ছাতার প্রাণ আছে!
Nostalgia of Umbrella: নতুন কেনা তথা আমার শেষ ছাতাটা আমি ক'জনের মাথায় ধরতে পারব?

ছাতার প্রাণ আছে!
জগদীশ বসু বলেননি। কিন্তু এ কথা মিথ্যে নয়। গাছের পরে, ছাতাই এমন কোনও 'বস্তু' যার প্রাণ থাকার সম্ভবনা সবচেয়ে বেশি। প্রমাণের অপেক্ষা না রেখে মানুষের যে সমর্পণ ও নির্ভরতা তা প্রমাণ করে, আর যাই হোক ছাতা জড় পদার্থ নয়। বরং ছাতা পরমাশ্রয়। চরম নির্ভরতা। ব্যক্তিত্ব।
ছাতার মতো এক অঙ্গে এত রূপ মানুষও ধারণ করতে পারে না। ছাতাকে আশ্রয় ভাবে লোকসকল। আশ্রয় দেওয়ার যোগ্য মানুষকে সে বলে- ছাতা। কোনও কোনও ছাতা দেখে মানুষ অস্ফুটে বলে ওঠে, রাজকীয়! কোনও ছাতা আবার ছাপে ছবিতে যেন গরিব স্কুল মাস্টার। ছাতার মতো বহুবর্ণের অস্তিত্ব জগতেই আর নেই। এমনকী ছাতার ব্যক্তিত্বই ছায়া ফেলে মানুষের গায়ে। আমরা যখন বলি, ছাতার মতো মানুষ, বোঝাতে চাই শালপ্রাংশু কাউকে, যিনি নীরবে সইছেন, বইছেন নানা দায়। আবার যেই কাউকে বলব ছাতাধরা লোক, ওমনি স্পষ্ট হবে তার দাস্যভাব, ভিখিরিমাফিক নিকিরিপনা। বাংলা ভাষায় এত ব্যপ্তি খুব কম শব্দেই আছে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
History of the Umbrella: বর্ষে বর্ষে যুগে যুগে এই ছাতার প্রয়োজনীয়তা হাড়ে হাড়ে বুঝেছে মানুষ। রোদ বৃষ্টিতে মাথা ঢাকা তো আছেই। তবে ছাতার কাজ কি শুধু তাতেই সীমিত নাকি!
শেয়ার মার্কেটে একটা চালু শব্দ- ফেসভ্যালু। প্রতিটি শেয়ারের নিজস্ব স্বতন্ত্র মূল্যকেই ফেসভ্যালু বলে। সংস্থা ছোট হোক বা বড়, তার শেয়ারের স্বতন্ত্র ফেসভ্যালু থাকে। ছাতারও এমন। নিজস্ব ফেসভ্যালু আছে। মানুষ সেসব বুঝেই ছাতা কিনে বাড়ি ফেরে। বাড়িতে একাধিক ছাতা থাকলে, কারও গায়ে অদৃশ্য মেয়েলি ছাপ থাকে, কেউ হয় সাধারণী-সামঞ্জস্যা। বাড়িতে যেমন দু'একজন অদরকারি মানুষ থাকে, যে ভাত ফেলে উঠে যায়, অভিমানে কাঁটাতার পেরোতে চায়, কিছু কিছু ছাতাও তেমন, এহাত বেহাত হয়ে কোথায় যে চলে যায়, আর ফিরে পাওয়া যায় না তাকে। উদাস বিকেলে, বর্ষার সন্ধেয় মনে পড়ে, সে ছিল, সে আজ নিরুদ্দেশ।
আমি আমার ছাতাটা হারিয়ে ফেলেছি। দর্শনের গুরুতর দরজা এই বাক্য। কেন? নীৎসের পাণ্ডুলিপি থেকে এই বাক্য তুলে এনে বিস্মরণের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন দেরিদা। নীৎসে দেখান বিস্মরণ ব্যতীত কোনও সুখ, কোনও বর্তমান, কোনও আশার অস্তিত্ব নেই। প্রমাণ ওই ছাতায়। ছাতাটা কে ভুলে গেছিল? আমি। অর্থাৎ এই বিস্মরণ প্রমাণ করে আমার অস্তিত্ব। এই মর পৃথিবীতে থাকার ইতিহাস- এই অনৈতিহাসিক ঘটনাও। আমি কী ভুলে গেছিলাম, ছাতাটা। তুচ্ছ জিনিস। এমনিতে মনে পড়বে না। কিন্তু বৃষ্টি নামলেই অদরকার, অপ্রয়োজনের পাহাড় ঠেলে উঠে আসবে। অদরকার, অপ্রয়োজন যে আপেক্ষিক আড়াল, প্রকৃত দরকারি মাত্রই যে প্রকট নয়, বরং সময়ে সময়ে অদরকারিই হয়ে উঠতে পারে হাতের পাঁচ, প্রমাণ মেলে ছাতায়।
ছাতা দিয়ে মানুষ চেনা যায়। গোয়েন্দার আতসকাচের মতোই কাজ করে ছাতা। বাড়ির বয়স্ক লোকেরা ছাতাকে রাতে যত্নে। কিছুতেই কাছছাড়া করে না। একে তারা বলে কাণ্ডজ্ঞান বা দায়িত্বজ্ঞান। ছাতা গোঁফের মতো অপরিহার্য, ছাতাতেই মন চেনা যায়। ছাতা মানুষের পরীক্ষা নেয়। সামান্য ছাতা, প্রতিবার তাকে খুঁজে পাওয়া-না পাওয়ার প্রশ্নে সুতোয় ঝোলে মানুষের অস্তিত্ব। প্রতিবার যে ছাতা হারায়, মানুষ ধরে নেয় তার দ্বারা আর কিছুই হবে না। ছাতা যেন ভাগ্যনিয়ন্তা। মানুষের থেকেও বড় তার থাকা না থাকা! এসব জেনেই কিছু লোক ছাতাটি কাছছাড়া করে না। সংসারে তার দায়িত্ববোধের জয়জয়কার হয়। কিছু লোক আবার ছাতা সামলাতে অপারগ। সমাজ তার পারার সীমানা দেগে দেয় স্রেফ ওই ছাতাটুকুর জন্য। ছাতা দেখতে নিস্পৃহ, আদতে বিষফল।
আমার যাবতীয় ছাতা আমায় বাবা কিনে দিয়েছে। আসলে ছাতা কেনার ছুতোয় তিনি চেয়েছেন, ছাতা রাখতে শিখি আমি। একটি ছাতাও রাখতে পারিনি আমি। হারিয়ে ফেলেছি। কোথায় যে হারিয়ে ফেলেছি! খুঁজতে চেষ্টা করেছি দু'একবার। পাইনি। এভাবেই সরে সরে গেছে কৈশোর, প্রেম।
আমি বুঝেছি, আমার নিয়তি বৃষ্টিভেজা। মেনেও নিয়েছি। দিন কয়েক আগের কথা। প্রবল অসুস্থ অবস্থায় বাবা বাড়ি ফিরলেন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে। হাতে আমার জন্য সদ্য কেনা ছাতা। ছাতা কেন? বাবা আমার ছাতার মতো। আমার মাথা থেকে কি সেই ছাতা সরে যাচ্ছে ক্রমে? নতুন কেনা তথা আমার শেষ ছাতাটা আমি ক'জনের মাথায় ধরতে পারব? ছাতা আমার প্রশ্নে জড়িয়ে রেখেছে। ছাতার প্রাণ আছে।
















