আইটি রুলস: সোশ্যাল মিডিয়ায় আর সরকারের সমালোচনা করা যাবে না?
India IT Rules: আইটি রুলস সংশোধনের পর সরকার কি সত্য-মিথ্যার একমাত্র নির্ধারক হয়ে উঠছে? ভুয়ো খবর ঠেকানোর নামে কি বাড়ছে নিয়ন্ত্রণ? নাকি এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাই নিশ্চিত হবে?
ডিজিটাল যুগে সামাজিক মাধ্যম মানুষের মতামত প্রকাশের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকা উচিত, এই প্রশ্নটাই এখন উঠেছে। ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০-এর ভিত্তিতে তৈরি হওয়া আইটি রুলস মূলত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তৈরি। এর লক্ষ্য ছিল ভুয়ো খবর, ঘৃণাত্মক বক্তব্য বা ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নিয়মগুলির সংশোধন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে নিয়ন্ত্রণ আর সুরক্ষার সীমারেখা ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।
২০২১ সালের আইটি রুলস এবং তার পরবর্তী সংশোধনগুলিতে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিকে আরও বেশি দায়বদ্ধ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীদের পোস্ট করা কনটেন্ট নিয়ে অভিযোগ এলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে, এমনকী প্রয়োজনে সেই কনটেন্ট মুছেও ফেলতে হবে। যদি তারা তা না করে, তাহলে তারা আইনি সুরক্ষা হারাতে পারে, এবং এর জন্য তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
এখানেই মূল বিতর্কের সূত্রপাত। কারণ, এই নিয়মগুলির মাধ্যমে সরকার শুধু প্ল্যাটফর্মগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করছে না, কোন তথ্য সত্য আর কোনটি মিথ্যা, সেটিও নির্ধারণ করার ক্ষমতা নিজের হাতে নিচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের সংশোধনে একটি ‘ফ্যাক্ট চেক ইউনিট’-এর কথা বলা হয়েছে, যা সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত যে কোনো তথ্যকে ‘ভুল’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে চিহ্নিত করতে পারে।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Layoff job is IT industry : কপালে পড়ছে চিন্তার ভাঁজ। উৎসব, আনন্দ, আলোর রোশনাইয়ের মধ্যেও মনে হচ্ছে বারবার, চাকরিটা থাকবে তো?
এই ব্যবস্থার ফলে একটি বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, রাষ্ট্র নিজেই যদি সত্যের একমাত্র নির্ধারক হয়ে ওঠে, তাহলে ভিন্নমত বা সরকারের সমালোচনা কি আর নিরাপদ থাকবে? কারণ, কোনো পোস্ট বা খবরকে ‘ভুল’ বলে ঘোষণা করা হলে সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাগুলিকে তা সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করা হবে। না হলে তাদের আইনি সুরক্ষা তুলে নেওয়া হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলির সামনে কঠিন পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। তারা হয় সরকারের নির্দেশ মেনে চলবে, নয়তো আইনি ঝুঁকি নেবে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই তারা আগেভাগেই কনটেন্ট সরিয়ে ফেলার পথ বেছে নিতে পারে। এটিই ‘সেলফ-সেন্সরশিপ’ বা আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্ম দেয়। সরাসরি সরকার কনটেন্ট না মুছলেও, ভয় বা চাপের কারণে প্ল্যাটফর্ম নিজেই তা সরিয়ে দেয়।
এই আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রভাব আরও গভীর। শুধু প্ল্যাটফর্ম নয়, সাধারণ ব্যবহারকারীরাও তখন নিজের মত প্রকাশ করতে ভয় পেতে শুরু করেন। তারা ভাবতে থাকেন, কোনো পোস্ট করলে তা সমস্যা তৈরি করতে পারে কি না। ধীরে ধীরে মানুষ নিজেরাই নিজেদের চুপ করিয়ে দেয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
IT Layoff in 2022-2023: শুধুমাত্র টুইটার থেকেই এখনও অবধি ৩৭০০ জনকে পিঙ্ক স্লিপ ধরানো হয়েছে। টুইটারের পাশাপাশি সান প্রিন্টেড ফার্ম স্ট্রাইপ তাদের প্রায় ১০৫০ কর্মীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে।
আইটি রুলসের সমর্থকেরা অবশ্য ভিন্ন যুক্তি দেন। তাদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া আজ ভুয়ো খবর, গুজব এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারের বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে তা সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সরকারের কিছু হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।
কিন্তু সমালোচকদের মতে, সমস্যার সমাধান হিসেবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আরও বড় সমস্যা তৈরি করছে। কারণ, এই নিয়মগুলিতে ‘ভুল তথ্য’ বা ‘বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট’-এর স্পষ্ট সংজ্ঞা নেই। ফলে এই শব্দগুলি খুব সহজেই অপব্যবহার করা যেতে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই নিয়মগুলি সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে নয়, প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে কার্যকর করা হয়েছে। ফলে এতে গণতান্ত্রিক পর্যালোচনার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সমালোচকদের মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এই ধরনের সিদ্ধান্ত আরও স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হওয়া উচিত ছিল।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(a) ধারা, যা নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেয়। যদিও এই স্বাধীনতা সম্পূর্ণ নয় এবং কিছু যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও সেই সীমাবদ্ধতা আরোপ করার জন্য স্পষ্ট আইন এবং নির্দিষ্ট কারণ থাকা প্রয়োজন।
আইটি রুলসের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠছে, এই সীমাবদ্ধতা কি সত্যিই ‘যুক্তিসঙ্গত’? নাকি তা অতিরিক্ত এবং অস্পষ্ট? কারণ, যদি সরকার নিজেই সিদ্ধান্ত নেয় কোন তথ্য গ্রহণযোগ্য, তাহলে তা গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করতে পারে।
এখানে আরও একটি বড় সমস্যা হলো স্বচ্ছতার অভাব। কোন কনটেন্ট কেন সরানো হলো, সেই সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো, এই প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নয়। ফলে নাগরিকদের কাছে এই ব্যবস্থা অনেক সময় একতরফা এবং অস্বচ্ছ বলে মনে হয়।






