সাফাইকর্মী থেকে ব্যাঙ্কের শীর্ষপদে, প্রতীক্ষার লড়াইয়ের গল্প যেন রূপকথা
এ যেন স্বপ্নের উড়ান! ২০ বছর বয়সে সাফাইকর্মী হিসেবে স্বামীর মৃত্যুর পর স্টেট ব্যাঙ্কে তাঁর পথচলা শুরু হয়। তখন হয়তো তিনি কল্পনাও করতে পারেননি, ৩৭ বছর পর এখানেই শীর্ষপদে বসবেন।

কুর্নিশ দিয়ে শুরু হোক এই সাফল্যের আখ্যান। লড়াইয়ের নাম প্রতীক্ষা টান্ডওয়ালকার।
এককথায় যেন কোনও রূপকথার গল্পের প্লট। তাঁর সাফল্যের খতিয়ান তুলে ধরতে প্রথমে খানিকটা ঝটকা লাগতে পারে যে কারও। কারণ সাধারণ সাফাইকর্মীর চাকরি থেকে লড়াইয়ের লম্বা পথ পরিক্রমা করে এসবিআইয়ের মতো ব্যাঙ্কের একটি শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার। লড়াই যতই কঠিন হোক, পরিবারের মুখ চেয়ে তিনি তা সফল করেছেন। দেশের লড়াইয়ের ইতিহাসে লিখে দিয়েছেন এক প্রেরণার অধ্যায়।
১৬ বছর বয়সে দশম শ্রেণির পরীক্ষা দেওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায় প্রতীক্ষার। বন্ধ হয় পড়াশোনা। স্বামী সদাশিব কুন্ডু এসবিআইয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী ছিলেন। বিয়ের চার বছরের মধ্যে একটি দুর্ঘটনায় মৃত্য হয় তাঁর। এরপর ব্যাঙ্কের নিয়ম অনুযায়ী সাফাইকর্মীর কাজ পান তিনি। চাকরি নিতেই হতো, কারণ ততদিনে এক পুত্রসন্তানের মা তিনি। ছোটবেলা থেকে বই পড়তে ভালবাসতেন প্রতীক্ষা। তাছাড়া বিপদের দিনগুলোতে সকলকে পাশে পাননি, তবে আবার অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। সেই কারণে একের পর এক হার্ডল ডিঙোতে পেরেছিলেন।
প্রথম জীবন ও লড়াই
১৯৬৪ সালে পুনেতে জন্ম হয় প্রতীক্ষার। ১৬ বছর বয়সে ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, বসতে হলো বিয়ের পিঁড়িতে। তারপর ছেদ পড়ল পড়ায়। ছেলে বিনায়কের জন্মের পর তাঁর স্বামী মুম্বই থেকে গ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর দুর্ঘটনায় স্বামীর মৃত্যুতে জীবন পাল্টে গেল। স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি সম্পূর্ণ একা হয়ে গেলেন। বুঝতে পারলেন, জীবন কত কঠিন। পুনের এই সাদাসিধে মেয়েটার সামনে তখন অথৈ সাগর। ছেলেকে নিয়ে শুরু হলো নতুন জীবনের লড়াই।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিনের ইয়াং হুইয়ানকে টপকে বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে ধনী মহিলা সাবিত্রী জিন্দাল। শুক্রবার ব্লুমবার্গের প্রকাশিত ইনডেক্স অনুযায়ী সাবিত্রী জিন্দাল এশিয়া তথা ভারতের ধনীতম মহিলা এবং দেশের ধনকুবেরদের তালিকায় দশ নম্বরে রয়েছে তাঁর নাম।
ভয় না পেয়ে মুখোমুখি হলেন এসবিআই কর্তাদের। সাফাইকর্মীর কাজ শুরু করে দেন। চাকরি পেলেও তা অস্থায়ী। যে-কোনও মুহূর্তে চলে যাওয়ার আশঙ্কা। সেই ভয় থেকেই ফের একবার পড়াশোনা শুরু করেন। কাজের ফাঁকে প্রতীক্ষা সেরে নিতেন পড়া।
পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি
তাঁর জীবনের সত্যি এটাই হয়ে উঠেছিল যে, শিক্ষাই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র বিকল্প পথ। আর তাই প্রতীক্ষা কাজের ফাঁকে দিনরাত পড়াশোনা চালিয়ে যান। ক্লাস ১০-এর পরীক্ষাতে বসেন তিনি। রেজাল্ট বের হতেই সবাই চমকে যান। এরপর ব্যাঙ্কের নিম্ন পদে চাকরি। ঝাড়ু দিতে হয় না বটে, তবে লড়াই থামেনি। চলল আরও পড়াশোনা। স্কুল থেকে কলেজে গেলেন। স্টেট ব্যাঙ্কে কেরানির পদে চাকরি পান। এরপর গ্র্যাজুয়েট। ফের পদোন্নতি। এরপর ব্যাঙ্কের পরীক্ষায় বসে সবাইকে চমকে দেন প্রতীক্ষা। প্রথম চেষ্টাতেই ট্রেনি অফিসার। এরপর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি প্রতীক্ষাকে। গোলপোস্টের খুব কাছে পৌঁছে গেছেন ততক্ষণে। হয়ে গেলেন ব্যাঙ্কের সেই শাখার অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল পদ। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া-র মুম্বই শাখাতে তাঁর পোস্টিং হওয়ার কথা। একজন সাফাইকর্মী থেকে ব্যাঙ্কের শীর্ষপদে পৌঁছনো আপাতভাবে অনুপ্রেরণা দিলেও, সহজ ছিল না কঠিন হার্ডলগুলো টপকানো। স্বপ্নময় যাত্রাকে সত্যি করতে যে কঠিন পরিশ্রম করেছেন, তা সার্থক হয়েছে অবশেষে। সমাজ তাঁকে ভরিয়ে দিয়েছে ঐকান্তিক কুর্নিশ আর স্যালুটে।
পরিবারের সমর্থনই পুঁজি
সালটা ১৯৯৩। প্রতীক্ষা সিদ্ধান্ত নিলেন দ্বিতীয়বার বিয়ে করবেন প্রমোদ টন্ডওয়ালকারকে। একদিন অন্ধ সমাজ আর দারিদ্র পড়ায় ইতি টেনে তাঁকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য করেছিল। আজ তিনি স্বাধীন। নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেন তিনি। প্রমোদ ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। তাঁর সমর্থন পেয়েই তিনি ব্যাঙ্কের পরীক্ষা দেন ও সফল হন। তাঁর দুই সন্তান। তাদের দেখাশোনা করেন প্রমোদ। প্রতীক্ষা বলেন যে, তিনি জীবনে পরিবারের অফুরান সাহায্য পেয়েছেন। তাঁর স্বামী তাঁকে পড়ার টেবিলে চায়ের কাপটা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে বিনায়ক মার পাশ থেকে সরে যাননি। মাকে পড়াশুনো করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ২০০৪ সালে পরিবারের সাহায্য নিয়েই তিনি ট্রেনি অফিসার হন। তারপর একে একে উত্তরণ।
আরও পথ চলা বাকি
প্রতীক্ষার এখন ২ বছর বাকি আছে কর্মজীবনের। তারপর অবসর। এজিএম হওয়ার পর হয়তো ব্যাঙ্ক-কে বেশিদিন পরিষেবা দিতে পারবেন না, কিন্তু ৩৭ বছর ধরে এই প্রতিষ্ঠানের নানা উত্থানপতনের সঙ্গে জড়িয়ে তিনি। আগামী দিনেও জড়িয়ে থাকতে চান এঁদের সঙ্গে। ২০২১ সালে তিনি নেচারোপ্যাথি নিয়ে কোর্স করেছেন। এর ব্যবহার এবং কার্যকারিতা সম্পর্কে অবসরের পরেও সহকর্মীদের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিতে চান। চোখের জল আটকে রাখতে না পেরে বললেন, "পিছনের দিকে তাকালে মনে হয়, একসময়ে এটা অসম্ভব ছিল। আমি আনন্দিত, লড়াইয়ের শেষে সাফল্য এসেছে। তবে এই সাফল্য এসেছে পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে। তাঁদের বাদ দিয়ে এক পা-ও চলতে পারতাম না।"
এ যেন স্বপ্নের উড়ান! ২০ বছর বয়সে সাফাইকর্মী হিসেবে স্বামীর মৃত্যুর পর স্টেট ব্যাঙ্কে তাঁর পথচলা শুরু হয়। তখন হয়তো তিনি কল্পনাও করতে পারেননি, ৩৭ বছর পর এখানেই শীর্ষপদে বসবেন।
কতটা পথ পেরোলে তবে পথিক বলা যায়...
প্রশ্নগুলো সহজ, আর উত্তরও তো জানা
না, এতটা সহজ ছিল না সেদিনের সেই উত্তর। অনেক লড়াইয়ের পর সাফল্যের ঠিকানা পেয়েছেন প্রতীক্ষা। তাই তো তিনি এক জয়যাত্রার নাম।
















