শিশুর অবসরকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, জানতে হবে বাবা-মাদের

সম্প্রতি দক্ষিণবঙ্গে তীব্র গরমের কারণে গ্রীষ্মের ছুটি আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য সরকার। সরকারি স্কুলগুলিতে ১১ দিন ছুটি বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ, ২৭ জুন পর্যন্ত চলবে এ-বছরের গরমের ছুটি। দীর্ঘ এই ছুটির দিনগুলিতে সিলেবাসের পড়াশোনা করতে কতই বা ভালো লাগে বাচ্চাদের। আবার এমনি স্কুলের দিনগুলিতেও স্কুল, পড়া-শেষে কিছু বিনোদনের প্রয়োজন হয়। একঘেয়েমির জীবন থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে এমন কিছু শেখান, যা আপনার সন্তানকে সার্বিক শিক্ষা দেবে। অবসরে বাচ্চাদের হাতে তুলে দিন গল্পের বই, ম্যাগাজিন। অবসরে বই পড়তে ভালো না লাগলে কোনও সিনেমা বা পডকাস্ট বা অডিও বুক শোনাতে পারেন তাঁদের। এর ফলে ওদের মনও ভালো থাকবে আবার ছোট ছোট জিনিসগুলি সহজেই শিখে ফেলতে পারবে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, বাচ্চাদের এমন কিছু অবসর যাপনের বই, ম্যাগাজিন, সিনেমা ও পডকাস্ট সম্পর্কে।

বই

নো ডিফারেন্স বিটুইন আস
ছোট বয়স থেকেই লিঙ্গবৈষম্যর বিরূদ্ধে শিক্ষার প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি সম্মান। আমান্ডা গ্যালিভার স্যান্ডারসের লেখা এই বই লিঙ্গশিক্ষার পাঠ দেবে সন্তানকে। রঙিন ছবি-সহ সহজ গল্পের ছলে লেখা এই বই খুবই ভালো। তাই ফাঁকা সময়ে এই বই আপনার সন্তানকে এক অন্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে।

লেটস টক অ্যাবাউট বডি বাউন্ডারিজ, কনসেন্ট অ্যান্ড রেসপেক্ট
সারাহা জেনিংসের লেখা এই বইয়ের বিষয় হলো অন্য ব্যক্তির শারীরিক সীমারেখার প্রতি সম্মান জানানো এবং সেই সম্পর্কে আলোচনা করার আগে তাঁর থেকে সম্মতি চেয়ে নেওয়া। যা একটি শিশুকে শৈশব থেকেই শেখানো প্রয়োজন। সহজভাবে শিশুদের সঙ্গে জড়িত নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই কথাই বারবার বুঝিয়ে দেওয়া হয় এই বইয়ে। লেখক নিজেও একজন শিক্ষাবিদ এবং প্রকাশক হওয়ায় এই বই খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন বাচ্চাদের জন্য।

আরও পড়ুন: বারবার তালা স্কুলের গেটে, গরমের ছুটি বাড়ার নেপথ্যে আসলে কোন কারণ?

ওন্ডার কিডস: হান্ড্রেড চিলড্রেন হু গ্রিউ আপ টু বি চাম্পিয়নস অফ চেঞ্জ
বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরা শৈশবে কেমন ছিলেন এবং কীভাবে সফল হয়েছেন জীবনে, তা নিয়েই এই বই। অ্যানি ফ্রাঙ্ক থেকে মালালা, জগদীশচন্দ্র বসু থেকে অ্যালবার্ট আইনস্টাইন এবং চার্লস ডারউইন থেকে কোকো চ্যানেলের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রায় একশো মানুষের কথার সম্ভার এই বই, যা আপনার সন্তানকে উদ্বুদ্ধ করবে সঠিক পথে চলার জন্য।

ছোট্ট একটি স্কুল

ইংরেজি বইয়ের পাশাপাশি বাংলা বইও পড়া প্রয়োজন শিশুদের। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থেকেছে অতিমারীতে। তাই স্কুলের জীবন কেমন হয়, সে-সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করতে পারে, এবং একইসঙ্গে মন ভালো করতে পারে শঙ্খ ঘোষের এই বইটি। বইটি মূলত একটি স্মৃতিচারণ। তার সূত্রেই ধারণা পাওয়া যাবে এক সময়ের স্কুলজীবন কেমন ছিল, তারও।

প্রকৃতি পড়ুয়ার দপ্তর
দীর্ঘদিন 'সন্দেশ' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত জীবন সর্দারের লেখার সংকলন এই বইটি থেকে শিশুদের ধারণা হবে প্রকৃতি, জন্তুজানোয়ার ইত্যাদি নিয়ে। সহজ, সাবলীল ভাষায় লেখা এই বই থেকে গল্পের ছলে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হতে পারবে শিশুরা। সঙ্গে রয়েছে সত্যজিৎ রায়ের করা অনবদ্য সব অলংকরণ।

সিনেমা

গুপী গাইন বাঘা বাইন
সত্যজিৎ রায়ের এই ছবি ক্লাসিক এবং চিরন্তন। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর গল্প নিয়ে এই ছবি শুধুমাত্র শিশুকে আনন্দ দেবে না, যুদ্ধমুখর এই পৃথিবীতে শান্তির বার্তা দেবে। তাছাড়া এই ছবির অমর সংগীতও আনন্দ দেবে শিশুদের।

জুরাসিক পার্ক
কিছুটা ভয় পেলেও শিশুদের দেখা উচিত এই ছবি। স্টিভেন স্পিলবার্গের কালজয়ী এই ছবি ডাইনোসরদের প্রত্যাবর্তনের গল্প শুধু বলে না, সঙ্গে জরুরি বার্তা দেয় পরিবেশের ওপর মানুষের অনিয়ন্ত্রিত হস্তক্ষেপ নিয়েও। এই ছবির শিশু চরিত্রদের সঙ্গে নিজেদের মিলিয়ে রোমাঞ্চিতও হতে পারবে শিশুরা।

টেকঅ্যাওয়ে
বিশ্ব উষ্ণায়ন সম্পর্কে শিশুদের শেখানোর জন্য অবসরে বাচ্চার সঙ্গী হোক 'টেকঅ্যাওয়ে'। বিশ্ব উষ্ণায়ন বিষয়ে কথা হলেই আমরা সবসময় আলোচনা করি আমাদের পক্ষে কী ভালো। কিন্তু পশুদের জন্য আমাদের কী কী করা উচিত, তা নিয়ে কথা খুব কমই হয়েছে। এই ফিল্ম ঠিক সেই বিষয়কেই তুলে ধরে।

কিল্লা
অবিনাশ অরুণের তৈরি মারাঠি ছবি কিল্লা এক ছোট্ট ছেলের গল্প। এক ১১ বছর বয়সি সপ্তম শ্রেণির ছেলে তাঁর বাবাকে হারিয়েছে। মা পুনে শহর থেকে স্থানান্তরিত হওয়ার পরে, কঙ্কন উপকূলের একটি ছোট গ্রামে নতুন স্কুলে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ৷ জীবনের সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করেছে সেই ছোট্ট ছেলে, তা নিয়েই গল্প। এক একক মা এবং তাঁর কর্মক্ষেত্র উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর মাকে যে চাপগুলি সহ্য করতে হয়, সেই দৃশ্যও ফুটে উঠেছে ছবিতে। এই ছবি নিঃসন্দেহে আপনার সন্তানকে এক অন্য শিক্ষা দেবে।

ধনক
পরী এবং ছটু- দুই ভাই-বোন একসঙ্গে স্কুল যায়। ভাই ছটু সলমনের এবং পরী শাহরুখ খানের ফ্যান। ছটু জন্মগত অন্ধ। তবে পরী ভাইকে কথা দিয়েছে নয় বছরের জন্মদিনে সে তাঁর দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবে। সেইমতো হঠাৎই একদিন পরী শাহরুখের পোস্টার দেখতে পায় যা চক্ষুদানকে উৎসাহ দেয়। সেই মতো পরী শাহরুখকে চিঠি লেখে কিন্তু উত্তর আসে না। এই সময় সে জানতে পারে, তাঁর প্রিয় অভিনেতা রাজস্থানে শুটিং করতে আসছে। দুই ভাই-বোন ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে চেয়ে যাত্রা শুরু করে। সরলতায় মোড়া এই ছবি মন ছুঁয়ে যাবেই।

বলিউড সিনেমার মধ্যে 'তারে জামিন পর', অমিতাভ বচ্চন অভিনীত 'ভূতনাথ', ' চিল্লার পার্টি' ইত্যাদি সিনেমাগুলি খুবই আনন্দ দেবে বাচ্চাদের।

ম্যাগাজিন

টেল মি হোয়াই
বাচ্চাদের জনপ্রিয় পত্রিকাগুলির মধ্যে অন্যতম এই বিজ্ঞান পত্রিকা। স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রোজেক্ট এবং সেগুলির কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে টিপস থাকে এই পত্রিকায়। উদাহরণের মাধ্যমে ফোটোগ্রাফ ও কার্টুন-সহ প্রশ্নোত্তর আকারে সাজানো থাকে বিষয়বস্তুগুলি। সহজ ভাষায় বহু তথ্যের সম্ভার এই পত্রিকা সহজেই শিশুদের অনেক কিছু শিখিয়ে দেবে।

চাইল্ড সিটি
চাইল্ড সিটি একটি মাসিক পত্রিকা। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সিদের জন্য প্রকাশিত এই পত্রিকাটি নানা ধরনের শিক্ষামূলক তথ্যে পূর্ণ এবং বাচ্চাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য। এর ফলে বাচ্চাদের কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং শিশুমনকে জ্ঞানে পূর্ণ করে তোলে চাইল্ড সিটি।

এছাড়া বাংলায় আনন্দমেলা, শুকতারা, সন্দেশ পত্রিকাগুলি বহু যুগ ধরেই শিশুদের মনকে জয় করে আসছে। তাই অবসর সময়ে এই পত্রিকাও তুলে দিতে পারেন ছোট্ট সন্তানের হাতে।

পডকাস্ট

গল্প শুনতে কার না ভালো লাগে। তাই অবসর সময়ে যেসব বাচ্চারা বই পড়তে চায় না, তাঁদের জন্য খুবই ভালো বিকল্প পডকাস্ট চ্যানেলগুলি। শুধু গল্প নয়, নানা ধরনের বিষয় সম্পর্কে জানতেও পডকাস্টের জনপ্রিয়তা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। যে চ্যানেলগুলি বাচ্চাদের শোনাতে পারেন:

বেঙ্গলি ক্লাসিকস বাই অর্ণব
এই পডকাস্ট চ্যানেলটিতে শরৎচন্দ্রের লেখা 'মেজদিদি', রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'কাবুলিওয়ালা', 'অতিথি', 'মানভঞ্জন', আবার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা 'আদর্শ হিন্দু হোটেল'-এর মতো বহু জনপ্রিয় গল্প রয়েছে। তাই এই চ্যানেল নিঃসন্দেহে অবসর কাটানোর দারুণ উপায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাচ্চাদের গল্প শোনাতে চাইলে রেডিও মির্চির সানডে সাসপেন্স-ও বিকল্প হতে পারে।

ব্রেন বিস্কুট
বাচ্চাদের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকে। তবে সেগুলি কখনও কখনও অদ্ভুত মনে হতে পারে। এমন অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দেবে ব্রেন বিস্কুট। যেমন ধরুন, কলা-র আকৃতি বাঁকা কেন, হোমওয়ার্ক কে আবিষ্কার করল, বিড়াল কেন মিউ করে ডাকে, এমন প্রশ্নের জবাব পাওয়া যাবে এই চ্যানেলে। তাই বাচ্চাকে ফাঁকা সময়ে শোনাতেই পারেন এই মজার জিনিসগুলি।

এছাড়াও ইংরেজি ভাষার নানা মজাদার শব্দ, কথা বলার ভঙ্গি শেখানোর জন্য একাধিক চ্যানেল রয়েছে। তাছাড়া ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ের কথা শোনাতে চাইলে বিবিসির 'এ হিস্ট্রি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড', 'ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি পডকাস্ট'-এর মতো চ্যানেলগুলিকেও বেছে নিতে পারেন।

 

More Articles

;