প্রধানমন্ত্রী থেকে কাউন্সিলর- ক্ষমতার মাথায় যেভাবে ছাতা ধরে এসেছেন প্রজারা
Holding Umbrella Over Kings: প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধান, সকলের মাথার উপর ছাতা ধরে থাকেন নিরাপত্তারক্ষীরা।

যাদবপুর এইট বি মোড়। অটো, আঁতেল, খুচরো বিপ্লবী, বিষণ্ণ যুবক, চকিত যুবতীদের ভিড়। ঠিক মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন সাদা পোশাকের লেনিন। মানে সাদা রঙের লেনিন বলা যাক। একইভাবে তাকিয়ে রয়েছেন বহুবছর ধরে। প্রতিশ্রুতির উত্থান, আর বিপ্লবের পতন দুই দেখছেন। মূর্তি বলে কি ভাবলেশ নেই নাকি! লেনিনের মাথার উপর তাই রয়েছে একটি ছাতা। রোদ জল তাঁকে জ্বালায় না, কাকেরা কর্ম করে না। মূর্তি ঠায় তাকিয়ে থাকে, ঘিঞ্জি রাস্তার দিকে। সর্বহারার নেতার সম্পদ বলতে তো এটুকুই আশ্রয়। নচেৎ রাশিয়া, হোক বা ইরান, দিল্লি হোক বা পশ্চিমবঙ্গ, পার্টি অফিসই ফসকে যাচ্ছে পায়ের তলার জমির মতো। ছাতাটির কথায় আসা যাক। ছাতা ব্যাপারটা যতটা মধ্যবিত্ত, ছত্র ততটাই অভিজাত। গরিব মধ্যবিত্তের মাথার উপর 'ছত্র' নয়, ছাতিই জোটে। নিজের যা জোটে, তাই মূর্তি, শিবলিঙ্গ, সবকিছুর মাথার উপরও জুটে যায়। খেটে খাওয়ারা ছত্রধর হন, খাটিয়ে খাওয়ারা ছত্রপতি। দস্তুর মোটামুটি এই।
“হিতোপদেশ? কার উপদেশ? হিতাহিতের বিচার করে কে? কে দেয় উপদেশ? নাম জানো না তো? যার নাম নাই, তাঁর কথার দাম নাই। হিতাহিতের বিচার করে কে? শোনো, করেন হীরক রাজ!”
উদয়ন পণ্ডিতের পাঠশালায় যখন রাজার হিতোপদেশ প্রচারে এসেছেন শিক্ষামন্ত্রী ও রাজকবি, দুই ভৃত্য তাঁদের মাথায় ধরে আছে ছাতা। রোদ থেকে রাজতন্ত্রকে বাঁচাচ্ছেন প্রজারা। আর প্রজাদেরই সন্তানাদির পা থেকে জমি, মাথা থেকে আশ্রয় দুই হাসতে হাসতে কেড়ে নিচ্ছেন হীরকরাজা। সে বড় বড় দেশে অমন ছোটখাট ঘটনা ঘটেই থাকে। রোদে জলে ছাতা ভরসা কারণ রোদ বা জল, দুইই দুর্বলতা। রাজা বা নেতারা নিজের দুর্বলতা নিজেরা ছাতা দিয়ে ঢাকছেন এসব বোধ শ্রেণিগত চেতনার ছাঁকনিতে আটকে যায়। যিনি অন্ন জোগান, যিনি স্কিম জোগান, যিনি ভাণ্ডারে মাসোহারার বন্দোবস্ত করেন, তিনিই তো আমজনতার আশ্রয়। তিনিই রাজা! তাই আশ্রয়ের মাথার উপর মহাশ্রয় দরকার। রাজার মাথাতেই ছায়া দরকার। ছাতা ব্যাপারটা চিরকালই অমন। রাজা কি নিজের ছাতা কখনও নিজে বইতে পারেন? রাজনৈতিক নেতারা কি কখনও নিজের কাপড় নিজে কাচেন? কাচলেই বরং ইদানীং ঘটা করে প্রচার করতে হয়! ছাতা আর ছত্রধর তাই ছায়ার মতো লেপ্টে থাকে। ছাতা আবিষ্কার যবে থেকে হয়েছে, বিষয়টাতে দেবতা আর রাজা ছাড়া কারও অধিকারই ছিল না। মিশরের প্রাচীন সব ছবি সাফ জানান দেয়, ২৫০০-২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ দিকে রাজা ও দেবতাদের ছায়া দিতেই ছাতা ব্যবহার করা হতো।

- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
History of the Umbrella: বর্ষে বর্ষে যুগে যুগে এই ছাতার প্রয়োজনীয়তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছে মানুষ। রোদ বৃষ্টিতে মাথা ঢাকা তো আছেই। তবে ছাতার কাজ কি শুধু তাতেই সীমিত নাকি!
মার্কো পোলোও বলেছেন ১২৭৫ খ্রিস্টাব্দে কুবলাই খানের দরবারে তিনি দেখেছেন সেনাপতির মাথার উপর ছাতা। নিজেরা কেউ ছাতা ধরতেন না। ধরতেন ভৃত্যরা। ধরতেন অন্ত্যজরা। জাপানে কয়েকশো বছর ধরে ছাতা ব্যবহারের অধিকার ছিল কেবল রাজাদের। প্রাচীন কোরিয়াতে রাজার ছবি আঁকাই যেত না। রাজা বোঝাতে ঘোড়ার উপর রাজছত্র আঁকলেই হলো। মানে সোজাসাপটা হিসেব বলছে, রাজা আর রাজছত্র একই মুদ্রার একই পিঠ। ভারতেও ব্যাপারটা একই, সে মোগল দরবার হোক বা হীরক রাজার সভা। ছাতা যার মাথায়, সে যে মান্যিগণ্যি ব্যক্তি বুঝতে অসুবিধা হয় না। ভারতে ইংরেজরা আসার পর ছাতা ধরার পেশাটি সাহেবি আদবকায়দায় মোড়া হয়ে যায়।
মিশরে আবার ছাতা নাকি রাজার ঐশ্বরিক মর্যাদার প্রকাশ। রাজার ছাতার নীচের ছায়ারও প্রতীকী অর্থ ছিল। রাজার ছাতা ক্ষমতার প্রতীক বটেই, রাজার ছাতার ছায়াও ছিল সাংঘাতিক অর্থবহ! রাজা শুধুমাত্র নিজের ছাতার ছায়া কারও উপর ফেলেই তাকে দাসে পরিণত করতে পারেন, চাইলে মেরেও ফেলতে পারেন। তবে রাজা যে প্রজাদরদি হবেন না এমনও না। ছাতা এবং ছাতাধরা বিষয়ে ভারতের মহাকাব্য ও মহাকাব্যিক চরিত্রদের অবস্থান ছিল অন্য। ভারতের কাহিনি প্রজা অন্ত প্রাণ রাজাদের গল্পই বলে। দুই বিখ্যাত রাজা কৃষ্ণ আর রামের ছবি যেভাবে আঁকা হয়েছে তা 'রাজা' শব্দটির ভার ও আভিজাত্যকে লঘু করে দিয়েছে। রাজা এখানে শাসক না, প্রজাপালক। প্রজা মানে কেবল মানুষ না, রাজার এলাকায় বাড়তে থাকা প্রতিটি প্রাণ রাজার অনুগত, রাজাও তাদের পালনে নিবেদিত প্রাণ। অন্তত গল্পগাথা তাই বলে। সেই রাজাদের মধ্যেই কৃষ্ণের ছাতা বিষয়ক একটি ঘটনার উল্লেখ মেলে।

কাহিনি বলে, কৃষ্ণ যখন প্রথম গরু চড়াতে যান, খালি পায়ে যান। যশোদা এসে কৃষ্ণকে বলেন, জুতো চটি পরেই বেরনো উচিত। জঙ্গলে পাথর আছে, কাঁটা আছে কত কী! সেসব পায়ে ফুটলে তো কেলেঙ্কারি! কৃষ্ণ নাকি বলেন, জুতো তো পরতে পারবেন না। যাচ্ছেন গরু চড়াতে, সব গরু খালি পায়ে ঘুরবে আর তিনি জুতো পরবেন, এ কেমন দ্বিচারিত! সব গরুর জন্য জুতোর ব্যবস্থা হলে তিনি পরবেন। যশোদাদের ৯০০,০০০ গরু! প্রত্যেকের চারটে করে পা! এত জুতো কী সম্ভব নাকি! জুতোর ব্যাপারটা ছেড়ে দিয়ে ছাতা নিয়ে পড়লেন যশোদা। রোদে গরমে জলে ছেলে গরু চড়াবে, মাথাটা অন্তত ঢাকা থাকলে ক্ষতি নেই। কিন্তু আবার কৃষ্ণ বলে বসলেম ওই ৯০০,০০০ গরুর জন্য ছাতা লাগবে। শুধু ছাতা নিলেই হবে না। গরু তো আর নিজের মাথায় ছাতা ধরে ঘাস খাবে না, তাহলে সক্কলের মাথায় ছাতা ধরার জন্য লোক চাই। কৃষ্ণের যুক্তির কাছে হার মানলেন যশোদা। কিন্তু একটা প্রশ্ন রয়েই গেল। গরুর মাথায় ছাতা ধরতে হবে কেন বোঝা গেল, গরু বেচারার চারখানিই পা। এক পায়ে কায়দা করে ছাতা ধরতে গেলে তিন পায়ে যে ব্যালেন্সের খেলা খেলতে হবে তা গরুর বিবর্তনের ইতিহাসে নেই। কিন্তু মানুষ তো সবল, দুই হাত দুই পায়ে সে বিশ্বভ্রমণ করে ফেলে। মানুষের মাথায় অন্য কেউ ছাতা ধরবে কেন? স্পষ্ট উত্তর, বোড়েদের কাজই তাই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Nostalgia of Umbrella: নতুন কেনা তথা আমার শেষ ছাতাটা আমি ক'জনের মাথায় ধরতে পারব?
বোড়ে কখনও লড়ে, অধিকাংশ সময়ই মরে আর বাকি সময় ছাতা ধরে। বোড়েরা দেশকাল ভেদে কখনও কৃষ্ণাঙ্গ, কখনও অন্ত্যজ, কখনও ক্রীতদাস, কখনও সংখ্যালঘু। এই বাংলাতেই গ্রামের বিত্তবান ও ক্ষমতাবানদেরই কেবল ছাতা ব্যবহারের অনুমতি ছিল। জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে ছাতা মাথায় যেতে পারতেন না সাধারণ মানুষও। হিন্দু জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে মুসলিমের ছাতা মাথায় যাওয়া ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ সেই অভিজাতকে অপমান করার সামিল। সময় বদলে বদলে ট্রাডিশন কিন্তু চলিতেছে। শুধু ট্রাডিশনের নকশা বদলেছে। ট্রাডিশন আর প্রযুক্তিগত হয়েছে। ছত্রধরদের জাতপাত এখন বৃহৎ এক মূলগত শ্রেণির মধ্যে এসে পড়েছে। এখন প্রজা বললে গণতন্ত্র রাগ করবে তাই তাঁদের সোহাগ করে সিকিউরিটি গার্ড বলা হয়।

প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত প্রধান, সকলের মাথার উপর ছাতা ধরে থাকেন নিরাপত্তারক্ষীরা। খেয়াল করে দেখলে ছাতা বিষয়ক একটি দুর্দান্ত বিষয় চোখে পড়বে। রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন নিয়ে হাজারও গল্প আছে। সে বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়কদের নিয়ে অমন কতই রটে ও ঘটে। কেউ বলেন পুতিন ব্যাপারটাই নেই আসলে। এখন যাকে দেখা যায় সে পুতিনের 'ডামি'। পুতিন বিদেশ গেলে শৌচাগার সঙ্গে বয়ে নিয়ে যেতে হয়। পুতিনের সুরক্ষার আঁটঘাঁট জানলে শরীর কেঁপে ওঠে, মন হু হু করে! এই পুতিনের দেহরক্ষীরা একটি বিশেষ কালো ছাতা ব্যবহার করেন।
পুতিন চিরাচরিত রাশিয়ানদের মতো শক্তপোক্ত এবং লম্বা নন। তবে ক্ষমতায় তিনি সব উচ্চতা ও বল ছাপিয়ে গিয়েছেন। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির একজন কর্মকর্তা হিসেবে পুতিন ছিলেন চমৎকার এক এজেন্ট। আট রকমের মার্শাল আর্টে পুতিনের মতো পারদর্শী বিশ্বে আর কোনও নেতা নেই। বক্সিং, জুডো এবং কুস্তিতে অত্যন্ত দক্ষ তিনি। ফাইটার জেট, যুদ্ধের ট্যাংক এবং সাবমেরিন চালাতে পারেন। ঘোড়ায় চড়া, ডাইভিং, স্কিইং এবং দৌড় তো আছেই। এহেন 'সুপারম্যান' রাষ্ট্রনেতার নিরাপত্তারক্ষীরা নাকি সেই ছাতাটি কাছছাড়া করেন না। কেন?
পুতিনের দেহরক্ষী ব্যবস্থার মূলত ৪টি স্তর রয়েছে। একেবারে বাইরের স্তরে থাকেন স্নাইপাররা। ছাদ এবং অন্যান্য উচ্চতা থেকে যে কোনও সন্দেহভাজন ব্যক্তির দিকে নিশানা থাকে সর্বক্ষণ। তার ভেতরের স্তরে শক্তিশালী বন্দুকধারী সশস্ত্র দেহরক্ষীরা থাকেন যাদের পেরিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়াই দুঃসাধ্য! দ্বিতীয় স্তরে, সাদা পোশাকে দেহরক্ষীরা থাকেন আর একদম প্রথম স্তরটিতে থাকেন পুতিনের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীরা। এই দেহরক্ষীরা সবসময় হাতে একটি রহস্যময় কালো ছাতা ধরে থাকেন। পুতিনের দেহরক্ষীদের এই ছাতাটি কেবল জল আটকায় না, গুলিও আটকায়! বুলেটপ্রুফ ছাতা! এই ছাতাটি কেভলার দিয়ে তৈরি। কেভলার তাপ-প্রতিরোধী শক্তিশালী সিন্থেটিক ফাইবার উপাদান। মূলত এই উপাদান সামরিক সরঞ্জাম বা সৈন্যদের বর্ম তৈরিতেই ব্যবহৃত হয়। কেভলারের শক্তি ইস্পাতের পাঁচগুণ, কিন্তু এর ঘনত্ব ইস্পাতের এক-পঞ্চমাংশ। এছাড়াও, এই ছাতাটি থেকে কাঁদানে গ্যাসও ছোঁড়া যায়।
মানে ছত্রধরদের পদোন্নতি হয়েছে। শুধু ছাতা ধরলেই দায়িত্ব খালাস না। ওই বুলেটপ্রুফ ছাতা কীভাবে কাজ করে, কোন সুইচ টিপলেই ব্রহ্মাণ্ড অন্ধকার আর কোনও বোতামে দেশনায়কের কেশাগ্র অবধি চক্রব্যূহে ঢাকা- সব জানতে হয়। ছত্রধররা শুধুই অন্ত্যজ নন, ছত্রধররা এখন কর্পোরেট। নরেন্দ্র মোদির বিশাল নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা স্যুট বুট পরিহিত কর্মীরা বন্দুক চালান, ছাতাও ধরেন। ধরতেই হয়। ভারতবর্ষ তো কোন ছাড়, সারা বিশ্বই জানে রাজার প্রাণের দাম বেশি। গণতন্ত্রের ছানাপোনারা নয়, বরং মূল মৎসটিরই বাজারে কদর বেশি। শুধু ছাতা ধরতে গেলে ইদানীং পড়াশোনা করে ধরতে হয়। কোন বোতাম, কোন শত্রু, মাপ করে খাপ খুলতে হয়। বাকিটা একই। যাদবপুর এইট বি-র মোড়ে ছাতা মাথায় লেনিন এসব দেখেন। ভোট আসে, দেওয়াল লিখন পেরোয়। ছাতা নড়ে না। ছত্রতলদেশে মুখগুলি পালটে পালটে যায়।






