সন্ধেবেলায় ধোঁয়া ওঠা কাপে চুমুক || কীভাবে এই পানীয় এসেছিল ভারতে?

 

লেক-মার্কেট মোড়ে ছোট্ট দোকান, নাম ‘প্রেমাভিলাস’। ইডলি-দোসার মতো হরেক কিসিমের দক্ষিণী খাবারদাবারের সঙ্গে সেখানে মিলবে কড়া স্বাদের ফিলটার্ড কফি। এই দৌড়ে বেড়ানোর যুগেও এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা শুধুমাত্র এককাপ কফি নিয়ে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন। দক্ষিণ কলকাতার অলিতে-গলিতে এমন কফির সন্ধান আরও পাওয়া যাবে। শরৎ বোস রোডের ‘উদিপি ক্যাফেটেরিয়া’-র কথাই ধরা যাক। অনেকেই সেখানে সান্ধ্যকালীন আহারের পর এক কাপ কফি না পান করে ঠিক সন্তুষ্ট হন না। আর হালে কাফে সংস্কৃতিতে তো রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কফি। কলকাতাবাসীর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কফি। এই দেশে তার আমদানির ইতিহাসটাও বড় অদ্ভুত। প্রায় চার শতাব্দী আগে ইয়েমেন থেকে ভারতে এসেছিল সে। কালে কালে সে পাকাপাকিভাবে ভারতের বাসিন্দা হয়ে গেল।

 

কীভাবে কফি এল এ দেশে?

সপ্তদশ শতাব্দীর কথা। বাবা বুদান নামে এক ভারতীয় হজ করতে পাড়ি দিলেন মক্কার উদ্দেশে। ভারত থেকে মক্কা যেতে তখন বেশ কিছুদিন সময় লাগত। বাবা বুদান হজ সেরে দেশে ফেরার জন্য ইয়েমেনের রাস্তা ধরলেন। সেখানেই ‘কফি’ নামক এক পানীয়র সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় ঘটল। এই জিনিসের স্বাদ তাঁর কাছে  একেবারেই নতুন। কফি পান করে দারুণ আনন্দ পেলেন বুদান এবং ঠিক করলেন এর কিছু বীজ তিনি ভারতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেখানেই বিপত্তি ঘটল। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সেসময় কফির বীজ নিয়ে যাওয়া আইনত নিষিদ্ধ ছিল। বুদান দেখলেন, সোজা পথে হবে না। অতএব, উপায়ান্তর না দেখে তিনি সেখান থেকে বেশ কিছু কফির বীজ লুকিয়ে ভারতে নিয়ে এলেন। এখান থেকেই ভারতে কফির যাত্রাপথ শুরু, এমনটাই মনে করেন অনেকে।  

ভারতে ফিরে কর্নাটকের চন্দ্রগিরি পাহাড়ে বাবা বুদান কফির বীজগুলো রোপণ করলেন। এরপর ভারতে কফি চাষ শুরু হল ডাচদের হাত ধরে। তবে, প্রধানত ইংরেজদের আগমনের ফলেই পুরোদমে তার প্রসার ঘটে। ভারতে সেসময় মূলত ‘আরাবিকা’ নামে এক ধরনের কফির চাষ হত। কালক্রমে কফিচাষীরা ঝুঁকলেন ‘রোবাস্টা’-র দিকে। আরাবিকার পাশাপাশি ভারতে রোবাস্টার চাষও আরম্ভ হল। এভাবেই কেটে গেল প্রায় তিন শতাব্দী। তারপর ১৯০৭ সালে তৈরি হল ‘ইন্ডিয়ান কফি বোর্ড’ । শতাব্দী পেরিয়ে এর অস্তিত্ব আজও  রয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান কফি বোর্ড’-এর প্রধান কাজ গবেষণার মধ্য দিয়ে ভারতে কফির উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত মানের করে তোলা। এছাড়াও সংস্থার পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র চাষিদের নানা ধরনের সহায়তা করা হয়। সময় সময় তাঁদের উদ্বৃত্ত কফি কিনেও নেয় ‘ইন্ডিয়ান কফি বোর্ড’।

আরও পড়ুন: আর দার্জিলিং-গ্যাংটক নয়, গরমের ছুটি কাটান কাঞ্চনজঙ্ঘার কোলে এই গ্রামে

কী ধরনের কফির চাষ করা হয় ভারতে?

আরাবিকা: পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় ‘কফিয়া আরাবিকা’ নামক এক ধরনের গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই গাছের চারা থেকেই তৈরি হয় আরাবিকা কফি। এই বিশেষ প্রজাতির কফির উৎপাদনের হার পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। সমীক্ষার মাধ্যমে জানা গেছে, সারা পৃথিবীতে ইথিওপিয়া থেকে প্রায় ষাট শতাংশ আরাবিকা কফির বীজ উৎপাদন করা হয়। জানা যায়,  সপ্তম শতাব্দীতে ইথিওপিয়া থেকে আরব দেশে পাঠানো হত এই কফির বীজ। সেখান থেকেই তার নাম হয় ‘আরাবিকা কফি’। ইথিওপিয়ার ওরোমো প্রজাতির মানুষজন ঘুম তাড়ানোর জন্য চর্বির সঙ্গে আরাবিকার বীজ মিশিয়ে খেতেন। কিন্তু আরব দেশে আসার পর আরাবিকা পুরোদস্তুর কফির চেহারা পেল। বস্তুত, আরবরাই প্রথম ‘কফিয়া আরাবিকা’-র বীজ থেকে কফি বানানো শুরু করেন। স্বাদের দিক দিয়ে আরাবিকা কফি কিছুটা মিষ্টি। কফি বিশেষজ্ঞদের মতে, আরাবিকা কফিতে ক্যারামেল, বাদাম এবং চকোলেটের স্বাদও পাওয়া যায়।

রোবাস্টা: অষ্টাদশ শতাব্দীতে পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকায় জন্ম হয় রোবাস্টা কফির। ‘কফিয়া ক্যানাফোরা’ নামক এক গাছের বীজ থেকে তৈরি হয় এই কফি। সামগ্রিকভাবে রোবাস্টার উৎপাদনের হার আরাবিকার থেকে প্রায় বিশ শতাংশ কম। জানা যাচ্ছে, আবিশ্ব মাত্র চল্লিশ শতাংশ রোবাস্টা কফি উৎপাদন করা হয়। এর অন্যতম কারণ সম্ভবত রোবাস্টার তিতকুটে স্বাদ। ইতিপূর্বে অনেকেই জানিয়েছেন, রোবাস্টার স্বাদ অনেকটা পোড়া রবারের মতো। সম্ভবত সেই কারণেই আরাবিকার তুলনায় রোবাস্টার দামও অনেক কম। বর্তমানে ভারত ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রোবাস্টার চাষ হয়। এছাড়াও ব্রাজিল, ভিয়েতনাম এবং কঙ্গোর মতো দেশগুলো হল রোবাস্টার অন্যতম উৎপাদক।

কফির কাপে আরাবিকাকে অধিক প্রাধান্য দিলেও বহু কফি বিশেষজ্ঞই মনে করেন, ঠিকমতো বানাতে জানলে রোবাস্টা দিয়ে চমৎকার এসপ্রেসো তৈরি করা যায়। হালে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় যে-সমস্ত কফি শপ তৈরি হয়েছে, তারা অবশ্য সুস্বাদু কফি তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণত আরাবিকাই ব্যবহার করে। স্বাদের দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে অনেকেই হয়তো আরাবিকার তুলনায় রোবাস্টাকে কম নম্বর দেবেন। তবু তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ার দরুন আরাবিকার সঙ্গে সঙ্গে সেও ভারতের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। 

 

More Articles

;