বারবার তালা স্কুলের গেটে, গরমের ছুটি বাড়ার নেপথ্যে আসলে কোন কারণ?

…Authority had decided to extend the summer vacation till 26 june, 2022 or until further instructions…

এটাই পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সভাপতি এবং পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের সভাপতিকে পাঠানো পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিদ্যালয় শিক্ষা ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রধান সচিব মনীশ জৈনের নির্দেশিকা।

অর্থাৎ, স্কুলে আবার ছুটির ঘণ্টা।

বাড়ানো হলো গরমের ছুটির মেয়াদ। গরমের ছুটি বাড়ানোর নির্দেশিকা জারি করল রাজ্য স্কুল শিক্ষা দপ্তর। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে রাজ্যের বেশ কয়েক জনের মৃত্যুর পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাড়ানো হলো গরমের ছুটির মেয়াদ। আগামী ২৬ জুন পর্যন্ত গরমের ছুটি বাড়ানো হলো। মধ্যশিক্ষা পর্ষদ ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদকে দ্রুত নির্দেশিকা জারির নির্দেশ দিল স্কুল শিক্ষা দপ্তর। একথা ঠিক যে, গরমে রাজ্যবাসীর প্রাণ ওষ্ঠাগত। স্কুলের ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর পিছনে রাজ্য সরকারের মানবিক মুখ আছে ঠিকই, তবে এর পিছনে স্কুল চালানোর ক্ষেত্রে অন্য ব্যর্থতার আখ্যান নেই তো? এই প্রশ্ন মাথায় আসা স্বাভাবিক। কারণ, একথা নতুন করে বলার প্রয়োজন পড়ে না যে, মিড-ডে মিল কচিকাঁচাদের অনেক বেশি স্কুলমুখী করেছিল। আর যেভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, তাতে স্কুল বন্ধ রেখে মিড-ডে মিল বন্ধ রাখলে আখেরে সরকারের লাভ আছে বইকি!

কেন বাড়ল ছুটি?
শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার উত্তর ২৪ পরগণার পানিহাটিতে দণ্ড মহোৎসবে প্রচণ্ড গরমে প্রাণহানি এবং অনেকের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী স্কুলের বাচ্চাদের বিষয়ে অত্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেন। মুখ্যমন্ত্রী মনে করছেন, এমন ভয়াবহ গরম চলতে থাকলে স্কুলপড়ুয়ারা খুবই অসুবিধায় পড়বে। তারপরেই তিনি শিক্ষামন্ত্রীকে ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা বলেন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত ছিল ছুটি। এবার তা বাড়ানো হলো আরও দুই সপ্তাহ। গরমের তীব্রতা নিয়ে আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এখনও বর্ষার দেখা মেলেনি। এদিকে উত্তরে বৃষ্টি এলেও দক্ষিণবঙ্গজুড়ে গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত অবস্থা মানুষের। এই পরিস্থিতিতে সরকারি স্কুলগুলিতে গরমের ছুটি আরও ১৫ দিন বাড়তে চলেছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই বিষয়ে রবিবার শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর সঙ্গে কথা বলেন বলে সূত্রের খবর। সিদ্ধান্ত হয়েছে, ১৫ জুন পর্যন্ত গরমের ছুটি থাকলেও তা আরও ১৫ দিন বাড়ানো হচ্ছে।

মিড-ডে মিল নিয়ে কালঘাম
স্কুল ছুট, নাবালিকা-বিবাহ এসব ছিল বাংলার হারানো-শৈশবের চেনা ছবি। মিডডে মিলের দৌলতে কচিকাঁচারা স্কুলে যাচ্ছিল। সেখানেও গলদ। মিড-ডে মিল নিয়ে একাধিক অভিযোগ আসছে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে। কোথাও পচা আলু, পোকা ধরা ডাল, ছোলা বিলি করার অভিযোগ আসছে। কোথাও আবার অভিযোগ আসছে পরিমাণে কম সামগ্রী দেওয়ারও। তার থেকেও উদ্বেগের বিষয়, মিড-ডে মিলে বরাদ্দ বাজেট ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। অনেকদিনই হলো, মিড-ডে মিলে পড়ুয়াদের পাতে পড়ছে না ডিম। তার জায়গায় দেওয়া হচ্ছিল সয়াবিন। এবার ছাঁটাই হয়ে গেল তাও।

এই দুর্মূল্যের বাজারে যৎসামান্য বরাদ্দে বাচ্চাদের মুখে ডিমের সঙ্গে ভাত, ডাল, তরকারি তুলে দিতে কার্যত কালঘাম ছুটছে স্কুলের। তাই রাজ্য সরকারের কাছে প্রাথমিকের পড়ুয়াদের দুপুরের খাবারের জন্য এক সুরে ভর্তুকির দাবি তুলেছে শাসক এবং বিরোধী শিক্ষক সংগঠন।

বিকাশ ভবনের খবর, ২০০১ সালে প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়াদের জন্য মিড-ডে মিল প্রকল্প শুরু হয়। সারা দেশে তা চালু হয় ২০০৪-এ। কেন্দ্রীয় সরকার বরাদ্দ অর্থের ৬০ শতাংশ দেয়। রাজ্য দেয় ৪০ শতাংশ। পড়ুয়া-পিছু বরাদ্দ কত হবে, ঠিক করে কেন্দ্র। ২০০৪ থেকে ২০১৪-’১৫ অর্থবর্ষ পর্যন্ত প্রতি বছর কেন্দ্রীয় সরকার মিড-ডে মিল খাতে সাত শতাংশ হারে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। ২০১৫-’১৬ আর্থিক বছরে সামান্য বরাদ্দ বৃদ্ধির পরে আর তা বাড়েনি। কেন বাড়ল না, ২০১৮-’১৯ আর্থিক বছরের বাজেটে সেই বিষয়ে টুঁ শব্দটি করেননি প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। এর পরেও পরিস্থিতির খুব একটা বদল হয়নি।

নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে ছ’দিনই মিড-ডে মিল দেওয়ার কথা। এবং সপ্তাহে অন্তত দু’দিন পাতে ডিম দিতেই হবে। ‘ভেজ প্রোটিন’ বা উদ্ভিজ্জ প্রোটিন দিতে হবে রোজ। সঙ্গে ভাত-ডাল-তরকারি। সেই সঙ্গে রয়েছে রান্নার গ্যাসের খরচও। এতকিছুর জন্য প্রাথমিকে পড়ুয়া-পিছু বরাদ্দ মোটে ৪.১৩ টাকা! উচ্চ-প্রাথমিকে ৬.১৮ টাকা। শিক্ষকদের দাবি, এখনই উচ্চ-প্রাথমিকে না-হলেও প্রাথমিকে মিল-পিছু অন্তত এক টাকা করে ভর্তুকি দিক রাজ্য সরকার। কন্যাশ্রী, সবুজ সাথীর মতো প্রকল্পে তো ঢালাও খরচ হচ্ছে। আর মিড-ডে মিলের বেলায় যত গড়িমসি!

টিউটোপিয়া, বাইজুস-দের দাপাদাপি
কোভিড পরিস্থিতিতে জীবনযাপনের ধরনই বদলে গেছে। বদলে গেছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এমনকী খাদ্য সংস্কৃতিও। লকডাউনে বহুদিন বন্ধ ছিল স্কুল-কলেজের দরজা। আর সেই পথে সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকে পড়েছে টিউটোপিয়া বা বাইজুসের মতো ই-লার্নিং অ্যাপ। একটি পরিসংখ্যান দিলে বোঝা যাবে, এদের দাপট কতটা বেড়েছে।

ইতিমধ্যে আট লক্ষেরও বেশি মোবাইলে টিউটোপিয়া জায়গা করে নিয়েছে। ১৬,০০০ রিভিউর মধ্যে টিউটোপিয়ার রেটিং ৫-এর মধ্যে ৪.৮। টিউটোপিয়া বা বাইজুস–এদের মূল লক্ষ্য হলো, নানা ফন্দিফিকির করে ফোনে নিমগ্ন এই জেনারেশনকে অ্যাপের মাধ্যমে পড়িয়ে দেওয়া। তাহলে প্রশ্ন হল, ক্লাসরুম, ব্ল্যাকবোর্ড, খেলার মাঠ, বন্ধু-বন্ধুনী- এসব কালে-দিনে আর পাঁচটা চ্যাপ্টারের মতো ইতিহাসের বইয়ে জায়গা করে নেবে?

টিউটোপিয়া বা বাইজুস- কোনও একটা অভ্যাসের নাম হতে পারে, কিন্তু স্কুল হল শৈশব-কৈশোর তৈরির পীঠস্থান। বেত মেরে সেই ব্যবস্থাকে উঠিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হবে এক প্রজন্মের শিরদাঁড়াকে ভেঙে ফেলার নামান্তর। স্কুলের বিকল্প হতে পারে না কোনও অ্যাপ। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, স্কুলের গেটে বেশিদিন তালা ঝুললে সঙ্গে সঙ্গে মিড-ডে মিলের থালায় যে লকডাউন হবে, তা বলাই বাহুল্য। এতে কার লাভ, তা ভেবে দেখার জন্য বেশি বুদ্ধি খরচের দরকার পড়ে না। তবে একথা ঠিক যে, আবারও খিদের জ্বালায় ধুঁকবে আমাদের ঘরের অসহায় মুখগুলো। সত্যিই পড়াশোনা তাদের কাছে হয়ে উঠবে বিলাসিতা!

More Articles

;