আইটি রুলস: সোশ্যাল মিডিয়ায় আর সরকারের সমালোচনা করা যাবে না?

India IT Rules: আইটি রুলস সংশোধনের পর সরকার কি সত্য-মিথ্যার একমাত্র নির্ধারক হয়ে উঠছে? ভুয়ো খবর ঠেকানোর নামে কি বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ? নাকি এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই নিশ্চিত হবে?

inscript
৩ মিনিট
আইটি রুলস: সোশ্যাল মিডিয়ায় আর সরকারের সমালোচনা করা যাবে না?

ডিজিটাল যুগে সামাজিক মাধ্যম মানুষের মতামত প্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকা উচিত, এই প্রশ্নটাই এখন উঠেছে। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ভিত্তিতে তৈরি হওয়া আইটি রুলস মূলত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তৈরি। এর লক্ষ্য ছিল ভুয়ো খবর, ঘৃণাত্মক বক্তব্য বা ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নিয়মগুলির সংশোধন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে নিয়ন্ত্রণ আর সুরক্ষার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

২০২১ সালের আইটি রুলস এবং তার পরবর্তী সংশোধনগুলিতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে আরও বেশি দায়বদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কনটেন্ট নিয়ে অভিযোগ এলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, এমনকী প্রয়োজনে সেই কনটেন্ট মুছেও ফেলতে হবে। যদি তারা তা না করে, তাহলে তারা আইনি সুরক্ষা হারাতে পারে, এবং এর জন্য তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

এখানেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। কারণ, এই নিয়মগুলির মাধ্যমে সরকার শুধু প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করছে না, কোন তথ্য সত্য আর কোনটি মিথ্যা, সেটিও নির্ধারণ করার ক্ষমতা নিজের হাতে নিচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের সংশোধনে একটি ‘ফ্যাক্ট চেক ইউনিট’-এর কথা বলা হয়েছে, যা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনো তথ্যকে ‘ভুল’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে চিহ্নিত করতে পারে।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চাকরি থাকবে তো? কপালে ভাঁজ ভারতের আইটি জগতের, কীসের বিপদের ইঙ্গিত সমীক্ষায়

Layoff job is IT industry : কপালে পড়ছে চিন্তার ভাঁজ। উৎসব, আনন্দ, আলোর রোশনাইয়ের মধ্যেও মনে হচ্ছে বারবার, চাকরিটা থাকবে তো?

এই ব্যবস্থার ফলে একটি বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, রাষ্ট্র নিজেই যদি সত্যের একমাত্র নির্ধারক হয়ে ওঠে, তাহলে ভিন্নমত বা সরকারের সমালোচনা কি আর নিরাপদ থাকবে? কারণ, কোনো পোস্ট বা খবরকে ‘ভুল’ বলে ঘোষণা করা হলে সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলিকে তা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করা হবে। না হলে তাদের আইনি সুরক্ষা তুলে নেওয়া হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলির সামনে কঠিন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। তারা হয় সরকারের নির্দেশ মেনে চলবে, নয়তো আইনি ঝুঁকি নেবে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তারা আগেভাগেই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার পথ বেছে নিতে পারে। এটিই ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্ম দেয়। সরাসরি সরকার কনটেন্ট না মুছলেও, ভয় বা চাপের কারণে প্ল্যাটফর্ম নিজেই তা সরিয়ে দেয়।

এই আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রভাব আরও গভীর। শুধু প্ল্যাটফর্ম নয়, সাধারণ ব্যবহারকারীরাও তখন নিজের মত প্রকাশ করতে ভয় পেতে শুরু করেন। তারা ভাবতে থাকেন, কোনো পোস্ট করলে তা সমস্যা তৈরি করতে পারে কি না। ধীরে ধীরে মানুষ নিজেরাই নিজেদের চুপ করিয়ে দেয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
কতটা নিরাপদ আইটির চাকরি! চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল ফেসবুক, টুইটার, বাইজুস, হটস্টারের ছাঁটাই

IT Layoff in 2022-2023: শুধুমাত্র টুইটার থেকেই এখনও অবধি ৩৭০০ জনকে পিঙ্ক স্লিপ ধরানো হয়েছে। টুইটারের পাশাপাশি সান প্রিন্টেড ফার্ম স্ট্রাইপ তাদের প্রায় ১০৫০ কর্মীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে।

আইটি রুলসের সমর্থকেরা অবশ্য ভিন্ন যুক্তি দেন। তাদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া আজ ভুয়ো খবর, গুজব এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সরকারের কিছু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।

কিন্তু সমালোচকদের মতে, সমস্যার সমাধান হিসেবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরও বড় সমস্যা তৈরি করছে। কারণ, এই নিয়মগুলিতে ‘ভুল তথ্য’ বা ‘বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট’-এর স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। ফলে এই শব্দগুলি খুব সহজেই অপব্যবহার করা যেতে পারে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নিয়মগুলি সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নয়, প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে। ফলে এতে গণতান্ত্রিক পর্যালোচনার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই ধরনের সিদ্ধান্ত আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত ছিল।

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(a) ধারা, যা নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়। যদিও এই স্বাধীনতা সম্পূর্ণ নয় এবং কিছু যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও সেই সীমাবদ্ধতা আরোপ করার জন্য স্পষ্ট আইন এবং নির্দিষ্ট কারণ থাকা প্রয়োজন।

আইটি রুলসের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে, এই সীমাবদ্ধতা কি সত্যিই ‘যুক্তিসঙ্গত’? নাকি তা অতিরিক্ত এবং অস্পষ্ট? কারণ, যদি সরকার নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় কোন তথ্য গ্রহণযোগ্য, তাহলে তা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করতে পারে।

এখানে আরও একটি বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতার অভাব। কোন কনটেন্ট কেন সরানো হলো, সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো, এই প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নয়। ফলে নাগরিকদের কাছে এই ব্যবস্থা অনেক সময় একতরফা এবং অস্বচ্ছ বলে মনে হয়।

লিখেছেন
inscript
inscript
16 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

এসআইআর বির্তক: যে খবর স্বাভাবিক হওয়ার কথা, সেটাই আজ বিস্ময়

Gyanesh Kumar, SIR and Election Commission: এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন প্রক্রিয়া চালানো হল? জ্ঞানেশ কুমার কীভাবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হলেন? ২০২৩ সালে আইন বদলে প্রধান বিচারপতিকে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে সরানো হল কেন? এতদিন এই প্রশ্নগুলি গণমাধ্যম তুলল না কেন?

এসআইআর: বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরির নামে যা পেল বাঙালি

Real Effect of SIR in bengal: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গে ৯১ লক্ষ ভোটার বাদ যান, যারা ছিলেন মোট ভোটারের ১২ শতাংশ। যাদের মধ্যে ৩৪% ছিলেন মুসলিম , নারীরা সংখ্যায় ছিলেন ৬১.৮%, এছাড়াও ছিলেন, মতুয়া ও রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষেরা, যারা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফর্ম-৭-এর অপব্যবহার, অ্যালগরিদম-নির্ভর যাচাই, ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে ১ লক্ষ মামলা, সব মিলিয়ে ২০২৬-এর ভোটে যোগ্য নাগরিকরাও বাদ পড়েছিলেন।

‘সব নির্বাচনেই কারচুপি’, কেন এমন দাবি রাহুল গান্ধীর?

Rahul Gandhi election rigging claim: রাহুল গান্ধী কেন দাবি করলেন, ভারতের সব নির্বাচনেই কারচুপি হচ্ছে? নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কী প্রশ্ন তুলেছেন তিনি? সরকারবিরোধী মনোভাব বা অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি কীভাবে ভোটের রাজনীতিতে কাজ করে? তাঁর অভিযোগের পক্ষে কী কী তথ্য ও প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে?

সিজেপির তিন দাবি, জ্ঞানেশ কুমার না সরলে ফের বড় আন্দোলন

Election Commission of India: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, নির্বাচন পরিচালনার পদ্ধতি এবং ২০২৩ সালের আইনের বৈধতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি জানিয়েছে সিজেপি। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্থগিত করা এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংক্রান্ত আইন প্রত্যাহার।

থানার গেটেই মারধর প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে, সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদ?

Humayun Kabir: ঘটনার পর এখনও পর্যন্ত তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারেননি বলেও জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতার কারণে তখন অভিযোগ করা সম্ভব হয়নি। সুস্থ হয়ে তিনি লিখিত অভিযোগ করবেন।

দুই কমিশনারের আপত্তিতে ফের আলোচনায় সীমা খান্না, কমিশনে ঠিক কী দায়িত্ব তাঁর?

Seema Khanna and ECINet: ভোটার তালিকা ও ইসিআইনেট (ECINet) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তিতে সামনে এসেছে আইটি বিভাগের ভূমিকা এবং ডিরেক্টর জেনারেল (IT) সীমা খান্নার নাম। কে এই সীমা খান্না? নির্বাচন কমিশনে তাঁর দায়িত্ব কী? ভোটার তালিকা পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েই বা কেন উঠছে প্রশ্ন?

সরকারকে ৪ দিনের সময়সীমা বেধে দিল চা-শ্রমিকরা, ঠিক কী কী দাবি?

Dooars tea workers: ২২ সেপ্টেম্বর বকেয়া মজুরি ও অন্যান্য পাওনা মেটানোর দাবিতে হাঁটাপাড়া, ধুমচিপাড়া ও গারগান্ডার চা-শ্রমিকরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে পদযাত্রা শুরু করেন। একই দিনে তোর্সার প্রস্তাবিত ল্যান্ড পোর্ট প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষও জমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে পদযাত্রা করেন। দুই পদযাত্রাই পুলিশ আটকে দেয়।

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।