রবীন্দ্রনাথের লেখা শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত, স্বীকৃতি পেয়েছিলেন অন্য কেউ? আজও জারি বিতর্ক

রবীন্দ্রনাথ বা সামারাকুন, যেইই শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের রূপকার হোন না কেন, একটা কথা শেষে বলতেই হয়, ২ জনের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা প্রতিষ্ঠান, যার নাম বিশ্বভারতী। একজন এই প্রতিষ্ঠানের রূপকার, অন্যজন এর ছায়ায় লালিত।

tiasa gupta
৪ মিনিট
রবীন্দ্রনাথের লেখা শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত, স্বীকৃতি পেয়েছিলেন অন্য কেউ? আজও জারি বিতর্ক

মা লঙ্কা আমি তোকে প্রণাম করি!

হে মা, তোর সমৃদ্ধি বিপুল,

দয়া আর মমতায় তুই অতুল...

ভালবাসায় পূর্ণ, এক শক্তিশালী রাষ্ট্র,

আমরা সবাই এক হয়ে, আগ বাড়াই।

হে মা আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যা।

অরাজক শ্রীলঙ্কা। উত্তাল সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দ্বীপরাষ্ট্র। অর্থনীতি এই দেশকে পৌঁছে দিয়েছে খাদের কিনারে। সেখান থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজছে কলম্বো। শ্রীলঙ্কা যখন বুকে পাথর বেঁধে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন এই লাইনগুলো তো হতেই পারে জাগরণের মন্ত্র। স্বাধীন শ্রীলঙ্কার নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীত হলো– মা লঙ্কা, আমি তোমাকে প্রণাম করি। গানটির আসল রচয়িতা ও সুরকার কে, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত।

'শ্রীলঙ্কা মাতা’ গানের রচয়িতা সম্পর্কে বিভিন্ন মত আছে। সবচেয়ে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কার খ্যাতিমান সংগীত-ব্যক্তিত্ব আনন্দ সামারকুন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বারা অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হয়ে গানটি লিখেছিলেন। অনেকে বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরো গানটি লেখেন। কেউ কেউ বলেছেন, গানটির সুরকার রবীন্দ্রনাথ এবং রচয়িতা সামারাকুন। রবীন্দ্রনাথ সরাসরি এই গান রচনায় যুক্ত ছিলেন এই ধারণা ভারতীয় ঐতিহাসিক লিপি ঘোষ এবং শ্রীলঙ্কার ঐতিহাসিক Sandagomi Coperahewa অস্বীকার করেছেন। আনন্দ সামারাকুন বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের ছাত্র ছিলেন। শ্রীলঙ্কা ফিরে যাওয়ার পর তিনি মাহিন্দা কলেজে গান শেখাতেন। মাহিন্দা কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রথমে নমো নমো মাতা গানটি পরিবেশন করেন। পরবর্তীতে মিউসেস কলেজ নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গায়ক দল গানটি পরিবেশন করার পর তা শ্রীলঙ্কায় জনপ্রিয় হয়। সেই সময় বেতারে সম্প্রচারিত জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এটি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
গোটা বিশ্ব তাকিয়ে আছে, কোন পথে হাঁটবে এবার শ্রীলঙ্কা?

শ্রীলঙ্কার এই পরিস্থিতির জন্য রাজাপক্ষে সরকারের ভ্রান্ত নীতিকেই দায়ী করা হচ্ছে। বাজেটে ঘাটতি, সর্বনাশা কর নীতি এবং সর্বোপরি কোভিডের প্রকোপে পরিস্থিতি আরও হাতের বাইরে চলে যায়।

১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কা ব্রিটেনের হাত থেকে মুক্তি পায়। স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এই দ্বীপরাষ্ট্র। কিন্তু স্বাধীনতার পরও শ্রীলঙ্কায় ব্রিটেনের জাতীয় সংগীত ব্যবহার করা হতো। ১৯৫০ সালে শ্রীলঙ্কার অর্থমন্ত্রী জে আর জয়বর্ধনে শ্রীলঙ্কা সরকারকে আনন্দ সামারাকুনের অনুবাদকৃত নমো নমো মাতা গানটিকে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত করার আবেদন জানান। তখন শ্রীলঙ্কা সরকার গৃহ ও গ্রামোন্নয়নমন্ত্রী এডুইন বিজয়রত্নর নেতৃত্বে জাতীয় সংগীত প্রণয়ন-সংক্রান্ত একটি কমিট গঠন করে। উক্ত কমিটি অনেকগুলো গান নির্বাচন করে। শেষ পর্যন্ত আনন্দ সামারাকুনের নমো নমো মাতা জাতীয় স‌ংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই কমিটি সামারাকুনের মত নিয়ে গানটির দশম পংক্তিতে কিছু পরিবর্তন ও পরিবর্ধন আনে। ১৯৫১ সালের ২২ নভেম্বর সরকার গানটিকে শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালে এম নলথম্বি গানটি তামিল ভাষায় অনুবাদ করেন। ১৯৫২ সালে শ্রীলঙ্কার প্রথম স্বাধীনতা দিবসে গানটি আনুষ্ঠানিকভাবে গাওয়া হয়।

যাঁরা গানটি রবীন্দ্রনাথের লেখা ও সুর বলে দাবি করেন, তাঁরা বলেছেন, আনন্দ সামারাকুন ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয় পাত্র। ১৯৩৮-এ তিনি গুরুদেবের কাছে তাঁর দেশের জন্য গান লিখে দেওয়ার অনুরোধ করেন। রবীন্দ্রনাথ 'নমো নমো শ্রীলঙ্কা মাতা' গানটি লিখে আনন্দকে দেন। ১৯৪০-এ দেশে ফিরে ১৯৪৬-এ গানটি সিংহলি ভাষায় অনুবাদ করে একটি রেকর্ড বের করেন আনন্দ। একটা মহল থেকে এই নিয়ে ঝড় ওঠে। তাঁরা বলেন, যদি এই কথাগুলো সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে আনন্দ সামারাকুন অসততা তো করেছেনই, এমনকী, মেধাসত্ব আইন লঙ্ঘন করার অপরাধও করেছেন। রবীন্দ্রনাথের গানের অনুবাদটি তাঁর নিজের রচনা বলে চালিয়ে দিয়ে তিনি অন‍্যায়ভাবে জাতীয় সংগীতকার হয়েছেন। তাঁর আত্মহত্যার পিছনে কোনও গ্লানি কাজ করেছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে নানা মহল।

গানটির রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ, এই ধারণার বিপক্ষে যুক্তি দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার ইতিহাসবিদ Sandagomi Coperahewa। তাঁর যুক্তি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সব গান ও কবিতা যেখানে গ্রন্থভুক্ত, সেখানে এই গানের কোনও উল্লেখ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও কখনও এই গানটি তাঁর লেখা বলে দাবি করেননি। অতএব, শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা নয়। এটি তাঁর ছাত্র আনন্দ সামারাকুনের লেখা।

১৯৩০ সালে তরুণ সামারাকুন বিশ্বভারতীতে কলাবিভাগের ছাত্র হিসেবে যোগ দেন। তাড়াতাড়ি তিনি হয়ে ওঠেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয় পাত্র। রবীন্দ্রসংগীতের সুর ও কথা বারবার মুগ্ধ করেছে তাঁকে। তাঁর গানে তাই রবীন্দ্র-প্রভাব দেখা যায়। তাই কি এই গান নিয়ে এত বিতর্ক? সামারাকুন শ্রীলঙ্কার গানের একটা নতুন ঘরানা তৈরি করতে চাইছিলেন। অবশ্যই সেখানে ছিল রবীন্দ্র-চর্চা ও রবীন্দ্রসংগীতের প্রভাব। একটি গানে তিনি দুই তরুণ-তরুণীর মধ্যে সংলাপের ধরনে গান লিখেছিলেন। এই গানটি প্রবল সাফল্য পাওয়ার পর সামারাকুন অসংখ্য গান লেখেন। সংগীতজ্ঞ হিসেবে সাফল্য পান। তাঁর জীবনে সুখদুঃখ হাত ধরাধরি করে এসেছে। ১৯৪৫ সালে সামারাকুনের পাঁচ বছরের ছেলের মৃত্যু হয়। মনের শান্তির জন্য ভারতে চলে আসেন। চিত্রকর হিসেবে নতুনভাবে সম্মান পান। তিনি আবার গানের জগতে ফিরে আসেন ১৯৫১ সালে। আদর্শ শিল্পী ছিলেন তিনি। যন্ত্রণা আর বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি কখনও। শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক আজও চলছে।

আজ গণবিক্ষোভে উত্তাল শ্রীলঙ্কা। অর্থনীতি ধসে পড়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জনসমুদ্র উপচে পড়ছে। সনৎ জয়সূর্যর মতো তারকাও তাতে শামিল হয়েছেন। অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের সঙ্গে কথা চলছে কলম্বোর। এই অবস্থায় এই গানের কথাগুলো কি একটা মৃতপ্রায় দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র হতে পারে না?

রবীন্দ্রনাথ বা সামারাকুন, যেইই শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীতের রূপকার হোন না কেন, একটা কথা শেষে বলতেই হয়, ২ জনের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা প্রতিষ্ঠান, যার নাম বিশ্বভারতী। একজন এই প্রতিষ্ঠানের রূপকার, অন্যজন এর ছায়ায় লালিত।

লিখেছেন
tiasa gupta
tiasa gupta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।