কোরানের বদলে পড়া হয় গঙ্গাস্তব! সম্প্রীতির চিহ্ন বুকে আজও দাঁড়িয়ে বাংলার এই মসজিদ
Jafar Khan Gaji Dargah: যিনি গঙ্গাস্তব পাঠ করেন, তিনি মসজিদও বানান, শুনতে অবাক লাগলেও তাই সম্ভব হয়েছিল সেকালে হুগলির ত্রিবেণীতে।

বাংলার ইতিহাসে হাত ধরে থাকে সম্প্রীতি ও সমন্বয়। সেকথা বারে বারে প্রমাণিত হয়েছে। যত অতীতের দিকে তাকানো যায়, দেখা যায় সমন্বয় আমাদের চিহ্ন। যে মানুষ বাংলার বুকে প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন, তিনিই আবার পুজো করতেন গঙ্গাদেবীরও। হ্যাঁ, বাংলার মাটি এমন বৈচিত্র্যেরই সাক্ষ্য বহন করে চলছে আজও। কলকাতা থেকে প্রায় ৭০ কিমি দূরে হুগলি জেলার ত্রিবেণী। এই ত্রিবেণীর ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। এক সময় কত মোটঘাট নিয়ে জাহাজ এসে ভিড়ত ত্রিবেণীর ভাগীরথীতে। আসতেন বিদেশি বণিকরা। আসত তুর্কি, পাঠান, মোগল, পর্তুগিজ, ইংরেজ- আরও কত কে। কতই না ওঠা-পড়া দেখেছে এই নদী। তারমধ্যে অন্যতম হলো ত্রিবেণীর তীরে অবস্থিত জাফর খাঁ গাজি দরগা।
কে জাফর খাঁ গাজি?
ত্রিবেণীরই প্রথম মুসলমান শাসনকর্তা জাফর খাঁ গাজি। ১২৯৮ থেকে ১৩১৩– দীর্ঘ পনেরো বছর শাসন করেন তিনি। ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলার সর্বপ্রাচীন মসজিদ, যা ‘জাফর খাঁ গাজির মসজিদ' নামে পরিচিত। তার হাত ধরেই বাংলায় তুর্কি আমল শুরু হয়।
কিন্তু জাফর খাঁ-র এই মসজিদ তৈরি নিয়ে নানা মুনির নানা মত। সময়টা ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ দিক, আজ থেকে প্রায় ৭০০ বছর আগের কথা। মুঘল সম্রাটরা তখনও বাংলায় পা ফেলেনি। ত্রিবেণীর হিন্দু রাজার রাজত্বে এক মুসলমান প্রজার বাড়িতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান। একটি গরুকে কুরবানি দেওয়া হয়েছে। ব্যস, হিন্দু রাজা তাই শুনে শাস্তির বিধান দিলেন মুসলিম প্রজাকে। আর প্রজাটিও বাধ্য হয়ে নালিশ জানালেন খোদ দিল্লির বাদশাহ ফিরোজ শাহ-র কাছে। নালিশ শোনামাত্র বাদশাহ বিরাট সেনাবাহিনী পাঠালেন বদলা নিতে। শুরু হলো দিল্লি-বাংলা কোন্দল। শোনা যায়, আজকের হুগলি জেলার ত্রিবেণীর অদূরেই হয়েছিল সেই যুদ্ধ। হিন্দু রাজা বনাম মুসলিম সেনানায়ক জাফর খাঁ গাজি। যুদ্ধে অবশ্য হার হয়েছিল হিন্দুদের। বিজয়ের পর শাসকের পদে বসেছিলেন জাফর খাঁ। এই অবধি সবই ঠিকঠাক। কিন্তু যুদ্ধজয়ের মহিমা লোকজনকে না জানালে রাজার মন কি শান্ত হয়! জাফর খাঁ-ও তার ব্যতিক্রম নন। আজও হুগলি জেলার ত্রিবেণীতে গেলে দেখতে পাওয়া যাবে, জাফর খাঁ গাজি-র নামাঙ্কিত সেই মসজিদ। মসজিদের সামনে বসানো আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র বোর্ড। বোর্ডের দিকে তাকালেই জানা যাবে, সে-দিনের যুদ্ধজয়ী মুসলমান সেনাপতির বানানো মসজিদটি তৈরি হয়েছিল ১২৯৮ সালে। আর সংলগ্ন দরগা, যেখানে আজও জাফর খান এবং তাঁর ছেলে-নাতি, এমনকী, পুত্রবধূরও কবর দেখতে লোকে ভিড় করে, তা গড়ে উঠেছিল ১৩১৫ সালে। ইতিহাস বলছে, এটাই অবিভক্ত বাংলার প্রাচীনতম মসজিদ। তবে এই মসজিদের প্রধান আকর্ষণ কিন্তু অন্য। মসজিদের গায়ে খোদাই করা রয়েছে সংস্কৃত ভাষায় লিখিত শিলালিপি এবং অসংখ্য দেব-দেবীর মূর্তি।
মসজিদের গঠন এবং কাহিনি
বহুকাল ধরেই ভারতে হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায় একসঙ্গে বসবাস করেছে। আর এই সম্প্রীতির আঁচ ইতিহাসের পাতাতেও লেগেছে। ঐতিহাসিকরা মনে করেন জাফর খাঁ গাজি-র এই মসজিদটি ভগবান বিষ্ণুর মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিকগণ সেই স্থানে এখনও অবধি কোনও বিষ্ণু মন্দিরের চিহ্ন খুঁজে পায়নি।
মসজিদের স্থাপত্য অনেকটা বাংলার মন্দিরের মতো। আজও দেখা যায়, মসজিদের গায়ে টেরাকোটার কাজ। গঙ্গার তীরে বিশাল একটি উঁচু স্তূপের ওপর জাফর খাঁ-র সমাধি ও মসজিদ প্রতিষ্ঠিত। জাফর খাঁ-র সমাধি ও মসজিদের এলাকার মধ্যে প্রবেশ করলে চারদিকে ছড়ানো অজস্র পাথরের খণ্ড দেখা যায়, এমনকী, দেওয়ালের গায়েও পাথরের খণ্ডগুলোকে গাঁথা অবস্থায় দেখা যায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে এর প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেই ডানপাশে সমাধিস্তম্ভ দেখা যায় এবং সামনে কয়েক গজ দূরে সাত গম্বুজবিশিষ্ট জাফর খাঁ-র মসজিদ দেখা যায়। সমাধিটি দুইভাগে ভাগ করা, পূর্বভাগে জাফর খাঁ, তাঁর পুত্র ও পুত্রবধূ এবং পশ্চিমভাগে বড় খাঁ গাজি ও তাঁর পুত্ররা সমাধিস্থ।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kalipuja history: পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি ডাকাত কালীপুজোর কথা জানা যাক আজকে।
জাফর খাঁ-র সমাধিগৃহের চারটি দরজা, যার প্রত্যেক দরজাতে হিন্দু ভাস্কর্যর পর্যাপ্ত নিদর্শন রয়েছে। দরজার দুইপাশে নিচের দিকে ছোট ছোট মন্দিরের মধ্যে দণ্ডায়মান দেবীমূর্তি এবং তার পাশে দু'টি যক্ষমূর্তি খোদাই করা অবস্থায় দেখা যায়। সমাধির বাইরের দেওয়ালে বড়-বড় পাথরখণ্ডের ওপরে সারি-সারি প্যানেলের মতো বিষ্ণুমূর্তি, নবগ্রহ মূর্তি, ফুল-লতা-পাতা ইত্যাদি খোদাই করা আছে। আরও একটা বৈশিষ্ট্য দেখা যায়– দেবদেবীর মূর্তি-খোদাই-করা পাথরের প্যানেলগুলির প্রায় সবই উল্টোভাবে গাঁথা হয়েছে। বিষ্ণুমূর্তির শ্রেণি, নবগ্রহ ও অন্যান্য মূর্তি-খোদিত প্যানেল অধিকাংশ উল্টানো, এখানে বড় বড় দেবদেবীর মূর্তি পিছন ফিরিয়ে, অর্থাৎ উল্টো করে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। দেওয়ালের গায়ে, বিশেষ করে মসজিদের ভেতরের দেওয়ালে এরকম একাধিক মূর্তির নিদর্শন লক্ষ করা যায়, প্রার্থনা-কক্ষের আশেপাশে অনেক মূর্তির পিছন দিকে লিপিও খোদাই করা হয়েছে।

নানা শিলালিপি খোদাই এই দরগাজুড়ে
বড় খাঁ গাজি-র সমাধির অভ্যন্তরে কয়েকটি প্রাচীন লিপির সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রায় একশো বছর আগে মণিসাহেব ত্রিবেণী দরগা পরিদর্শন করতে গিয়ে বাংলা অক্ষরেই খোদাই করা এই লিপিগুলির সন্ধান পান। এইসব টুকরো টুকরো লিপি থেকে বোঝা যায় যে, জাফর খাঁ-র সমাধিটি পূর্বে একটি বিষ্ণুমন্দির ছিল। মন্দিরের গায়ে রামায়ণ ও মহাভারতের অসংখ্য চিত্রাবলি খোদাই করা আছে। রাম-রাবণের যুদ্ধের দৃশ্য, বস্ত্রহরণের দৃশ্য ইত্যাদি। কিন্তু এখানে শুধু একটি বিষ্ণুমন্দির ছিল বলে মনে হয় না। মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ, যা মসজিদ ও সমাধি স্তম্ভের ওখানে দেখা যায় তা থেকে মনে হয়, এখানে একাধিক মন্দির ছিল, বিষ্ণুমন্দির, সূর্যমন্দির, শিবমন্দির ইত্যাদি। তীর্থস্থান ত্রিবেণীতে এই স্থানটিই ছিল আসল তীর্থক্ষেত্র এবং গঙ্গার তীরে বলে উঁচু টিলার মতো স্থানে দেবালয়গুলি গড়া হয়েছিল।
ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর মূর্তি বা দেবালয়ের ভাস্কর্যের নিদর্শন ছাড়াও ত্রিবেণীর মসজিদের স্তম্ভগাত্রে ভূমিস্পর্শ মুদ্রাবিশিষ্ট বুদ্ধমূর্তি খোদিত রয়েছে দেখা যায়। মসজিদের মধ্যে দু'টি করে স্তম্ভের সারি আছে, প্রত্যেক সারিতে ছয়টি করে স্তম্ভ। এই স্তম্ভের মধ্যে একটিতে বুদ্ধমূর্তি খোদিত আছে। অন্যান্য স্তম্ভের তুলনায় এই স্তম্ভটির বৈশিষ্ট্যও আছে। অন্যান্য স্তম্ভের মতো অষ্টকোণাকার বা ষষ্ঠ-কোণাকার নয়, বরং এটি চতুষ্কোণার স্তম্ভ। বুদ্ধমূর্তির এই নিদর্শন ছাড়াও জৈনমূর্তির নিদর্শনও এখানে পাওয়া গেছে। বড় খাঁ গাজির সমাধির দক্ষিণদ্বারের পাশে আরবি ভাষায় লেখা একটি পাথরের খণ্ড আছে। তার অপর পার্শ্বে একটি মূর্তির চিহ্ন দেখা যায়। সেখানে পাদদ্বয় ও পিছনের নাগের কুণ্ডলী ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। বৌদ্ধ ও জৈনমূর্তির এইসব নিদর্শন দেখে মনে হয় ত্রিবেণীতে ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর মন্দির ছাড়াও বৌদ্ধ ও জৈন দেবদেবীর মন্দিরও ছিল।

জাফর খাঁ গাজি দরগায় গাজির কুড়ল
জাফর খাঁ-র সমাধির পূর্বদিকে পাথরসংলগ্ন একটি লৌহখণ্ড আছে, স্থানীয় লোকেরা তাকে ‘গাজির কুড়ল’ বলে। গাজির কুড়ল নড়েচড়ে, কিন্তু পড়ে না। সিংহবিক্রম জাফর খাঁ যে তরবারি ও বর্শা নিয়ে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, গাজির কুড়ল তারই স্মৃতি বহন করছে। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের কাছে আজ জাফর খাঁ ও তাঁর বংশধররা দেবতার মতো পুজো পান। আবার বলা হয়, এই মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই নাকি ছিলেন গঙ্গাদেবীর একনিষ্ঠ ভক্ত। এ যেন এক অপূর্ব সমন্বয়। কিন্তু গল্প নয়, আসলে তা সত্যিই। কিংবদন্তি অনুযায়ী, জাফর খাঁ-র তৃতীয় পুত্র বড় খাঁ গাজি হুগলির এক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। সেই মেয়ে ছিল দেবী গঙ্গার ভক্ত। শোনা যায়, পুত্রবধূর সাহচর্যে সিংহবিক্রম জাফর খাঁ-ও নাকি গঙ্গাদেবীর মূর্তি দর্শন করে মুগ্ধ হয়ে গিয়ে কোরানের বদলে সংস্কৃত ভাষায় গঙ্গাস্তোত্র আবৃত্তি করেছিলেন। এক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্তোত্রটি এই-
সুরধুনি মুনিকন্যে তারয়েঃ পুণ্যবন্তং সা তরতি নিজ পুণ্যৈস্তত্র কিস্তে মহম্।।
যদি চ গতিবিহীন তারয়েঃ পাপিনং মাম্ তদপি তব মহত্ত্বং তন্মহত্ত্ব মহম্।।
কোরানের বদলে গঙ্গাস্তব। ভাবা যায়! ধর্মযোদ্ধা গাজি বাংলার মাটিতে এইভাবেই এক ধর্মের সঙ্গে অন্য ধর্মের সমন্বয় করে নিয়েছেন। বাঙালির ধর্ম ও সংস্কৃতির এইটাই প্রধান বিশেষত্ব।
যিনি গঙ্গাস্তব লেখেন বা পাঠ করেন, তিনি মসজিদও বানান, শুনতে অবাক লাগলেও সেই জিনিসই সম্ভব হয়েছিল সেকালে হুগলির ত্রিবেণীতে। গঙ্গার শীতল হাওয়া, নদীতীরের মনোরম পরিবেশ- এসবই যেন বিবশ করে দিয়েছিল সেনাপতি জাফর খাঁ-কে। পরবর্তীকালে এক হিন্দু রাজার সঙ্গে যুদ্ধে মারা যান তিনি। তারপর তাকে এই মসজিদেই সমাধিস্থ করা হয়। ৭২৪ বছরের পুরনো মসজিদ এখনও বর্তমান। আজও স্থানীয় মুসলমানরা প্রার্থনা করেন এখানে, পথচলতি হিন্দুরাও মাথা ঠেকান দরগায়। যেন ইতিহাসের দলিল হয়ে থেকে গেছে বাংলার প্রথম মসজিদ। মানুষটা যুদ্ধ করতে এসেছিলেন, কিন্তু ছেদ পড়েনি তাঁর গঙ্গাপাড়ের সফরে। থেকে গেছেন ত্রিবেণীর মসজিদেই। ত্রিবেণীর গঙ্গা যেন আজও ঢেউ উঁচিয়ে প্রণাম জানাচ্ছে বাংলার প্রথম মসজিদকে।
কীভাবে যাবেন: হাওড়া-কাটোয়া লাইনের ট্রেন ধরে ত্রিবেণী স্টেশনে নামুন। সেখান থেকে অটো বা টোটো ধরে পৌঁছে যেতে পারেন জাফর খাঁ গাজি-র দরগায়।
















