মমতা-ধনখড়ই প্রথম নন, এর আগেও ধুন্ধুমার বেধেছে রাজ্য-রাজ্যপালে

Piya Saha
৩ মিনিট
মমতা-ধনখড়ই প্রথম নন, এর আগেও ধুন্ধুমার বেধেছে রাজ্য-রাজ্যপালে

ফের একবার রাজ্য রাজনীতি সরগরম মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের সংঘাতে। যত বেশি সময় গড়াচ্ছে উত্তাপের পারদ ক্রমশই ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। দিনকয়েক আগেই মুখ্যমন্ত্রী জনসমক্ষে জানিয়েছিলেন তিনি রাজ্যপালকে টুইটারে ব্লক করেছেন। একই সঙ্গে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে তিনি বলেছেন রাজভবন থেকে তাঁর ফোনে আঁড়ি পাতা হচ্ছে। শুধু মুখ্যমন্ত্রী নন, তাঁর ক্যাবিনেটের একাধিক হেভিওয়েট মন্ত্রীও রাজ্যপালকে অপসারণের দাবিতে সরব হয়েছেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর পুলিশ সুপারকে ভর্ৎসনা করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরও একদফা সংঘাত সৃষ্টি হয় দুপক্ষের মধ্যে। এবার রাজ্যপাল জগদীপ ধনকর সংবিধান বহির্ভূত কাজ করেছেন ,এই অভিযোগে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন আইনজীবী রমাপ্রসাদ সরকার। আগামী সপ্তাহে এই মামলার শুনানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতীতেও একাধিকবার রাজ্যপালের কার্যকলাপ নিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকী গত বছরও রাজ্যপালকে অপসারণের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন মমতা ও তাঁর ক্যাবিনেট মন্ত্রীরা। তবে এবারে প্রেক্ষিত ভিন্ন। অনেকের মুখেই শোনা গেছে, রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীর এমন সংঘাত বেনজির। কিন্তু তেমনটা একেবারেই নয়। ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে আগেও এমন বহু রাজ্যপাল বাংলায় এসেছেন যাঁদের সাথে রাজ্য তথা তৎকালীন শাসক দলের সম্পর্ক মোটেও সুন্দর ছিল না।

রাজ্যপাল ধর্মবীর বনাম মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়

১৯৬৭ সালে তৎকালীন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় ও রাজ্যপাল ধর্মবীরের মধ্যে তুমুল সংঘাত বাঁধে। সেবছর বিধানসভা ভোটের পর ২৮০ টি আসনের মধ্যে ১২৭ টি আসনে জিতেছিল কংগ্রেস। যুক্তফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী পদের মুখ ছিলেন তমলুকের অজয় মুখোপাধ্যায়। মুখ্যমন্ত্রী পদে যোগ দেওয়ার পরেই রাজ্যপাল ধর্মবীর চিঠি পাঠিয়ে তিনদিনের মধ্যে যুক্তফ্রন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের কথা বলেন। মুখ্যমন্ত্রী চিঠির উত্তরে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পূর্বনির্ধারিত সময় মত যা হওয়ার তা বিধানসভায় হবে। এতেই বেজায় চটে যান ধর্মবীর এবং মন্ত্রিসভা বাতিলের সুপারিশ করেন কেন্দ্রের কাছে।

বামফ্রন্ট সরকার ও রাজ্যপালের সংঘাত

১৯৮৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের নিয়োগকে কেন্দ্র করে বাম সরকার ও তৎকালীন রাজ্যপাল এপি শর্মার মধ্যে সংঘাত তুঙ্গে পৌঁছায়। বাম সরকার মনোনীত প্রার্থী রমেন পোদ্দারের বদলে রাজ্যপাল সেই পদের জন্য সন্তোষ ভট্টাচার্যের নাম অনুমোদন করেন। এপি শর্মার মতে, ভোটে সন্তোষ ভট্টাচার্য এগিয়ে ছিলেন তাই তিনি যা করেছেন তা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু বাম সরকার তা মানতে নারাজ প্রত্যুত্তরে তাঁরা বলেন, অতীতে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর থেকে কম ভোট পেয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ। ফলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাম সরকার।ভোটকে গুরুত্ব দিতে নারাজ তাঁরা। প্রথম দিন কাজে যোগ দিতে গিয়েই বাধা পান সন্তোষ ভট্টাচার্য। পরে তিনি এই পদ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান তিনি। বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান সরোজ মুখোপাধ্যাযয়ের ডাকা বৈঠকে ঠিক হয়, কেউ রাজ্যপালের সভায় যোগ দেবেন না। রাজ্যপালকে বয়কটের ডাক দেন বাম সরকার। এমনকী জ্যোতি বসুর নবনির্বাচিত মন্ত্রী নিহার বসুর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানেও যোগ দেননি। আটের দশকে বামেরা বলেছিল, রাজ্যপাল নামক পদটিরই কোনো প্রয়োজন নেই।আরেক রাজ্যপাল বি ডি পান্ডেকে তৎকালীন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত নাম দিয়েছিলেন বাংলা দমন পান্ডে।

ফলে ইতিহাস দীর্ঘ। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত এত বেআব্রু ছিলনা কখনই। সৌজন্যের সম্পর্ক রেখেই রাজ্যপাল ও মুখ্যমন্ত্রীর সংঘাত চলেছে দীর্ঘদিন ধরে। তৃণমূল জমানায় রাজ্যপালকে যেভাবে একের পর এক লাগামছাড়া ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে তা নজিরবিহীন। চলতি বিতর্কের মাঝেই মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলছেন, "রাজ্যপালকে অনুরোধ করছি দয়া এই গ্যাস চেম্বারে থাকবেন না,আপনি দয়া করে এবার মুক্তি পান"।উল্টো সুর বিজেপি নেতা জয়প্রকাশের গলাতেও। সরাসরি রাজ্যপালকেই আক্রমণ করে বিজেপি নেতা বলেন, 'আপনার অবস্থানে শাসক দল সহানুভূতি পাচ্ছে না? রাজ্যবাসী রাজ্যপালের থেকে রাষ্ট্রনেতাসুলভ আচরণ প্রত্যাশা করে। প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতে রাজ্যের লাভ হচ্ছে? মিডিয়ায় মুখ খুলে, টুইট করে সমাধান সম্ভব? তবে রাজ্যপালের সাথে সম্পর্কের উন্নতির জন্য সরকারের তরফে তেমন প্রয়াসও নজরে পড়েনি সাম্প্রতিক সময়ে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।