'কোনও রিস্ক নিতে চাই না', নেতাজির অন্তর্ধানের সেই টানটান কাহিনি আজও রোমাঞ্চ জাগায়

The great escape: কোন রুটে যাওয়া হবে সেটিও নেতাজি ঠিক করে দিলেন। রাতে গাড়ি চলবে তাই সাথে টর্চ নিতে বলে দিলেন।

Tarun Goswami
৪ মিনিট
'কোনও রিস্ক নিতে চাই না', নেতাজির অন্তর্ধানের সেই টানটান কাহিনি আজও রোমাঞ্চ জাগায়

১৬ জানুয়ারি, ১৯৪১ সাল। গভীর রাতে গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড দিয়ে একটি অতি সাদামাটা দেখতে গাড়ি ছুটে চলেছে। গাড়িতে দু’জন যাত্রী। একজনের একমুখ দাড়ি, মাথায় ফেজ টুপি, চোখে চশমা। তিনি গাড়ির পিছনের সিটে বসে আছেন; যিনি গাড়ি চালাচ্ছেন তার অল্প বয়স। সারারাত গাড়ি চলেছে। হাওড়া, উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর, ব্যান্ডেল, বর্ধমান হয়ে গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে বিহারের দিকে। ভোরের আলো ফুটছে, কিছু মানুষকে রাস্তায় দেখা যাচ্ছে, এমন সময় হল এক বিপত্তি। নবীন চালকটি ফাঁকা রাস্তা দেখে মনের আনন্দে গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেওয়াতে হল সমস্যা। লেভেল ক্রসিংয়ের গেটটি নেমে এল আর গাড়িটি ব্রেক কষতেই সশব্দে থেমে গেল। চালকটি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। কিছুতেই আর স্টার্ট নিচ্ছে না গাড়ি। ঘষ ঘষ করে ট্রেনটা চলে যেতেই লেভেল ক্রসিং এর গেট উঠে গেল। চালকটি নানা কসরত করছে ইঞ্জিনটিকে চালু করার। ততক্ষণ পিছনের সিটে বসা ভদ্রলোকটি কোনও কথা বলেননি। এবার বিরক্ত হয়ে বললেন, “কী করছ? জানো না গাড়ির এসি পাম্পটি পিছনে। তেল উঠছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর ঠিক স্টার্ট নেবে”। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল চালকের। গাড়ি স্টার্ট নিল এবং চলতে শুরু করল। ভদ্রলোক এবার নির্দেশ দেবার সুরে বললেন, “একদম জোরে যাবে না। অ্যাভারেজ স্পিড মেইন্টেন করো, তাহলে দেখবে ঠিক পৌঁছে যাবে। জানো তো, আন্তর্জাতিক স্তরে গাড়ি চালানোর নিয়ম হল প্রতি মিনিটে এক মাইল”। চালকটি জীবনে প্রথম এই কথা শুনল। বাধ্য ছেলের মতো স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ৪০ মাইল বেগে গাড়ি চালাতে লাগল।

গাড়ির যাত্রী দু’জন সম্পর্কে কাকা ভাইপো। যিনি চালক তিনি তখন কলকাতা মেডিকেল কলেজের ছাত্র। নাম শিশির বসু আর পিছনের সিটে বসা দাড়িওয়ালা মানুষটির নাম সুভাষচন্দ্র বসু ওরফে জিয়াউদ্দিন।

সুভাষচন্দ্র সম্বন্ধে মানুষের উৎসাহের শেষ নেই। সত্যিই কি তাইহোকুতে বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল? আচ্ছা নৈমিষারণ্যের ভগবানজী কি নেতাজি? এখনও নাকি তিনি জীবিতই আছেন – এসব প্রশ্ন অহরহ উঠে আসে আর সুভাষচন্দ্রের জন্মদিনের আগে আরও বেশি করে উঠে আসে। ২০২৬ নেতাজির ১২৯ তম জন্মবার্ষিকী তাই সন্ন্যাসী দেশনায়ককে নিয়ে মানুষের মনে নানা অনুচ্চারিত জিজ্ঞাসা। নেতাজি যোদ্ধা, নেতাজি বিদ্রোহী, তিনি অসম সাহসী মানুষ। স্বাধীনতার ৭৮ বছর পরেও কত ছেলের নাম মা-বাবা সুভাষ রাখেন। ভাবেন এই আমার ছেলেটি সুভাষচন্দ্রের মতো দেশের মুখ উজ্জ্বল করবে।

নেতাজি ছিলেন একজন দক্ষ চালক ও অসাধারণ নেভিগেটর। একটা সময়ে বুঝতে পারলেন দেশ স্বাধীন করতে হলে ভারতবর্ষ ত্যাগ করতে হবে। এলগিন রোডের বাড়ির চারপাশে অসংখ্য সাদা পোশাকের পুলিশ। তাদের চোখে ধুলো দিয়ে ১৬ জানুয়ারি, ১৯৪১ কলকাতা ছেড়েছিলেন নেতাজি। মহানিষ্ক্রমণ। এ যাত্রার খুঁটিনাটি সব তিনি প্ল্যান করেছিলেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন ভাইপো ভাইঝি-কে।

প্রথমে আসা যাক গাড়ি নির্বাচনে। শরৎচন্দ্র বসুর দু’টি গাড়ি ছিল। একটি ডাউন আমেরিকান গাড়ি স্টুডিবেকার প্রেসিডেন্ট, অন্যটি নাম গোত্রহীন গাড়ি, জার্মানিতে তৈরি ওয়ান্ডারার। স্টুডিবেকার রাজকীয় গাড়ি। যেমন বিশাল তার চেহারা, তেমনই আরামদায়ক। চড়ে-চালিয়ে এই গাড়িতে আনন্দ খুব বেশি। মাটি কামড়ে চলে। লম্বা সফরে এই গাড়িটির জুড়ি নেই। ঐতিহ্য এবং পারিবারিক মর্যাদায় গ্রেট স্টুডিবেকার সম্ভ্রম আদায় করে রাস্তার মানুষের। “The car will tell everyone who am I” – এই দর্শনের উপর তৈরি হয়েছিল গাড়িটি।

অন্য দিকে, ওয়ান্ডারার ছা-পোষা জার্মান গাড়ি। তার না আছে কোনও কৌলিন্য না চটকদারী রূপ। চড়েও যে খুব আরাম তাও নয়। বেশিক্ষণ চড়লে কোমরে ব্যাথা হয়। তাই লম্বা সফরে এই গাড়িটি না নেওয়া বাঞ্ছনীয়। নেতাজি ছাড়া অন্য কোনও ব্যক্তি হলে বড় গাড়িটি নিতেন। কিন্তু তিনি নিলেন না কারণ ছোট সাধারণ দেখতে গাড়িকে কেউ রাস্তায় নজর করবে না।

১৯৪০ এর শেষের দিকেই নেতাজি দেশত্যাগের প্ল্যান করেন। একদিন ডেকে ভাইপো শিশিরকে তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান এবং বলেন যেন কোনওভাবে কেউ ঘুণাক্ষরেও যেন কেউ জানতে না পারে কারণ দাদা শরৎচন্দ্রের কাছে এমন কিছু মানুষ কাজ করতেন এবং তারা এতটাই রাজভক্ত যে এই খবর লালবাজারে পৌঁছতে বেশি সময় লাগবে না।

শিশিরকে ডেকে সুভাষচন্দ্রের প্রথম প্রশ্ন ছিল, “গাড়ি তো চালাও, গাড়ির চাকা পালটাতে জানো?” নেতাজির অভিজ্ঞতা, গাড়ির মালিকরা অধিকাংশই গাড়ির চাকা পালটাতে জানে না, এমনকী কোথায় গাড়ির জ্যাক থাকে তাই-ই জানে না। চাকা ফেটে গেলে আগে জ্যাক দিয়ে গাড়িটাকে তুলতে হয় তারপর চাকার বল্টুগুলো খুলতে হয়। শেষে পুরোনো চাকাটা পালটিয়ে গাড়ির স্টেপনি লাগাতে হয়। যারা জানে তাদের পক্ষে কয়েক মিনিটের ব্যাপার কিন্তু না জানলে কালঘাম ছুটে যাবে, কিন্তু চাকা পালটানো যাবে না।

উত্তরে শিশির বলেন, তিনি চাকা পালটাতে দেখেছেন কিন্তু নিজে কখনও পালটাননি। নেতাজি কলকাতা নিজের হাতের তালুর মতো চিনতেন। শিশিরকে বললেন, “তোমাকে চাকা পাল্টাতে শিখতে হবে। তবে তা বাড়িতে শেখা চলবে না। মেডিকেল কলেজ থেকে ফেরার সময় পার্ক সার্কাস ময়দানের সামনেটা দুপুরের দিকে ফাঁকা থাকে। ওখানে কয়েকদিন পর পর চেষ্টা কর। দেখবে চাকা বদল করা জলভাত হয়ে গেছে”। কীভাবে চাকা বদল করা হবে সেই পদ্ধতিটি শিখিয়ে দিলেন। এরপর সারাদিন ধরে প্রতিদিন শিশির চাকা বদলেছেন এবং নেতাজিকে বলতে হতো সময় কতক্ষণ লাগছে। প্রথম দিন আধঘণ্টার বেশি লাগল, আস্তে আস্তে সময় কমে এল এবং দশ মিনিট লাগল শিশিরের চাকা বদলাতে। নেতাজি খুশি হয়ে শিশিরকে বললেন, “কেন তোমাকে চাকা বদল করা শিখতে বললাম জানো? আমি কোনও রিস্ক নিতে চাই না”।

কোন রুটে যাওয়া হবে সেটিও নেতাজি ঠিক করে দিলেন। রাতে গাড়ি চলবে তাই সাথে টর্চ নিতে বলে দিলেন। ২৫ ডিসেম্বর শিশিরকে বললেন, বর্ধমান অবধি গাড়িটা চালিয়ে দেখে নিতে ঠিক আছে কিনা। আর শিশিরের লং ড্রাইভে চালানোর একটি অভিজ্ঞতাও হয়ে যাবে।

১৬ জানুয়ারি রাত ১.৪৫ মিনিটে এলগিন রোডের বাড়ি থেকে ওয়ান্ডারার করে শিশির নেতাজি বেড়িয়ে পড়লেন। বাড়িতে পাহারায় থাকা পুলিশ কর্মীরা ঘুমে অচেতন। রাস্তাতেও কেউ নেই। কলকাতা শহর জানতেই পারল না নেতাজি সকলের অজান্তে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। আর তিনি ফেরেননি।

ওয়ান্ডারার গাড়িটি এখনও নেতাজি ভবনে রাখা আছে। কয়েক বছর আগে বিখ্যাত জার্মান গাড়ির কোম্পানি অডি ওয়ান্ডারারকে সারিয়ে তোলে। নতুন রঙ করা হয়। বিশ্বস্ত বাহন আজও সচল। দেখে মনে হয়, নেতাজি গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেই তাকে নিয়ে আবার ওয়ান্ডারার তার যাত্রা শুরু করবে অজানার উদ্দেশ্যে।

লিখেছেন
Tarun Goswami
Tarun Goswami
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।