হায়নাদের সঙ্গে কথা বলেন ইথিওপিয়ার এই যুবক! কী রহস্য লুকিয়ে এর নেপথ্যে?

Hyenas of Ethiopia: "চাইলে মুহূর্তে ওরা আব্বাসকে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু আব্বাস যাইই করুক, হায়নারা ওকে কিচ্ছুটি বলে না", জানান লেহ্‌ম্যান।

Sindhu Som
৪ মিনিট
হায়নাদের সঙ্গে কথা বলেন ইথিওপিয়ার এই যুবক! কী রহস্য লুকিয়ে এর নেপথ্যে?

হরারের আকাশ ক্রমে লাল থেকে ছাই হয়ে এল। এই শহরের চারদিকে দেওয়াল। কোনও এক অশুভ ইঙ্গিত যেন সেই দেওয়ালে লেগে আছে। অস্বস্তি জাগে। কেবলই মনে হয়, কেন এই দেওয়ালের প্রয়োজন হল? ওপারে কী রয়েছে? কীসের থেকে বাঁচতে চাইছে শহরের বাসিন্দারা? বাইরে আফ্রিকার আদিম গন্ধ ঘন হয়ে আসে। আকাশের ছাই রঙ এসময় গাঢ় হতে হতে কালো। রাত নেমে আসে ইথিওপিয়ার এই ছোট্ট শহরে। চারদিক দমবন্ধ করা নিস্তব্ধতা। আফ্রিকার উন্মুক্ত আকাশও যেন এই দেওয়ালের সামনে এসে থমকে গিয়েছে। শহরবাসী নিজেদের আলাদা করে রাখতে চায় কেন?

হঠাৎ এই নিস্তব্ধতা ভেঙে শোনা যায় একটা চিৎকার। শেয়ালের ডাক? না তো! সেই আবছায়ায় যা দেখা গেল, তাতে গায়ের রক্ত হিম হয়ে আসে। একটি মানুষকে ঘিরে ধরেছে খানপাঁচেক হিংস্র ক্ষুধার্ত হায়না। মানুষটি মাটিতেই বসে পড়েছে শেষমেশ। নড়ছে-চড়ছে না। হয়তো ভয়েই মৃতপ্রায়। কে জানে! কে বাঁচাবে ঐ মানুষটিকে? চারপাশ দিয়ে তখন জ্বলন্ত পাঁচজোড়া চোখ, প্রচণ্ড লোভে তাদের চোয়াল ঝুলে পড়ছে। ঝকঝকে দাঁতের ফাঁক দিয়ে লালা ঝরছে। খাওয়ার সময় হয়ে এল।

ভয় পেলেন? পাওয়াটাই স্বাভাবিক। হায়নাকে লোকে হিংস্র, এঁটোখেকো পশু বলেই চেনে। কিন্তু ইথিওপিয়ার এই ছোট্ট শহরে হায়নাদের কেউই ভয় পায় না। যে ছেলেটিকে পাঁচটি হায়না ঘিরে ধরেছিল, সে এর পরে একটি ঝুড়ি হাতড়ে মাংসের টুকরো বের করে এবং বাতাসে ছুঁড়ে দেয়। ঘিরে ধরা হায়নারা কেউই ছেলেটিকে আক্রমণ করে না। ছুঁড়ে দেওয়া মাংস মহানন্দে লুফে নেয় তারা। এমনকী, ছেলেটির হাত থেকেও মাংস খেয়ে যায়। ঘরে পোষা কুকুরের মতোই হাবভাব এখানে হায়েনর। এই কারণেই শহরের লোক হায়নাদের ভয় পায় না। ফটোগ্রাফার ব্রায়ান লেহ্‌ম্যান এই গোটা ঘটনাটি ক্যামেরবন্দি করেছিলেন। সেসময় বেশ কিছু দিন এই শহরে কাটিয়েছিলেন ভদ্রলোক। তাঁকে এ-ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি আঁতকে ওঠেন। তাঁর কাছে ঘটনাটি যেন অতিলৌকিক। এমন ঘটনা জীবনে তিনি দেখেননি। এবং ঠিক যুক্তি দিয়েও তিনি একে ব্যাখ্যা করতে অপারগ। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, "আমার কাছে ওদের এই সম্পর্কের ব্যপারটাই অদ্ভুতুড়ে! সমস্ত জায়গায় হায়নাকে লোকে ভয় করে। কিন্তু এই শহরের লোক আশ্চর্য। সত্যি বলতে কি, হায়নার চোয়ালে এত জোর, সে আপনাকে জ্যান্ত চিবিয়ে খেতে পারে, একটা তোবড়ানো মাংসপিণ্ড ছাড়া আর কিছুই পড়ে থাকবে না মাটিতে, মিনিটের মধ্যে এমন কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলতে পারে হায়নারা। এখান থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরত্বে একটি মেয়েকে এই সেদিনও মুখে কামড়ে নদী পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়েছে হায়নাতে। কিন্তু এ-শহরে বাচ্চারা পর্যন্ত হায়নায় ভয় পায় না।"

অবাক লাগছে? এর নেপথ্যে রয়েছে এক চমকপ্রদ ইতিহাস। এই শহর হায়নাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছে বহুদিন। দীর্ঘ সময় এই শহরে কাউকে আক্রমণ করেনি হায়নারা। কয়েক শতাব্দী আগে এর অবস্থা ছিল আশপাশের আর চার-পাঁচটা জায়গার মতোই। হায়নাদের আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে থাকত মানুষজন। প্রায়ই মানুষ টেনে নিয়ে যায় হায়নায়। তখনই এই পাঁচিল তোলা। কিন্তু তাতে কি হায়না আটকানো যায়? হিংস্র জন্তুগুলো পাঁচিল টপকাতে পারে না সহজে, কিন্তু আশেপাশে ওঁৎ পেতে থাকে। সারাদিনের প্রয়োজনে মানুষকে বাইরে বেরোতেই হয়। তখনই অতর্কিতে দাঁত বসায় গায়ে। আর ওই দাঁত একবার বসল মানে ছাড়ানোর ক্ষমতা হবে না প্রায় কারওরই। টানতে টানতে হায়না তখন নিয়ে যাবে শিকারকে তার সুবিধেমতো জায়গায়। নিয়ে যাওয়ার আগেও মেরে ফেলতে পারে, মেরে ফেলতে পারে পরেও। একের পর এক মানুষ গায়েব হয়ে যায়। শেষে শহরের লোক সেই পাঁচিলের গায়ে গর্ত করে সেখান থেকে খাবার ছুঁড়ে দিতে থাকে হায়নাদের। আশা, মানুষ না খেয়ে যাতে ওরা মানুষের দেওয়া খাবারেই সন্তুষ্ট থাকে। দেখা গেল কাজ হয়েছে আশ্চর্যরকম। এরপর শহরের ইতিহাসে গত দুশো বছর ধরে চলছে এমনই, কোনও আক্রমণের ঘটনা ঘটেনি।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মাটির তলায় থাকেন আইনজীবী! কেন এই জীবন বেছে নিয়েছেন তিনি? জানলে চমকে উঠবেন

Russian Hobbit: খুবই সাদামাটা জীবন ইউরির। একঘেয়েমি কাকে বলে, তিনি জানেন না। সবসময় নানা কাজে ব্যস্ত।

ইউসুফের দেওয়া খাবার হায়নারা খায় বেশ তৃপ্তি করে। শহরের যাবতীয় এঁটোকাটা, মড়া জীবজন্তু সে ফেলে দিয়ে আসে শহরের ডাম্পিং ইয়ার্ডে। আবর্জনার স্তুপেরই একপাশে আলাদা করে জড়ো করা সেই খাবার হায়নারা মহানন্দে খেয়ে ফেলে। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় এখানে এসে জড়ো হয় তারা। পচাগলা, এঁটো মাংসের ট্রাকটি একটি বিশেষ সাইরেন বাজায়। সেই শব্দ পাওয়ামাত্র ওরা বুঝতে পারে, খাবার এসে গিয়েছে। ট্রাকের অটোমেটিক ডালা খোলার ধাতব আওয়াজে জিভ থেকে জল ঝরে ওদের। এরপর ভূরিভোজ। এছাড়াও সন্ধের দিকে আরেকটিবার তাদের খাওয়ার সময়। শুরতেই যে ছেলেটির সঙ্গে আমাদের মোলকাত হয়েছে, সে আব্বাস। একটা উঁচু টিলার ওপর উঠে ঠিক সন্ধে নামার মুখে আব্বাস হায়নাদের ডাকতে থাকে। আব্বাসের ডাক শুনে জন্তুগুলো ছুটেও আসে। আব্বাসের পিছন পিছন ধাওয়া করে এসে ওঠে তার বাড়িতেই। আব্বাসের বাড়িটি পর্যটকদের আস্তানা। তাঁদের সামনেই ওদেরকে খাওয়াতে থাকে আব্বাস। এতে রোজগারও হয়, হায়নাদের খাওয়ানোর ঐতিহ্যও বজায় থাকে। প্রতি রাতেই আব্বাসের ডাকে ওরা ঠিক সাড়া দেয়। আব্বাসের নির্দেশে পর্যটকদের সামনে যেন উঠছে বসছে মঞ্চের অভিনেতারা। সবক'টিকে নাম দিয়েছে আব্বাস। কয়েকটি বাকিদের থেকে সাড়া দেয় বেশি, আব্বাসের কথা বোঝেও বেশি। ওদের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে যায় আব্বাস। তাদের নিজস্ব এক ভাষা রয়েছে।

লেহ্‌ম্যান পেশাদার ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার না হলেও জন্তু-জানোয়ারের জীবন ক্যামেরাবন্দি করার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। তাঁর মতে, "খুব ভালো সম্পর্ক না তৈরি করলে এমন আদানপ্রদান সম্ভব নয়।" সাধারণত এইজাতীয় ডকুমেন্টেশন করা হয় ক্যামেরা ট্র্যাপ ব্যবহার করে। কিন্তু আব্বাসের সঙ্গে থাকলে সেসবের দরকারই পড়ত না। যা খুশি করতে পারতেন লেহ্‌ম্যান। কিন্তু একা থাকলে সেই হায়নাদের বিশ্বাস অর্জন করতেই প্রতিবার বহু সময় ব্যয় করতে হত তাঁকে। একরাতে সত্যিই চমৎকার একটা ঘটনা ঘটেছিল। আব্বাসের খুবই প্রিয় একটি হায়না আব্বাস এবং লেহ্‌ম্যানকে তার গুহায় নিয়ে গিয়েছিল। "এই পর্যায়ে এসে আপনার মনে হওয়া স্বাভাবিক, তবে কি এখানেই মরণ লেখা রয়েছে? মারবে বলেই এতদূর নিয়ে এল আমাকে হায়েনাটি? কিন্তু না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারবেন কী অসম্ভব সম্পর্ক আব্বাস এদের সঙ্গে তৈরি করতে পেরেছে!" একটি গুহায় তো রীতিমতো হায়নার ছানাপোনাদের বসতি। "অন্ধকারের মধ্যে হায়নাদের আপনি দেখতে পাবেন না। শুধু অনুভব করবেন ওরা সরে সরে যাচ্ছে। চাইলে মুহূর্তে ওরা আব্বাসকে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু আব্বাস যাইই করুক, হায়নারা ওকে কিচ্ছুটি বলে না", জানান লেহ্‌ম্যান।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই অদ্ভুত রীতি প্রাকৃতিক নিয়মকেও জয় করে ফেলেছে। এর থেকে বোঝা যায়, যেসব প্রাণীকে মানুষ হিংস্র বলে, ভয় পায়, উপকথায় তাদের খল হিসেবে তুলে ধরে, তাদের আসলে মানুষ ভুল বুঝে এসেছে চিরকাল। লেহ্‌ম্যানের মতে, হায়নারা হিংস্র, সন্দেহ নেই, কিন্তু সৌন্দর্য ওদের মধ্যেও রয়েছে। খুঁজে দেওয়ার অপেক্ষামাত্র।

ছবি ঋণ: ব্রিলিয়ান্ট ইথিওপিয়া

লিখেছেন
Sindhu Som
Sindhu Som
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।