গোটা বিশ্ব তাকিয়ে আছে, কোন পথে হাঁটবে এবার শ্রীলঙ্কা?

শ্রীলঙ্কার এই পরিস্থিতির জন্য রাজাপক্ষে সরকারের ভ্রান্ত নীতিকেই দায়ী করা হচ্ছে। বাজেটে ঘাটতি, সর্বনাশা কর নীতি এবং সর্বোপরি কোভিডের প্রকোপে পরিস্থিতি আরও হাতের বাইরে চলে যায়।

pampii adhikari
৪ মিনিট
গোটা বিশ্ব তাকিয়ে আছে, কোন পথে হাঁটবে এবার শ্রীলঙ্কা?

ছবির মতো সুন্দর সাজানো দেশ শ্রীলঙ্কা। তবে তা ছিল বাইরের আবরণমাত্র। ভেতরে ভেতরে ঘূণ ধরেছিল আগেই। আঙুল ঠেকাতেই ভেঙে পড়ল লঝঝরে কাঠামো। বিগত ৭০ বছরে এমন বিপর্যয় দেখেনি গোটা বিশ্ব। তাই এক নিমেষে ব্যর্থ দেশের তালিকায় ঢুকে পড়ল শ্রীলঙ্কা। অভিভাবক করে জনতা জনার্দন ক্ষমতায় এনেছিলেন যাঁদের, একে একে পিঠটান দিতে শুরু করেছেন সকলে। ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়ে রয়েছেন প্রজারা। ধ্বংসস্তূপকে এখনও আকার দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা। তার মধ্যেও জেগে রয়েছে রাজনীতি। ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার প্রচেষ্টা চলছেই।

হেঁশেলে চাল বাড়ন্ত দেখেই অশনি সংকেত পেয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার মানুষ। মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যবৃদ্ধির বন্ধনীতে ফেলে পরিস্থিতিকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছিল সেদেশের সরকার। ফলে অচিরেই নেমে এসেছিল অন্ধকার। সোনার দরে বিকোতে শুরু করে চাল, ডাল। মহার্ঘ হয়ে ওঠে শিশুকে খাওয়ানোর দুধও। ফলে রাস্তায় নামা ছাড়া উপায় ছিল না সাধারণের। তাতে সাময়িকভাবে ঠেকানো গিয়েছিল বিপর্যয়। সিংহাসনে রদবদল ঘটিয়ে ক্ষোভ সামাল দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে মাত্র, বাদবাকি কিছু যে পাল্টায়নি, বোঝ গেল তিন মাস পরই। ফলে ফের রাস্তায় শ্রীলঙ্কার মানুষ।

গত সপ্তাহ থেকেই শ্রীলঙ্কায় নতুন করে মাথাচাড়া দিতে শুরু করে অশান্তি। পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে রাতারাতি গা ঢাকা দেন দেশের প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে। তাঁর আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, বোঝা গেল রাত কাটতেই। হাজার হাজার মানুষ প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে এসে হাজির হলেন। পুলিশি বাধা কাটিয়ে, ব্যারিকেড ভেঙে ঢুকে পড়লেন ভেতরে। টাকা-পয়সা কিছু ফেলে গিয়েছেন কি না সন্ধান চলল। আগুন ধরানো হলো প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব বাড়িতে। কিন্তু তাতে সমস্যার সমাধান হওয়া নিয়ে সন্ধিহান দেশের একাংশই।

কারণ পদত্যাগ করতে প্রস্তুত বলে ইতিমধ্যেই ঘোষণা করে দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহে। কিন্তু কবে পদত্যাগ করবেন, তা খোলসা করেননি এখনও। বরং জনগণের নিরাপত্তাকে সামনে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন সর্বদলীয় সরকার গড়ার ডাক দিয়েছেন তিনি। সেই মর্মে বৈঠকে বসে দেশের একাধিক দল। তাতে নিমরাজি হয়েছে সবপক্ষই। আরও একদফা আলোচনায় বসার কথা তাদের। রাজাপক্ষে পদত্যাগ করেল কে প্রেসিডেন্ট হবেন, সেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। আর এতেও সিঁদুরে মেঘ দেখছেন অনেকে। রাজনীতির মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষ আগের মতোই দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে থাকবেন বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের।

শ্রীলঙ্কার সংবিধান অনুযায়ী, অস্থির সময় অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রিত্ব যাঁর হাতে থাকবে, তিনিই আপনাআপনি প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হবেন, অন্তত দেশের পার্লামেন্ট নতুন করে ভোট দিয়ে নয়া প্রেসিডেন্ট বেছে না নেওয়া পর্যন্ত। রনিল যদি ইস্তফা না দেন, তিনিই অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হবেন। আর গোতাবায়া এবং রনিল দু’জনেই ইস্তফা দিলে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ চালাবেন পার্লামেন্টের স্পিকার মহিন্দা ইয়াপা। দলের অনুরোধে তিনি পদত্যাগ করতে প্রস্তুত বলে ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন রনিল। কিন্তু তিনি পদত্যাগ না করলে, কী হবে, তা ভেবেই আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ। তাঁদের আশঙ্কা, ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে যে কোনও মুহূর্তে খেলা ঘুরিয়ে দেওয়া হতে পারে। তাই সর্বদলীয় সরকারের ‘ললিপপ’ দেখিয়ে বিক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা চলছে বলে মত গণআন্দোলনের নেতা পিচার ডি’আলমেইডার।

নিমরাজি হলেও, এই সর্বদলীয় সরকার গড়ার প্রস্তাবে আপত্তি রয়েছে বিরোধী শিবিরের অনেকেরই। তাঁদের মতে, এই মুহূর্তে দেশে ২২৫ আসনের পার্লামেন্টে রাজাপক্ষেদের দলই সংখ্যাগরিষ্ঠ। দেশের প্রধান বিরোধী দলের আসন-সংখ্যাই মেরেকেটে ৫০। এমন পরিস্থিতিতে কম সাংসদ রয়েছে, এমন দল থেকে কাউকে অথবা নির্দল কোনও সাংসদকে ক্ষমতায় বসানো হলে তাঁকে কেউ মানবেন না। আবার আদৌ এমন কাউকে ক্ষমতায় বসাতে দেওয়া হবে না, ফলে আগের মতোই মসনদে রাজাপক্ষেদের আধিপত্য কায়েম থাকবে বলে মনে করছেন বিরোধীদের অনেকে। একই সঙ্গে রাজাপক্ষেদের ওপরই যেহেতু বিক্ষুব্ধ দেশের মানুষ, নির্দিষ্ট করে গোতাবায়ার পদত্যাগ দাবি করছেন তাঁরা, সেখানে সর্বদলীয় সরকারে শামিল হয়ে মানুষের বিরাগভাজন হওয়া থেকে পৃথকভাবে জনগণের আস্থা অর্জন করা ঢের ভাল বলে মত বিশেষজ্ঞদের। শুধু তাই নয়, সংকটের পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া না গেলে পূর্বতন রাজাপক্ষে সরকারের ব্যর্থতার দায়ও তাদের ঘাড়ে চাপবে বলেও আশঙ্কা করছে কেউ কেউ।

বিজিত, পরাজিত সব দলকে নিয়ে সর্বদলীয় সরকার গড়ার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের রায়ে যে দল ক্ষমতা দখল করে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে তাঁরা কতটা সফল, কতটা ব্যর্থ, তার নিরিখে তাদের যোগ্যতা যাচাই করতে পারেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু নির্বাচন ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে যোগ্যতা প্রমাণের দায়বদ্ধতা থাকে না। অর্থনৈতিক সংকট সামাল দিতে আগেও সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন রনিল। সেবারও জল গড়ায়নি।

তবে এই মুহূর্তে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত সপ্তাহেই নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে শ্রীলঙ্কা সরকার। আর তারপরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাস, লরি, ট্রেনে চেপে রাজধানী কলম্বোয় এসে পৌঁছন লক্ষ লক্ষ মানুষ। প্রেসিডেন্টের বাসভবনের দখল নিয়েছেন তাঁরা। জ্বালিয়ে দিয়েছেন রনিলের নিজস্ব বাড়ি। এই মুহূর্তে দেশের ২ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ চরম অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছেন। খাদ্যস‌ংকট দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজকোষে সঞ্চিত বিদেশি মুদ্রা শূন্যে এসে ঠেকেছে। ফলে নিত্য পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল শ্রীলঙ্কা কোনও দেশ থেকে কিছু করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডারের সঙ্গে এখনও আলোচনা চালিয়ে চলেছে কলম্বো। তাদের কাছ থেকে ৪০০ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে শ্রীলঙ্কা, যাতে দেশে স‌ংকট কিছুটা হলেও সামাল দেওয়া যায়। তাই যত শীঘ্র সম্ভব সমাধান খুঁজে বের করা প্রয়োজন বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

শ্রীলঙ্কার এই পরিস্থিতির জন্য রাজাপক্ষে সরকারের ভ্রান্ত নীতিকেই দায়ী করা হচ্ছে। বাজেটে ঘাটতি, সর্বনাশা কর নীতি এবং সর্বোপরি কোভিডের প্রকোপে পরিস্থিতি আরও হাতের বাইরে চলে যায়। ছাঁটা চালের দামই ২৫০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। শিশুর দুধের দাম বেড়ে হয় ১৯০০ টাকা প্রতি কেজিতে। তেলের দাম পৌঁছয় ৮৫০ টাকা। তাতেই বিক্ষোভে নেমেছেন মানুষ।

লিখেছেন
pampii adhikari
pampii adhikari
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

আবের কাওয়াস: প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান মুসলিম মহিলা নিউ ইয়র্কের সিনেটে

Aber Kawas: নিউ ইয়র্কের ১২ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়লেন আবের কাওয়াস। নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভায় তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান এবং প্রথম হিজাব পরিহিত মুসলিম মহিলা প্রতিনিধি।

প্রতিবেশীর ধর্ম দেখব না! গির্জায় হামলায় যা বলছে বাসন্তী

Basanti church: গির্জার সদস্য প্রদীপ মণ্ডল ইনস্ক্রিপ্টকে জানিয়েছেন, শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ চার্চ অফ নর্থ ইন্ডিয়ার (CNI) বিশপ সুব্রত চক্রবর্তী পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি গির্জার যাজকদের নিয়ে শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা করে নারায়ণতলার নবনির্মিত গির্জায় পৌঁছন। তাঁদের স্বাগত জানাতে গির্জার ভিতরে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রার্থনা শুরুর ঠিক আগে ৩০-৩৫ জনের একটি দল জোর করে গির্জায় ঢুকে পড়ে বলে দাবি তাঁর।

পাঁচ খুনের 'বদলা'? এবার গুয়াহাটিতে এনকাউন্টার পুলিশের

Guwahati Encounter: গুয়াহাটিতে হোটেলে ঢুকে পাঁচ জনকে খুনের অভিযোগে ধৃত ঘনকান্ত গগৈ পুলিশের গুলিতে নিহত। পুলিশের দাবি, হেফাজত থেকে পালিয়ে সার্ভিস রিভলভার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে। একই সময়ে মধ্যপ্রদেশের দেওয়াস ও ভোপালে পৃথক এনকাউন্টারে তিন অভিযুক্ত গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কয়েক দিন আগেই বাংলায় গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছিল।

আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর, ট্রাম্পের ইসলামবিদ্বেষী প্রচারকে হারিয়ে ইতিহাস গড়লেন আবদুল এল-সায়েদ

Abdul El-Sayed: নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দলের একাধিক নেতা এল-সায়েদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী প্রচার চালিয়েছিলেন। তাঁর ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে তাঁকে আমেরিকার নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল।

কেন মিডটার্ম নির্বাচনে ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

US Midterm Elections 2026: মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা। কেন ট্রাম্পের ভরাডুবি? এরপর কোন পথে ওয়াশিংটন?

মিডটার্ম নির্বাচন: সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেতে চলেছে ট্রাম্পের বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা

US Midterm Elections 2026: ভোটের লড়াইয়ে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা।

রামলীলার পর কী? কী করবেন বিরোধীরা?

INDIA bloc Unity Under strain: ‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে ২১ দল একজোট হলেও মঞ্চ শেষেই ভেতরের টানাপোড়েন স্পষ্ট। বাম নেতাদের বক্তৃতায় প্রাধান্য, ‘ফ্যাসিবাদ’ বিরোধী সুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘জাতীয় ভূমিকা’র সতর্কবার্তা। প্রিয়াঙ্কা, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউত বক্তৃতার সুযোগ না পাওয়ায় শরিক-অসন্তোষ।

ট্রাম্পের অভিবাসন নীতিতে বিপাকে ভারতীয়রা, মিডটার্ম নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে?

US Midterm Elections 2026: ২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভোটারদের ৬২% ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। ট্রাম্পের এইচ-১বি ভিসা কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক নীতির জেরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে জানাল কার্নেগির সমীক্ষা।