চিন শুকিয়ে কাঠ! হু হু করে বাড়ছে তাপমাত্রা, কীভাবে এই অবস্থা হলো ড্রাগনের দেশের
ছয় দশকে প্রথমবার তাপমাত্রা এত উর্ধ্বমুখী এবং গত এগারো সপ্তাহ ধরে চিন তাপপ্রবাহ দ্বারা আক্রান্ত।

দৃশ্যটি একটি অফিসের। কর্মচারীরা নিজেদের কম্পিউটারে কাজে মগ্ন, বা বলা ভালো, মগ্ন হওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পারছেন না। প্রচণ্ড ঘামছেন। তাদের একটু স্বস্তি দেওয়ার জন্য রাখা আছে বিরাট বরফের চাঁই। যাতে একটু ঠান্ডা হয় চারপাশটা। মনে হতেই পারে, কোনও অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের কথা বলা হচ্ছে। না, দেশটি পৃথিবীর সবথেকে শক্তিশালী দেশগুলির মধ্যে একটা। তাহলে তো গোটা অফিসে এসি থাকার কথা? এসি আছে, কিন্তু চলছে না। গোটা অফিসই শীতাতপনিয়ন্ত্রিত, কিন্তু বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে। তাই চালানো সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে হবে, কারণ গোটা দেশে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ চলছে। তার জেরে বিদ্যুৎ উৎপাদন চূড়ান্তভাবে ব্যহত। তাই বরফের চাঁই দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে।
উপরের উদাহরণটাও ঠিক যথেষ্ট নয় বোঝানোর জন্য যে, চিন ঠিক কত বড় বিপদের সম্মুখীন হয়েছে। ছয় দশক আগে থেকে তাপমাত্রার রেকর্ড রাখা শুরু হয়েছে। এই ছয় দশকে প্রথমবার তাপমাত্রা এত উর্ধ্বমুখী এবং গত এগারো সপ্তাহ ধরে চিন তাপপ্রবাহ দ্বারা আক্রান্ত। চিনের মতো একটি বিশাল দেশের অর্ধেকের ও বেশি ভূখণ্ড এই মুহূর্তে রেড জোনে। এমনকী, হিমশীতল এলাকা বলে পরিচিত তিব্বতীয় মালভূমিতে ও ভয়ংকর গরম অনুভূত হচ্ছে। প্রশাসনের চিন্তা বাড়িয়ে পূর্বাভাস এসেছে যে, এখনই তাপপ্রবাহ থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
সবথেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইয়াংজি নদী অববাহিকা অঞ্চল। দক্ষিণ চিনের এই নদীর জলস্তর অস্বাভাবিক হারে নেমে গিয়েছে। ইয়াংজি অববাহিকায় বাস করেন ত্রিশ কোটি মানুষ। তারা সবাই এখন তীব্র তাপপ্রবাহ এবং তার কারণে হওয়া এই খরার ফলে জলকষ্টে ভুগছেন। সেই সঙ্গে এই নদীর জলস্তর কমে যাওয়ায় ব্যহত হয়েছে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, আর তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, দেশের অনেক অংশেই এখন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যহত। অনেক শহরে সরকারি নির্দেশিকা পৌঁছে গেছে, যাতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা হয়। খুব প্রয়োজন ছাড়া কোনও যন্ত্রই যেন চালানো না হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই সতর্ক করে বলছেন যে, পাকিস্তানের কাছে সবথেকে বড় বিপদ সন্ত্রাসবাদ নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন।
সেই সঙ্গে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো আর্থিকভাবেও চূড়ান্ত লোকসানের মুখে চিনের সরকার। একেই সরকারের কোভিড নীতি এবং আবাসন শিল্পের ভয়াবহ পতন চিনের অর্থনীতিকে যথেষ্ট আঘাত করেছে। সেই সঙ্গে এই এগারো সপ্তাহের তাপপ্রবাহ প্রভাব ফেলেছে শিল্প উৎপাদনে। বেশিরভাগ জায়গাতেই কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন সবাই। কোথাও অতিরিক্ত গরমের কারণে, কোথাও বিদ্যুতের অভাবে, কোথাও জলের অভাবে।
থমকে গিয়েছে পণ্যের পরিবহণ। দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে রেল এবং জলপথই সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ইয়াংজির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদী শুকিয়ে গিয়ে সেই কাজেও ডেকে এনেছে মহা বিপদ। জলস্তর এত নেমে গেছে যে, বড় কোনও জাহাজের পক্ষেই চলাচল করা সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে কোটি কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে চিনের।
স্বাভাবিকভাবেই সবথেকে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে কৃষিকাজ। অতিরিক্ত তাপ এবং জলের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফসল। দমকলের গাড়ি এনে ক্ষেতে জল দিতে হচ্ছে। একদিকে ফসল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে পণ্য সরবরাহ ব্যহত, সব মিলিয়ে দাম বাড়ছে খাদ্যশস্যের। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, চিনের সরকার তিন বিলিয়ন ডলার অনুদান ঘোষণা করেছে সমস্ত খরা-কবলিত এলাকার চাষিদের জন্যে।
গত কপ ২৬ সম্মেলনে চিন ঘোষণা করেছিল যে, তারা ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে ফেলবে। সেই সঙ্গে জলশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। একথা একটি শিশুও এখন জানে যে, গোটা বিশ্বেই তাপপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ এত বৃদ্ধি পাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবং সেই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো। এই খরা, তাপপ্রবাহ সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের ফসল, কিন্তু এই পরিস্থিতিতেও চিন কয়লার দিকে ঝুঁকছে, কারণ বৃহৎ নদীগুলিতে জলের অভাব।
এতকিছুর পর চিনের কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি করা একটা বিষয়ের দিকেই ইঙ্গিত করে। তা হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলি রোধে আমরা চূড়ান্ত ব্যর্থ এবং আরও বড় বিপদ আমাদের সবার জন্য অনেকক্ষণ করছে। আবহাওয়া আরও বেশি করে অনিশ্চিত হয়ে পড়বে, আরও বেশি সংখ্যক মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হবেন। তাতেও কি আমরা শিক্ষা নেব না?
















