আমি উদ্বাস্তুদের প্রতিনিধি, সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন মেঘনাদ সাহা

Meghnad Saha: সাংসদ হওয়ার আগে-পরে, সব সময়ই তিনি বিজ্ঞানের মানবিক রূপের বিকাশে সচেষ্ট ছিলেন। জাতীয়তাবোধের স্ফূরণ ও এক শ্রেণিবিভাজনমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে তিনি বিজ্ঞানকে সার্থক ভাবে ব্যবহারে সচেষ্ট ছিলেন।

Sabyasachi Roy
৩ মিনিট
আমি উদ্বাস্তুদের প্রতিনিধি, সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন মেঘনাদ সাহা

৪ জুলাই, ১৯৫২ সাল। সংসদে পরিকল্পনা মন্ত্রকের কাজকর্ম নিয়ে আলোচনা চলছে, ছিলেন পরিকল্পনা মন্ত্রকের মন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দা। পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার সম্পর্কে তাঁর কিছু ‘জ্ঞান’ আছে জানিয়ে মেঘনাদ সাহা সংসদে প্রশ্ন তুললেন, কেন এই বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা সাংসদ ও সাধারণ নাগরিকদের কাছে গোপন রাখা হচ্ছে? তিনি মন্তব্য করেন, “এই মানসিকতা বলে দিচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল ফ্যাসিবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।’’ ‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দটি বিতর্কের আগুনে ঘৃতাহুতি দিল। জবাবে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বললেন, ‘‘ডক্টর সাহা ফ্যাসিবাদ শব্দটির অর্থ জানেন না। … তিনি বিজ্ঞানকেও অসম্মান করেছেন।’’ পিছু হঠার পাত্র নন মেঘনাদ সাহা। কৌটিল্য-শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়ে ফ্যাসিবাদের ব্যাখ্যা করলেন তিনি, বললেন— ‘‘আমি বলিনি সরকার ফ্যাসিবাদী হয়ে গিয়েছে। বলেছি, ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দিকে চালিত হচ্ছে।’’

১৯৫১ সালের স্বাধীন ভারতের লোকসভা নির্বাচনে উত্তর-পশ্চিম কলকাতা নির্বাচনচক্রে ইউনিয়ন অব সোসালিস্টস্‌ এন্ড প্রগ্রেসিভ দলের প্রার্থী হয়ে মেঘনাদ সাহা প্রতিদ্বন্দিতা করেন। নির্বাচনের খরচ সঙ্কুলানের জন্য তাঁর সেই বিখ্যাত আকরগ্রন্থ ‘এ ট্রিটিজ অন হিট’-এর প্রকাশকের নিকট পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম নিয়েছিলেন তিনি। সেই নির্বাচনে মেঘনাদ সাহা বিপুল ভোটে জয়ী হন। সংসদে শিক্ষা, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, পারমাণবিক শক্তি ও দেশের নদী-বাঁধ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মেঘনাদ সাহার।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
মেঘনাদ: বিজ্ঞান, রাজনীতি আর প্রতিবাদের কাহিনি

Meghnad Play Review: নাটকটির আর একটি জোরের জায়গা হল রাজনীতিক মেঘনাদ সাহাকে সামনে নিয়ে আসা। একসময় মেঘনাদ সাহা ছিলেন আরএসপি-র সক্রিয় কর্মী।

সাংসদ হওয়ার আগে-পরে, সব সময়ই তিনি বিজ্ঞানের মানবিক রূপের বিকাশে সচেষ্ট ছিলেন। জাতীয়তাবোধের স্ফূরণ ও এক শ্রেণিবিভাজনমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে তিনি বিজ্ঞানকে সার্থক ভাবে ব্যবহারে সচেষ্ট ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমার ব্যবহারে চমকে যায় সারা পৃথিবী। ব্রিটেন, জার্মানির মতো শক্তিধর দেশগুলি পরমাণু গবেষণায় মনযোগী হয়। মেঘনাদ সাহা বোমা বানানোর পরিবর্তে পরমাণুর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানির চাহিদা মেটানো বেশি জরুরি বলে মনে করে দেশে স্বাধীন একটি পারমাণবিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চালু করার পরিকল্পনা শুরু করেন। তার ছাত্র বাসন্তী দুলাল নাগ চৌধুরী ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলেতে আর্নেস্ট লরেন্সের সাথে কাজ করছিলেন সেই সময়। তিনি ফিরে এসে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সাইক্লোট্রন তৈরি করেন। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীর রতনজী দাদাভাই টাটার পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৪৯ সালে মেঘনাদ সাহা কলকাতায় নিউক্লিয়ার ফিজিক্স ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখন সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স (এসআইএনপি) নামে সুপরিচিত। সেই ইনস্টিটিউট ১৯৫০ সালের ১১ জানুয়ারি ইরেন জোলিও-কুরির হাত ধরে পুরো দমে যাত্রা শুরু করে। আজ সারা দেশের গুটিকয়েক গবেষণাগারের মধ্যে এই ইনস্টিটিউটটি অন্যতম প্রধান।

বিজ্ঞানচর্চার বাইরে তাঁর জীবন ও কর্মের বর্ণময় দিকগুলো ইতিহাসের পাতায় সবসময় উজ্জ্বল থাকবে। দেশের সাধারণ জনসাধারণের দুঃখ-দুর্দশা নিম্নবর্গীয় সমাজের বেদীমূল থেকে উঠে আসা মেঘনাদ সাহাকে ভাবিত করত। আর তাই, যখনই সুযোগ পেতেন তিনি তাদের প্রয়োজন নিয়ে সোচ্চার হতেন। দেশভাগের বলি ছিন্নমূল উদ্বাস্তুদের আর্তনাদে সাড়া দিতেও পিছপা না হয়ে তাদের পাশেও দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। উদ্বাস্তুদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ নিয়মতান্ত্রিক ভিত্তিতে পরিচালনা করার লক্ষ্যে তিনি বেঙ্গল রিলিফ কমিটি গঠন করেছিলেন। নিজের উদ্বাস্তু পরিচয়েও তিনি অকুন্ঠ ছিলেন। সংসদে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উচ্চারণ করেছিলেন, “আমি নিজে একজন উদ্বাস্তু, তাই এখানে আমি উদ্বাস্তুদের প্রতিনিধি।” ১৯৫৫ সালে তিনি ছুটে এসেছিলেন বিভাজিত সিলেটের ভারতে সন্নিবিষ্ট অংশ করিমগঞ্জে (তৎকালীন অসমের কাছাড় জেলার অন্তর্ভুক্ত, সম্প্রতি এই করিমগঞ্জের নাম পরিবর্তন করে শ্রীভূমি রাখা হয়েছে), সঙ্গে ছিলেন আরেক সাংসদ ত্রিদিব চৌধুরী। করিমগঞ্জে এসে তিনি উদ্বাস্তু বাজারের উদ্বোধন করেছিলেন। ফিরে গিয়ে কাছাড়ের উদ্বাস্তুদের যন্ত্রণাগাথা নিয়ে সংসদে দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছিলেন (২৪ মার্চ, ১৯৫৫ সাল)।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কোয়ান্টামের জগতে নোবেল স্বীকৃতি তিন বিজ্ঞানীর হাত ধরে নতুন দিগন্ত

Nobel Prize 2025 in Physics : লেড( LED) , লেসার, এমআরআই স্ক্যানার (MRI Scanner) থেকে শুরু করে আজকের কোয়ান্টাম কম্পিউটার, সবেতেই রয়েছে এই বিষ্ময়কর কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অবদান।

বিজ্ঞানে ব্যক্তিগত সাফল্যের ঊর্ধ্বে মেঘনাদ স্থান দিয়েছিলেন দেশ, জাতি ও দেশের অর্থনীতিকে। প্রয়োজনে বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রেই তিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী অবস্থান গ্রহণে দ্বিধা করেননি। উদ্বাস্তুদের প্রতি তাঁর সহমর্মিতার মূলে ছিল নিখাদ মানবিকতা, তাতে মেকি হিন্দুত্বের আভরণ অবশ্যই ছিল না। মেঘনাদ সাহার হৃদয়বত্তা, সত্যসন্ধান, জাতীয়তাবাদ, ন্যায়নিষ্ঠা এবং দেশ-গঠনে তাঁর মতামত ও পরিকল্পনা সম্পর্কে জানার-বোঝার প্রয়োজনীয় উৎস হচ্ছে তাঁর লোকসভায় প্রদত্ত বক্তৃতামালার সঙ্কলন— Meghnad Saha in Parliament, edited by Santimay Chatterjee and Jyotirmoy Gupta, The Asiatic Society, Calcutta (1993)।

লেখক পরিচিতি:

অসমের শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ) জেলার রবীন্দ্রসদন মহিলা মহাবিদ্যালয়ের

অধ্যক্ষ। (এর আগে বহু বছর তিনি পদার্থবিদ্যায় অধ্যাপনা করেছেন।)

লিখেছেন
Sabyasachi Roy
Sabyasachi Roy
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।