এই ঘটনাটি।
২০১৫ সালে দেখা যায়, ব্রিটিশ যুক্তরাজ্যে থাকার জন্য ললিত যে আবেদন করেন, তার হয়ে গলা ফাটান বিজেপি নেত্রী বসুন্ধরা রাজে। যেই না ললিত বিতর্ক ওঠে, নরেন্দ্র মোদি স্পিকটি নট! তারপর থেকে কোনও অস্বস্তিকর বিষয় এলেই মোদি (নরেন্দ্র) এই পন্থাতেই আস্থা রাখেন।
এবার কী করবেন?






