শর্মিলা ঠাকুর থেকে বিদ্যা বালান, বাঙালির প্রিয় টয় ট্রেন যে কারণে আজও রহস্যময়

tiasa gupta
৩ মিনিট
শর্মিলা ঠাকুর থেকে বিদ্যা বালান, বাঙালির প্রিয় টয় ট্রেন যে কারণে আজও রহস্যময়

পাইন, দেবদারুর জঙ্গলের মাঝ দিয়ে, খরস্রোতা ঝরনাকে একপাশে রেখে কু-ঝিক-ঝিক শব্দে শীর্ণ রেলপথ ধরে সেই কোন কাল থেকে এগিয়ে চলেছে টয় ট্রেন। দার্জিলিং আর টয় ট্রেন – এই দুই নাম উচ্চারিত হলে কোনও বেরসিকেরও মনে রোমান্টিসিজম জাগতে বাধ্য। মন গুন গুন করে গেয়ে উঠতেই পারে- "মোর স্বপ্নের সাথী তুমি কাছে এসো, আজ ঋতু ফাল্গুনে কেন দূরে থাকো...’’

দার্জিলিংয়ের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ ধরে চলা হুড খোলা জিপে রাজেশ খান্নার লিপে এই গান আজও বহু বাঙালির হৃদয়ে রোমান্স জাগায়। হবে না-ই বা কেন? টয় ট্রেনে সওয়ারি ছিলেন শর্মিলা ঠাকুর। পরিচালকের ক্যামেরায় সেই টপ শটে একসঙ্গে ধরা পড়েছে টয় ট্রেনের জানালায় বসে শর্মিলা আর চলন্ত জিপে সওয়ারি মাউথ অর্গান বাজানো সেকালের সুপার হিরো রাজেশ খান্না। বাংলা ও হিন্দিতে সুপার-ডুপার হিট হয়েছিল সেই ছবি— ‘আরাধনা’।

১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়া সেই ছবির ওই বিশেষ দৃশ্যের শ্যুটিং হয়েছিল দার্জিলিং যাওয়ার পাহাড়ি পথে। তারপর আরও অনেক ছবির শুটিং হয়েছে দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি পথে, টয় ট্রেন, বাতাসিয়া লুপ, ঘুম স্টেশন, টাইগার হিলে।

করোনা সেই রোমাঞ্চেও থাবা বসিয়েছিল। তবে এখন মোহময়ী দার্জিলিংও স্বাভাবিক ছন্দে ফিরেছে। আর টয় ট্রেন আমাদের গর্বের স্মারক। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে-কে এই স্মৃতিমেদুর ঐতিহ্যের কারণেই ইউনেসকো ১৯৯৯ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য করেছে।

বলিউডের সঙ্গে পাহাড়ের নিবিড় যোগ। 'জগ্গা জাসুস’, ‘বরফি’, ‘পরিণীতা’-র মতো বেশ কিছু সিনেমার বহু দৃশ্য পাহাড় ও ডুয়ার্স অঞ্চলের রেলপথকে রীতিমতো মাইলস্টোন করে রেখেছে দর্শকমনে। বহু বলিউড ছবির শুটিং হয়েছে টয় ট্রেনে। বাংলা সিনেমা মনে করলে এই তালিকা যে আরও দীর্ঘ হবে, তা বলাই বাহুল্য।

পাহাড়ি পাকদণ্ডি বেয়ে আঁকাবাঁকা পথে ঘুরে ঘুরে টয় ট্রেনের ভ্রমণকথা লেখা রয়েছে অনেক রোমান্টিক মনের অতলে। সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে যোগাযোগের সু-বন্দোবস্ত করার জন্য টয় ট্রেন তৈরির প্রয়োজন অনুভব করেছিল ব্রিটিশ সরকার। ১৮৮১ সালের ৪ জুলাই সেই পথের উদ্বোধন হয়। যদিও তার আগে থেকেই দার্জিলিং নামে এই পাহাড়ি জনপদের কথা ধীরে ধীরে জানতে পারছিল বাঙালি, ইংরেজদের সৌজন্যেই। সেই আমলে জলধর সেনের বই থেকে দার্জিলিং তথা হিমালয়ে সম্মন্ধে অনেক কিছুই জানা যায়। তাও টয় ট্রেন তখনও বাঙালি মননে চেপে বসেনি।

এই পাহাড়ি রাস্তায় কীভাবে এই ছোট ট্রেন যেতে পারে, তা পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিক প্রযুক্তির এক অন্যতম উদাহরণ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ লগ্নে, ১৮৯৬ সালে, সাহিত্যিক মার্ক টোয়েন যখন দার্জিলিং গিয়েছিলেন, তখন তিনি এই ট্রেনে চড়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলেন। তখনই তিনি এর নামকরণ করেন টয় ট্রেন।

কত যে বিখ্যাত বাঙালি তথা বিদেশি এই টয় ট্রেনে দার্জিলিং গিয়েছেন, তার হিসেব নেই! মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হিমালয়ে প্রায়ই ঘুরতে যেতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রায়শই সুযোগ পেলে দার্জিলিং চলে আসতেন। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন লেখায় দার্জিলিংয়ের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বারবার। আর দার্জিলিং গেলে কবির পছন্দ ছিল এই টয় ট্রেন। কবি শেষবার পাহাড়-ভ্রমণ করেন এই টয় ট্রেনেই, পুত্র রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে। ১৯৪০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর শিলিগুড়ি টাউন স্টেশনে কবিকে দেখার জন্য লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল! যে-কথা মৈত্রেয়ী দেবী 'মংপুতে রবীন্দ্রনাথ' গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন।

সত্যজিৎ রায়ের 'কাঞ্চনজঙ্ঘা'-য় যে ভাবে দার্জিলিংকে ধরা হয়েছে, তাতে দার্জিলিং সাধারণ বাঙালির কাছে পাশের বাড়ি হিসেবে গড়ে উঠেছিল। যদিও সত্যজিৎ টয় ট্রেনকে গুরুত্ব দেননি। সারা সিনেমায় শুধু ট্রেনের হুইসেলের আওয়াজ শুনিয়েছিলেন।

গরমের দাপট বেড়েছে। এই অবস্থায় বাঙালি লোটাকম্বল নিয়ে যে পাহাড়ে পাড়ি দেবে, তা বলাই বাহুল্য। উত্তরবঙ্গে টয় ট্রেন পরিষেবা দিয়ে থাকে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে। বাংলা তথা ভারতের গর্ব এই ডিএইচআর-কে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ঘোষণা করেছে ইউনেসকো। দার্জিলিংয়ে যাবেন, অথচ টয় ট্রেন চড়বেন না, তা কী করে হয়? আর টয় ট্রেন বলতেই মনে পড়ে ঘুম স্টেশনের কথা। ঘুম থেকে টয় ট্রেনে চড়ে দার্জিলিং যেতে মাঝখানে পড়বে বাতাসিয়া লুপ। জায়গাটির দূরত্ব ঘুম স্টেশন থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার, আর দার্জিলিং শহর থেকে ৫ কিলোমিটারের মতো। ইংরেজিতে ‘লুপ’ মানে বক্রাকার কিংবা বৃত্তাকার কোনও অঞ্চল। পাহাড়ের চড়াই পথে টয় ট্রেনের যাত্রাকে সাবলীল করার জন্য ১৯১৯ সালে বাতাসিয়া লুপ গড়ে তোলা হয়। টয় ট্রেন বাতাসিয়া লুপে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে যায়, ফলে দার্জিলিংয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বৃত্তাকার ভিউ পাওয়া যায়। চোখে পড়ে তুষারধবল হিমালয়। বাতালিয়া লুপ থেকে বিশ্বের তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখলে তার স্মৃতি আপনার মনের মণিকোঠায় চিরকাল থেকে যাবে। পাহাড়ের রানি দার্জিলিং শহরটিকেও এই যাত্রাপথে অনবদ্য লাগে। এখানে রয়েছে বিশাল মনোরম বাগান। বহু রকমের গাছে সাজানো। রংবেরঙের ফুল আপনাকে মুগ্ধ করবে।

করোনার দাপট কমেছে। মন আবার উড়ু উড়ু। বাঙালিকে পাহাড় যে ডাকছে, তা বললে ভুল হয় না। কাজেই কাঁধে রুকস্যাক নিয়ে মন ছুটে যাক মেঘের দেশে। বেরসিক মনেরও গেয়ে উঠতে দোষ কী-

"...মেঘের ব্যাগের ভেতর

ম্যাপ রয়েছে মেঘপিওনের পাড়ি

পাকদণ্ডি পথ বেয়ে তার বাগানঘেরা বাড়ি...’’

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।