সন্ধেবেলায় ধোঁয়া ওঠা কাপে চুমুক || কীভাবে এই পানীয় এসেছিল ভারতে?

rudranjan
৩ মিনিট
সন্ধেবেলায় ধোঁয়া ওঠা কাপে চুমুক || কীভাবে এই পানীয় এসেছিল ভারতে?

লেক-মার্কেট মোড়ে ছোট্ট দোকান, নাম ‘প্রেমাভিলাস’। ইডলি-দোসার মতো হরেক কিসিমের দক্ষিণী খাবারদাবারের সঙ্গে সেখানে মিলবে কড়া স্বাদের ফিলটার্ড কফি। এই দৌড়ে বেড়ানোর যুগেও এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা শুধুমাত্র এককাপ কফি নিয়ে সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেন। দক্ষিণ কলকাতার অলিতে-গলিতে এমন কফির সন্ধান আরও পাওয়া যাবে। শরৎ বোস রোডের ‘উদিপি ক্যাফেটেরিয়া’-র কথাই ধরা যাক। অনেকেই সেখানে সান্ধ্যকালীন আহারের পর এক কাপ কফি না পান করে ঠিক সন্তুষ্ট হন না। আর হালে কাফে সংস্কৃতিতে তো রীতিমতো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে কফি। কলকাতাবাসীর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কফি। এই দেশে তার আমদানির ইতিহাসটাও বড় অদ্ভুত। প্রায় চার শতাব্দী আগে ইয়েমেন থেকে ভারতে এসেছিল সে। কালে কালে সে পাকাপাকিভাবে ভারতের বাসিন্দা হয়ে গেল।

কীভাবে কফি এল এ দেশে?

সপ্তদশ শতাব্দীর কথা। বাবা বুদান নামে এক ভারতীয় হজ করতে পাড়ি দিলেন মক্কার উদ্দেশে। ভারত থেকে মক্কা যেতে তখন বেশ কিছুদিন সময় লাগত। বাবা বুদান হজ সেরে দেশে ফেরার জন্য ইয়েমেনের রাস্তা ধরলেন। সেখানেই ‘কফি’ নামক এক পানীয়র সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় ঘটল। এই জিনিসের স্বাদ তাঁর কাছে একেবারেই নতুন। কফি পান করে দারুণ আনন্দ পেলেন বুদান এবং ঠিক করলেন এর কিছু বীজ তিনি ভারতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সেখানেই বিপত্তি ঘটল। মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সেসময় কফির বীজ নিয়ে যাওয়া আইনত নিষিদ্ধ ছিল। বুদান দেখলেন, সোজা পথে হবে না। অতএব, উপায়ান্তর না দেখে তিনি সেখান থেকে বেশ কিছু কফির বীজ লুকিয়ে ভারতে নিয়ে এলেন। এখান থেকেই ভারতে কফির যাত্রাপথ শুরু, এমনটাই মনে করেন অনেকে।

ভারতে ফিরে কর্নাটকের চন্দ্রগিরি পাহাড়ে বাবা বুদান কফির বীজগুলো রোপণ করলেন। এরপর ভারতে কফি চাষ শুরু হল ডাচদের হাত ধরে। তবে, প্রধানত ইংরেজদের আগমনের ফলেই পুরোদমে তার প্রসার ঘটে। ভারতে সেসময় মূলত ‘আরাবিকা’ নামে এক ধরনের কফির চাষ হত। কালক্রমে কফিচাষীরা ঝুঁকলেন ‘রোবাস্টা’-র দিকে। আরাবিকার পাশাপাশি ভারতে রোবাস্টার চাষও আরম্ভ হল। এভাবেই কেটে গেল প্রায় তিন শতাব্দী। তারপর ১৯০৭ সালে তৈরি হল ‘ইন্ডিয়ান কফি বোর্ড’ । শতাব্দী পেরিয়ে এর অস্তিত্ব আজও রয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান কফি বোর্ড’-এর প্রধান কাজ গবেষণার মধ্য দিয়ে ভারতে কফির উৎপাদন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত মানের করে তোলা। এছাড়াও সংস্থার পক্ষ থেকে ক্ষুদ্র চাষিদের নানা ধরনের সহায়তা করা হয়। সময় সময় তাঁদের উদ্বৃত্ত কফি কিনেও নেয় ‘ইন্ডিয়ান কফি বোর্ড’।কী ধরনের কফির চাষ করা হয় ভারতে?

আরাবিকা: পূর্ব আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় ‘কফিয়া আরাবিকা’ নামক এক ধরনের গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই গাছের চারা থেকেই তৈরি হয় আরাবিকা কফি। এই বিশেষ প্রজাতির কফির উৎপাদনের হার পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি। সমীক্ষার মাধ্যমে জানা গেছে, সারা পৃথিবীতে ইথিওপিয়া থেকে প্রায় ষাট শতাংশ আরাবিকা কফির বীজ উৎপাদন করা হয়। জানা যায়, সপ্তম শতাব্দীতে ইথিওপিয়া থেকে আরব দেশে পাঠানো হত এই কফির বীজ। সেখান থেকেই তার নাম হয় ‘আরাবিকা কফি’। ইথিওপিয়ার ওরোমো প্রজাতির মানুষজন ঘুম তাড়ানোর জন্য চর্বির সঙ্গে আরাবিকার বীজ মিশিয়ে খেতেন। কিন্তু আরব দেশে আসার পর আরাবিকা পুরোদস্তুর কফির চেহারা পেল। বস্তুত, আরবরাই প্রথম ‘কফিয়া আরাবিকা’-র বীজ থেকে কফি বানানো শুরু করেন। স্বাদের দিক দিয়ে আরাবিকা কফি কিছুটা মিষ্টি। কফি বিশেষজ্ঞদের মতে, আরাবিকা কফিতে ক্যারামেল, বাদাম এবং চকোলেটের স্বাদও পাওয়া যায়।

রোবাস্টা: অষ্টাদশ শতাব্দীতে পশ্চিম এবং মধ্য আফ্রিকায় জন্ম হয় রোবাস্টা কফির। ‘কফিয়া ক্যানাফোরা’ নামক এক গাছের বীজ থেকে তৈরি হয় এই কফি। সামগ্রিকভাবে রোবাস্টার উৎপাদনের হার আরাবিকার থেকে প্রায় বিশ শতাংশ কম। জানা যাচ্ছে, আবিশ্ব মাত্র চল্লিশ শতাংশ রোবাস্টা কফি উৎপাদন করা হয়। এর অন্যতম কারণ সম্ভবত রোবাস্টার তিতকুটে স্বাদ। ইতিপূর্বে অনেকেই জানিয়েছেন, রোবাস্টার স্বাদ অনেকটা পোড়া রবারের মতো। সম্ভবত সেই কারণেই আরাবিকার তুলনায় রোবাস্টার দামও অনেক কম। বর্তমানে ভারত ছাড়াও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রোবাস্টার চাষ হয়। এছাড়াও ব্রাজিল, ভিয়েতনাম এবং কঙ্গোর মতো দেশগুলো হল রোবাস্টার অন্যতম উৎপাদক।

কফির কাপে আরাবিকাকে অধিক প্রাধান্য দিলেও বহু কফি বিশেষজ্ঞই মনে করেন, ঠিকমতো বানাতে জানলে রোবাস্টা দিয়ে চমৎকার এসপ্রেসো তৈরি করা যায়। হালে কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় যে-সমস্ত কফি শপ তৈরি হয়েছে, তারা অবশ্য সুস্বাদু কফি তৈরির ক্ষেত্রে সাধারণত আরাবিকাই ব্যবহার করে। স্বাদের দিক দিয়ে বিচার করতে গেলে অনেকেই হয়তো আরাবিকার তুলনায় রোবাস্টাকে কম নম্বর দেবেন। তবু তুলনামূলকভাবে সস্তা হওয়ার দরুন আরাবিকার সঙ্গে সঙ্গে সেও ভারতের ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।