মাটির তলায় থাকেন আইনজীবী! কেন এই জীবন বেছে নিয়েছেন তিনি? জানলে চমকে উঠবেন

অ্যালার্ম বাজছে। ঘুম থেকে উঠুন। ব্যাগ নিয়ে সোজা মেট্রোর দিকে হাঁটা লাগান। অফিস, কম্পিউটারে মুখ গুঁজে কেটে যাবে সমস্ত দিন। কিছু জরুরি ফোন। ফের মেট্রো ধরে বাড়ি। খাওয়াদাওয়া করে উঠে যান বিছানায়। এই চক্রাকারে গোল গোল পাক খাওয়া। নাগরিক জীবনের এই খাঁচা ছেড়ে বেরনো আর হয়ে ওঠে না। বাঁচার জন্য জীবিকা না কি জীবিকার জন্য বাঁচা? অথচ গল্পে রূপকথায় কতশত বাঁচার বয়ান। শুধু গল্পেই বা কেন? বাস্তবেও তো কত নির্লিপ্ত, অবাক জীবনের ছায়া! সাধারণ লোকে তাকে বলবে পাগলামি। অথচ প্রবল যান্ত্রিক কচকচির মাঝে একজন খুঁজে নিচ্ছেন স্বেচ্ছায় বনবাস। নাম তাঁর ইউরি। ইউরি অ্যালেক্সেভ। 

 

মস্কো শহরে একটি ল ফার্মে নিপাট চাকরি করতেন ভদ্রলোক। আর পাঁচজনের মতো অফিস ছুটছেন, অফিস থেকে বাড়ি। সারাদিন কাজের টেনশন। তদুপরি বিল মেটানোর ঝক্কি। এই করে টেনেটুনে একরকম চলছিল। কিন্তু একদিন বেঁকে বসলেন ইউরি। নাহ্‌, জীবনটা এভাবে নষ্ট করা যায় না!

 

"শহরে থাকতাম, বাড়িভাড়া দেওয়ার জন্য উদয়াস্ত খাটতে হত। এখন দেখুন, আমার নিজের বাড়ি রয়েছে, কোনও বন্ধক নেই। আমি সম্পূর্ণ মুক্ত। আমাকে কাজ করতে হয় না। শহরে থাকতে কাজও ভালো লাগত না, জীবনটাকেও অসহ্য মনে হত। সত্যি বলতে কি, ভালো ছিলাম না," বলছেন আজকের ইউরি, বছরদশেক আগে যিনি সমস্ত ছেড়েছুড়ে চলে এসেছিলেন জঙ্গলের পাশে, মস্কো থেকে ১০০ কিমি দূরে, যেখানে নাগরিক জীবনের সর্বগ্রাসী রূপ ফুটে ওঠেনি এখনও।

আরও পড়ুন: পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে, বেঁচে থাকবে এই দুর্গশহর?

 

প্রথম প্রথম একটু অসুবিধেই হচ্ছিল। দীর্ঘদিনের অভ্যেস সব ছেড়ে আসা। ঘর একটা বানানো দরকার বুঝতে পারছিলেন, কিন্তু কোনও চেষ্টাই জুতসই হচ্ছিল না। শেষে সেই রূপকথার 'হবিট'-এর মতো একখানা গর্ত খুঁড়ে দেখা গেল, এভাবেই সুন্দর থাকা যাবে। তাঁর বয়ানে,"ছ'-ছ'টা মাস টেপীতে (একধরনের তাঁবু) কাটিয়েছি, নেটিভ আমেরিকানরা যেমন থাকতেন। তারপরে ঠান্ডা পড়ল। তাঁবুতে শীত কাটে না। ঠিক করলাম, একটা ঘাসের বা পাতার ঘর বানাব। এ-জিনিস রাশিয়ার কোথাও দেখতে পাওয়া যাবে কি না, সন্দেহ। কিন্তু আগুন লেগে ঘরটা গেল পুড়ে! কী করি কিছুই বুঝে উঠতে পারি না! এক-একবার মনে হচ্ছিল, যাই এই পোড়া দেশ ছেড়ে দূরে। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে ফের ঠান্ডা মাথায় ভাবতে বসলাম। কী কী অপশন আছে আমার কাছে? ট্রি হাউজ করা যায়, হাউজবোট করা যায়... শেষ অবধি মাটির তলায় ঘর বানানোটাকেই পদের মনে হল। এতে তেমন জিনিসপত্রও লাগে না, আবার গরম রাখার জন্যও তেমন বিশেষ কিছু করার দরকার পড়ে না, বাইরে মাইনাস ২০ ডিগ্রি, ঘরের ভেতর এমনিই গরম।"


বাড়িটিতে ঘর সাকুল্যে একটিই। জানলার পাশে ঘরের এক কোণায় ইউরির বিছানা। সে বিছানার চারপাশে গুচ্ছের বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। ঠিক তার উল্টো দিকে একটা ছোট্ট গোছানো কিচেন। কিচেনের মাঝখানে কার্পেট আর টেবিল পাতা। অতিথি এলে এখানেই বসতে দেন ইউরি। এই ঘরে ঢোকার ঠিক মুখে একটু ওপাশে গেলেই একটি বিরাট বইয়ের আলমারি। তাক ভর্তি বই। বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে বাথরুম। "বাথরুম বাইরে বলে একটু সমস্যা হয়। বড় রাস্তা দিয়ে যেইই যায়, আমাকে দেখতে পায়। আর ঠান্ডায় খুবই অসুবিধে হয়," বলে হাসলেন ইউরি।

 

ইউরিকে লোকে আজকাল 'দ্য রাশিয়ান হবিট' বলে ডাকে। ফলে তাঁকে এও জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি টলকিয়েনের উপন্যাসগুলি পড়েছেন কিনা। বিলবো ব্যাগিনসের ঘরের সঙ্গে তাঁর ঘরের মিল রয়েছে প্রচুর। তবে এ-বিষয়টি ইউরি দেখছেন একটু অন্যভাবে, "আমার ঘরের দরজার সঙ্গে সত্যিই একটু মিল রয়েছে বটে, তবে হবিট হাউজের অনুকরণে এই ঘর আমি বানাইনি। আসলে মাটির তলায় ঘর করলে তাতে গোল দরজা রাখাটাই সবথেকে সুবিধা। আমাকে ওরা 'রাশিয়ান হবিট' বলছে, কারণ ব্যাপারটার কাটতি ভালো। 'লর্ড অব দ্য রিংস'-এর জনপ্রিয়তা তো পৃথিবীজুড়েই। তাই ওই নামের সঙ্গে আমাকে জুড়ে দিলে লোকে আগ্রহী হবে বেশি। এই আর কী! একটা টেলিভিশন শো আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসে এই নামটি আমায় দিয়েছিল, ব্যাস, সেই থেকে নামটি থেকেই গেল।" সোশ্যাল মিডিয়ায় ইউরি রীতিমতো বিখ্যাত। পৃথিবীর নানা টিভি শো তাঁর যাপন নিয়ে আগ্রহী। এমনকী, সংবাদমাধ্যম বাদে তাঁকে দেখতে আসেন পর্যটকেরাও। প্রতি বছর পৃথিবীর নানা দেশ থেকে লোকজন আসেন তাঁর কাছে। ইউরি তাঁর জমানো ফ্ল্যাগ এবং নানা উপহার নিয়ে রীতিমতো গর্বিত। যে ধরনের মানুষই আসুন, ইউরির বাড়িতে সবাই স্বাগত। এক কাপ কফি না খাইয়ে ছাড়েন না কাউকেই। "অনেকেই মনে করেন, আমি ধর্মীয় কারণে আলাদা থাকি। ধুর মশাই। ধর্ম-টর্মের কোনও ব্যাপারই না। আমার বন্ধুবান্ধব রয়েছে প্রচুর। ভালো লাগে, তাই থাকি। কিন্তু ওদের আপনি বলে বোঝাতে পারবেন না। শেষে যা বলে, তাতেই মাথা নাড়ি, সে নিজে খুশি হলেই হল।"

 

খুবই সাদামাটা জীবন ইউরির। একঘেয়েমি কাকে বলে, তিনি জানেন না। সবসময় নানা কাজে ব্যস্ত। একাকিত্ব বলে তাঁর অভিধানে কিছু নেই। নিজের পোষা একখান খরগোশ রয়েছে। সেইই সর্বক্ষণের সঙ্গী। সপ্তাহান্তে বন্ধুরা বই আর খাবার নিয়ে আসে। শেষ কবে সুপারমার্কেটে গিয়েছিলেন, তাও মনে পড়ে না ইউরির। তবে সাহিত্য এবং রাজনীতি- ইউরির এই দুই নেশা। আলেক্সেই নাভালনির গোঁড়া সমর্থক ইউরি। ইউরি মনে করেন নাভালনি সুযোগ পেলেই পুতিনের গদি টলিয়ে দেবেন, তাই পুতিন তাঁকে ভয় পায়। বুকক্রসিং-এ নিজের ৪৫০০ বই নথিভুক্ত করে রেখেছেন ইউরি। এই সাইটের মাধ্যমে পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ কোনও পাবলিক প্লেসে বই রেখে যেতে পারেন, যাতে ইচ্ছুক অপর কোনও ব্যক্তি সেই বই পড়তে পারেন। ইউরির মতে, "গুটেনবার্গের হাত ধরে যে বইয়ের পথচলা শুরু হয়েছিল, বুকক্রসিং তারই ভবিষ্যৎ।" বই দিতে যেমন ভালোবাসেন, ভালোবাসেন বই পেতেও। প্রায় এক দশক এভাবে কাটিয়ে জানালেন, আর কোনওদিন তথাকথিত 'স্বাভাবিক' জীবনের দমবন্ধ পরিবেশে ফিরতে রাজি নন। বাকিটা জীবন এভাবেই কাটিয়ে দেবেন।

More Articles

;