জোব চার্নক তামাক খেয়েছিলেন গাছতলায় বসে, কলকাতার এই বাজারের নাম সাক্ষী ইতিহাসের

কলকাতার বিভিন্ন এলাকার মতোই কলকাতার বাজারগুলির নামের পিছনে লুকিয়ে আছে অনেক অজানা গল্প।

Raktim Dey
৩ মিনিট
জোব চার্নক তামাক খেয়েছিলেন গাছতলায় বসে, কলকাতার এই বাজারের নাম সাক্ষী ইতিহাসের

বাজারের বয়স প্রায় দেড়শো বছর হলেও মানুষের কাছে সে নিউ মার্কেট নামেই পরিচিত কেন? উচ্চারণের ভুলে জগু হয়ে যাওয়া যদু আসলে কে? কংক্রিটের জঙ্গলে ঢাকা এলাকার নাম কি সুন্দরবনের এক ধরনের ম্যানগ্রোভের নাম থেকে অনুপ্রাণিত? বহু কি হিন্দি ভাষার পুত্রবধূ নাকি বাংলা ভাষার অনেক? কলকাতার চারটি বিখ্যাত বাজার এলাকার নামের মধ্যে লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের অজানা গল্প।

কলকাতায় ব্রিটিশ শাসনের শুরুতে শুধু ব্রিটিশদের জন্য কোনও বাজার ছিল না। তথাকথিত হোয়াইট টাউন, অর্থাৎ যেখানে শুধু ব্রিটিশরা থাকবে তার মধ্যে ডালহৌসি এলাকায় একটি বাজার এবং নিকটবর্তী এলাকায় টেরিটিবাজার থাকলেও তার আশপাশের এলাকায় ভারতীয় এবং অন্যান্য দেশের বহু মানুষ বসবাস করতেন। সেই কারণে বহু ব্রিটিশ সেখানে যেতে পছন্দ করতেন না। কথিত আছে যে, বর্তমান লিন্ডসে স্ট্রিট এলাকায় ফ্রেনউইকস বাজার নামে একটি ছোট বাজার থাকলেও সেই বাজারে অনেককিছুই পাওয়া যেত না। ব্রিটিশদের অনুরোধে ১৮৭১ সালে এক নতুন বাজার তৈরির প্রস্তাব পাশ হয়। স্যার স্টুয়ার্ট সন্ডার্স হগ সেই সময় কলকাতা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ১৮৭৪ সালে ধর্মতলা এলাকায় তৈরি হলো এক প্রকাণ্ড বাজার। ব্রিটিশরা খুশি হয়ে সেই নতুন তৈরি হওয়া বাজারের নাম দিল নিউ মার্কেট। ১৯০৩ সালে স্যর স্টুয়ার্টের নামে এই বাজারের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় স্যার এস.এস. হগ মার্কেট। নাম পরিবর্তন হলেও আজ অবধি মানুষের কাছে এই বাজার নিউ মার্কেট নামেই বেশি পরিচিত। নিউ মার্কেটের বাজার তৈরির সময় ইংল্যান্ডের হাডার্সফিল্ড থেকে একটা বিশালাকার ঘড়ি আনা হয়েছিল, যা আজও নিউ মার্কেটের উঁচু ঘড়ি মিনারে দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমানে নিউ মার্কেটে প্রায় ২০০০-এর বেশি বিভিন্ন জিনিসপত্রের দোকান রয়েছে এবং প্রায় প্রত্যেকদিন এখানকার বাজারে জনসমাগম হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
পথের মাঝে বাড়ি, দু'ভাগ হয়ে গেল বাসরাস্তা! কলকাতার এই অঞ্চলে ইতিহাস কথা বলে

কলকাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া বহু জিনিস আজও বাগবাজারে পাওয়া যায়। কলকাতার বহু প্রান্তে যেখানে ঠাকুরদালান এবং বড় থামওয়ালা বাড়িগুলো ভাঙা পড়ছে, সেখানে বাগবাজারে এই ধরনের বাড়িগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে।

জগুবাবুর বাজার নামটার সঙ্গে বহু মানুষ পরিচিত হলেও আসলে মানুষটার নাম যদু ছিল, তা খুব কম মানুষই জানেন। রানি রাসমনির দ্বিতীয় কন্যা কুমারী দাসীর ছেলের নাম ছিল বাবু যদুনাথ চৌধুরী। রানি রাসমনি এই বাজার এলাকায় এক বিশাল বাগানবাড়ি কিনে সেই বাড়ি এই নাতিকে দান করেছিলেন। যদুনাথ এই বাড়ির আশেপাশে বিভিন্ন বিক্রেতাদের তাঁদের জিনিসপত্র বিক্রি করতে দিয়েছিলেন। সেই কারণে বাবু যদুনাথ চৌধুরীর নাম থেকে এই বাজারের নাম হয়ে যায় যদুবাবুর বাজার। পরবর্তীকালে সাধারণ মানুষের উচ্চারণের ভুলে এই শতাব্দীপ্রাচীন বাজারের নাম হয়ে যায় জগুবাবুর বাজার।

দক্ষিণ কলকাতার বাজার এলাকার কথা বললে গড়িয়াহাট এলাকার নাম আসতে বাধ্য। গড়িয়াহাটের বিশাল এক এলাকাজুড়ে রাস্তার দু'পাশে অসংখ্য দোকান রয়েছে। যদিও গড়িয়াহাটের নামের মধ্যে হাটের উপস্থিতি তার বাজারের পরিচিতি প্রদান করে কিন্তু গড়িয়া অংশটা একটা হেঁয়ালির মতোই থেকে যায়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন মতামত থাকলেও সবথেকে গ্রহণযোগ্য মতবাদটা বর্তমানে শুনলে অনেকেই অবাক হয়ে যায়। সম্ভবত, গুড়িয়া অথবা গোড়িয়া গাছের নাম থেকে গড়িয়া নামটি এসেছে। এই ধরনের গাছ বর্তমানে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ অরণ্যে দেখতে পাওয়া যায়। সম্ভবত প্রাচীন কলকাতার এই এলাকায় গুড়িয়া গাছের জঙ্গলের কাছে বসা একটা হাটের নাম থেকেই গড়িয়াহাট নিজের নাম পেয়েছে।

মধ্য কলকাতার বউবাজারের নাম আসলে ছিল বহু বাজার। এই বহু শব্দের উৎস নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে যে, জনৈক বিশ্বনাথ মতিলাল তার পুত্রবধূকে এই বাজার উপহার দিয়েছিলেন। হিন্দি ভাষায় পুত্রবধূকে বহু বলা হয়। তাই এই বাজারের নাম হয় বহু বাজার। যদিও কথিত আছে যে, বিশ্বনাথ মতিলাল নুনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বিশ্বনাথের সম্পর্কে বেশি কিছু জানতে পারেননি। বহু বাজারের নামের অপর উৎস বাংলা ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কথিত আছে যে, এই এলাকায় এক প্রকাণ্ড এলাকাজুড়ে বিভিন্ন জিনিসের বাজার বসত। খাদ্যসামগ্রী থেকে বিভিন্ন জামাকাপড় এবং প্রসাধন সামগ্রী এইসব বাজারে বিক্রি হতো। এই বিভিন্ন রকমের জিনিসের বাজারের কারণে এলাকার নাম হয়ে যায় বহু বাজার।

কলকাতার পুরনো বাজার সম্পর্কে কথা উঠলেই বৈঠকখানা রোড এলাকার বাজারের নাম আসতে বাধ্য। ১৭৫৮ সালের এক মানচিত্রে এই বাজারের নাম দেখতে পাওয়া যায়। কথিত আছে যে, ব্যবসায়ীরা যাত্রাপথে অথবা দিনের শেষে এই এলাকার এক বিরাট বটগাছের নিচে বসে কিছুটা সময় বিশ্রাম নিতেন এবং গল্প করতেন। এই বট গাছতলার আড্ডা থেকেই এলাকার নাম হয়ে যায় বৈঠকখানা। বিভিন্ন নথি থেকে জানা যায় যে, জোব চার্নক নিজেও কলকাতায় আসার পর এই গাছতলায় বসে তামাক খেয়েছিলেন।

কলকাতার বিভিন্ন এলাকার মতোই কলকাতার বাজারগুলির নামের পিছনে লুকিয়ে আছে অনেক অজানা গল্প। হয়তো এই বাজারগুলো আধুনিক শপিং মলের আগ্রাসন দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে। সারাদিনে বাজারে অসংখ্য কোলাহলের মধ্যে তাদের সেই না-বলতে পারা গল্প হয়তো চাপা পড়ে যায়।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।