বাজেটে কুড়ি হাজার কোটি টাকার সড়ক-প্রতিশ্রুতি আসলে পরিবেশ ধ্বংসের ফতোয়া

Satyaki Tat
৩ মিনিট
বাজেটে কুড়ি হাজার কোটি টাকার সড়ক-প্রতিশ্রুতি আসলে পরিবেশ ধ্বংসের ফতোয়া

ইন্টারনেটের দৌলতে প্রায়ই দেখি পরিবেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখা, বা ভিডিও। প্রতিটি প্রতিবেদনই চিৎকার করে আমাদের বলে, এবার তো কিছু করো!! পরিবেশ উষ্ণ হয়ে যাচ্ছে, ধ্বংসের পথে এগোচ্ছি আমরা। এইসবের মাঝেই একদিন দেখলাম, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গেছেন গ্লাসগোতে। কপ সম্মেলনে। কপ বা কনফারেন্স অব পার্টিস নামে এই সম্মেলনে রাষ্ট্রপুজ্ঞের সব সদস্য দেশ, বিজ্ঞানী, বহুজাতিক সব সংস্থা, তারা একজোট হয়ে আলোচনা করেন, প্রতিকার খোঁজেন এই পরিবেশ দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের। আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেখানে কী বললেন? ছোটো করে বললে,

২০৭০ সালের মধ্যে দেশ নেট জিরো কার্বন অর্থাৎ যত কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করবে তত পরিমাণই পরিবেশ থেকে শুষে ফেলবে এবং শোধিত করবে এই আশ্বাস দিলেন। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে জীবাস্ব জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পাঁচশো গিগাওয়াট শক্তি পুনর্নবীকরণ পদ্ধতিতে ব্য়বহার করবে। ওই এক বছরের মধ্যে মধ্যে এক হাজার কোটি টন কার্বন নিঃসরন কমানো হবে।

লক্ষ্য করার মত বিষয় হল, বাস্তুতন্ত্র এবং সবুজের আচ্ছাদন রক্ষা করার মত কোনো প্রতিশ্রুতি নেই তাঁর কথায়। এবং বিজ্ঞানীরা ২০৫০ সালের যে লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছেন তার থেকে কুড়ি বছর বেশি সময় চাইছে আমাদের সরকার।

কাট টু এই অর্থবর্ষের বাজেট। সেখানে আমাদের দেশের অর্থমন্ত্রী কতো টাকা পরিবেশের জন্যে বরাদ্দ করলেন, আগামী দিনের জন্য কী দিশা দেখালেন, দেখি, সেই বিষয়ে এবার আলোকপাত করা যাক।

শুরুতেই তিনি, তার প্রধানমন্ত্রীর কথার সূত্র ধরে উল্লেখ করেন জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের দেশের জন্যে প্রধান চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে একটি। তা এত গুরুত্বপূর্ণ যখন, নিশ্চয়ই অনেক টাকা বরাদ্দ করা হবে এই খাতে, আগের বারের থেকে বরাদ্দ বাড়বে,এটাই ভাবা হচ্ছিলো। মোটের ওপর বরাদ্দ বেড়েছে ঠিক ই, কিন্তু বেড়ে সেই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে মাত্র তিন হাজার তিরিশ কোটি টাকায়। আমাদের প্রতিরক্ষা খাতে কত বরাদ্দ হয়েছে জানেন? পাঁচ লক্ষ পঁচিশ হাজার কোটি টাকা। তুলনা করছি না, সংখ্যাটা রাখলাম।

একটু খুঁটিয়ে দেখা যাক পরিবেশ বাজেটকে। বাজেটে জানানো হয়েছে, সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি কার্বন নির্গমন রুখতে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে মোট জ্বালানির ৫-৬% বায়োমাস ব্যবহার করা হবে। ডিপ সি মিশনের জন্যে বরাদ্দ করা হয়েছে ৬৫০ কোটি। গ্রিন ইন্ডিয়া, প্রজেক্ট টাইগারের জন্যেও বরাদ্দ হয়েছে অর্থ। এছাড়াও ২০৩০ সালের মধ্যে দেশীয় সৌরশক্তির পরিকাঠামো তৈরিতে আলাদা করে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে, যেটা বলতেই হবে, আপাত দৃষ্টিতে ভালো পদক্ষেপ এবং এই অর্থ ঠিক ভাবে খরচ হওয়া কাম্য।

তাছাড়াও বৈদ্যুতিন গাড়ির ব্যবহার যাতে বৃদ্ধি পায়, সেই নিয়েও পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে এই বাজেটে। কিন্তু, সামগ্রিক ভাবে দেশে পরিবেশ রক্ষার বিষয়ে কি প্রতিফলন ঘটেছে? বরাদ্দ কমেছে বায়ুদূষণ, উপকূল প্রকল্পে। বাজেটে শুধু শোনা গিয়েছে, পরিবেশ সংক্রান্ত শব্দের ফুলঝুড়ি।

কোথাও হয়েতো মনে হতে পারে, গত বছরের থেকে ৫.৬% হলেও তো বরাদ্দ বেড়েছে, তাছাড়া সৌরশক্তির পরিকাঠামো তৈরিতে এত টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ঠিকই। সেই প্রসঙ্গে এবার আসি।

পরিবেশ কর্মী জশ মারওয়া, যিনি লেট ইন্ডিয়া ব্রিদ সংগঠনে-সহ প্রতিষ্ঠাতা, তিনি বলছেন, "শুধুমাত্র কথায় কথায় ক্লাইম্যাক্স অ্যাকশান কথাটি উল্লেখ করলেই সেই বাজেট পরিবেশ বান্ধব হয়ে ওঠেনা। এবার সময় এসেছে অতিরিক্ত কথার জায়গায় কাজের কাজ করার। পরিকাঠামো খাতে, যা পরিবেশকে ধ্বংস করবে, তাতে লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করে প্রধানমন্ত্রী কীভাবে কপ সম্মেলনে দেওয়া কথা রাখবেন তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।"

কোন পরিকাঠামোর কথা বললেন জশ? যাতে পরিবেশের ক্ষতি হবে?

দু'টি বিষয় উল্লেখ করি।

এক, কুড়ি হাজার কোটি টাকার রাস্তা এবং পরিকাঠামো প্রকল্প, যার বেশির ভাগই হবে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস করে।

দুই, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সরকারের নদী সংযোগকারী প্রকল্প। বুন্দেলখন্ডের কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ করার পরিকল্পনা করেছে সরকার। এই প্রকল্পের অনেকদিন ধরে বিরোধিতা করছেন পরিবেশবিদরা। কেন? প্রায় তেইশ লক্ষ গাছ কাটা যেতে চলেছে এই প্রকল্পের জন্যে, শুধু তাই নয়, পান্না ব্যাঘ্র প্রকল্প প্রচণ্ড পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই নদী দুটি সংযোগ করা হলে, আর বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি তো ছেড়েই দিলাম। আমাদের পরিবেশপ্রেমী সরকার এই প্রকল্পে ৪৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে।

দুরন্ত গতিতে শহরায়ন করার কথা বলা হচ্ছে, বলা হচ্ছে পরিকাঠামো বৃদ্ধির কথা, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে দেশের যে প্রান্তিক মানুষরা ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের জন্যে একটি টাকা তো দূর, একটা শব্দও খরচ করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী গতি শক্তি প্রকল্পে "Clean Energy" ব্যবহার করা হবে বলা হয়েছে, কিন্তু কী ভাবে? কোনো হদিশ নেই। মধ্যপ্রদেশের বক্সওয়াহা জঙ্গলে হিরের খনি খনন করা হবে তিন লক্ষ গাছ কেটে, যদিও এই বিষয়টা কেন্দ্রীয় বাজেটে আসার কথা নয়, কিন্তু প্রকল্প কেন্দ্রের শাসক দলেরই।

তাহলে কাজের কাজ? হচ্ছে, পরিবেশ ধ্বংস। দু'টি নদী জুড়ে, তেইশ লক্ষ গাছ কেটে।

লিখেছেন
Satyaki Tat
Satyaki Tat
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।