সিনেমাও ফেল, প্রাক্তনের সঙ্গে জনি ডেপের মামলা এই শতকের সেরা ট্রায়াল

মিথ্যে কথা মানুষ বলে যখন তখন। বস্তুত এক কালে মনে করা হত, পশুপাখিদের থেকে মানুষের মস্তিষ্কের প্রধান পার্থক্য মানুষ মিথ্যে বলতে পারে। কারণ সত্যি বলার থেকে মিথ্যে বলার পদ্ধতি অনেকটাই জটিল। কিন্তু ক্রমে পশুপাখিদের মধ্যেও এই ফলস্‌ সিগনাল দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। কাজেই বলা যায়, ঠকানো জীবের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। ছোট মানুষের মিথ্যে ছোট ছোট, তা অপরকে আঘাত করারও তেমন ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু তারকা জগতে ইমেজ একটি গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। কোনও কারণে তাতে আঁচ এলে বাজার তো যায়ই, কেরিয়ারও শেষ হয়ে যায়। ফলে লক্ষ হাতছানির মধ্যেও থাকতে হয় সদা সতর্ক।

এ জগতে সতর্কতা হারানো মানেই আরেকজনের ফাঁদে পড়ে তলিয়ে যাওয়া বিস্মৃতির গহিনে। তার উপর গৃহহিংসা বা যৌন-নিগ্রহ জাতীয় অভিযোগ মোটেও নিরীহ নয়। এসব ক্ষেত্রে বিচারে অপরাধী প্রমাণিত হলে শাস্তি পাওয়াই জায়েজ। কিন্তু এ ধরনের মিথ্যে অভিযোগ এনে কারোর জীবন শেষ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রও মূল অপরাধের মতোই ঘৃণ্য। কারণ সেক্ষেত্রে এই ধরনের আক্রমণের শিকার বাস্তবেই যাঁরা হয়েছেন, তাদের অপমান করা হয়। শুধু অপমান নয়, তাঁদের প্রতি অতি নিষ্ঠুর, সহানুভূতিহীন, হিংস্র ব্যবহার এই ভুয়ো মামলা। অভিযুক্তকেও ভুগতে হয় সারাটা জীবন। ফলে এইসব ক্ষেত্রে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা জরুরি হয়ে পড়ে। তখনই রুজু হয় মানহানির মামলা। জনি ডেপ এবং অ্যাম্বার হার্ডের ক্ষেত্রে যেমনটা দেখেছে দুনিয়া। আসব সে প্রসঙ্গেও। তবে আজ, আগে দেখে নেওয়া যাক বিশ্বের সেইসব তারকাদের গল্প, যাঁরা এই শতকে মানহানির মামলায় কয়েক মিলিয়নের ক্ষতিপূরণ জিতেছেন।

টম ক্রুস

টম ক্রুস বিশ্বের অন্যতম মেগাস্টার। প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয়ের জগতে রাজত্ব করছেন টম। কিন্তু বিতর্ক এড়াতে পারেননি তিনিও। অ্যাক্টুস্টার নামে একটি ফ্রেঞ্চ গসিপ ম্যাগাজিনে চ্যাড স্ল্যাটারের একটি বিবৃতি বেরোয়। চ্যাড গে পর্ন ফিল্মে কাইল ব্র্যাডফোর্ড নামে অভিনয় করতেন। তিনি দাবি করেন টম ক্রুসের সঙ্গে তাঁর যৌন সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর সেই দাবিকে সমর্থন করে ম্যাগাজিনের প্রকাশক মাইকেল ডেভিস জানান, তাঁর কাছে সেই সম্পর্কের ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। এবং উপযুক্ত টাকা পেলে তিনি সেসব মিডিয়ায় ছাড়তেও রাজি। ২০০১-এর মে মাসে চ্যাড এবং ডেভিস—দুজনের বিরুদ্ধেই ১০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে দুটি মানহানির মামলা রুজু করেন টম। সঙ্গে সঙ্গে ১৮০ ডিগ্রি পালটি খেয়ে ডেভিস বয়ান দেন, টম গে নন। তাঁর কাছে তেমন কোনও প্রমাণও নেই। তিনি মিথ্যে বলেছিলেন। প্রকাশকের উপর আনা মামলা তুলে নেন টম।

ডেভিসের সাফল্য দেখে উৎসাহিত হয়ে চ্যাডও অমন একটি বয়ান দেন অ্যাক্টুস্টারে। তাতে বলা হয় যে চ্যাড তাঁর পূর্বের বয়ান প্রত্যাহার করছেন। কিন্তু মূল অপরাধীকে ছাড়তে নারাজ টম। মামলা চলে। খুব জটিল মামলা ছিল না একেবারেই। কোর্টে চ্যাড জানান, এত টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর নেই। সর্বস্বান্ত হয়ে তাঁকে সব হারাতে হবে যদি কোর্ট ক্ষতিপূরণের রায় দেয়। তিনি জানিয়েছিলেন, “আমার পরিবার ট্রায়ালের অপমান সহ্য করুক, আমি তা একেবারেই চাই না। সত্যি বলতে কি, টমকে আমি কখনও এর আগে দেখিওনি, আর দেখা করতেও চাই না।” অথচ এ সুবুদ্ধি তার আগে হল না কেন, সেটাই ভাবায়। বোধহয় ম্যাগাজিনের কাটতি বাড়াবার লোভেই এই ফাঁদে পা দিয়েছিলেন চ্যাড। বিচারে দশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ জেতেন টম। যদিও বেশিরভাগই চ্যারিটিতে দান করে থাকেন, কিন্তু এক্ষেত্রে তাঁরা জানতেন ক্ষতিপূরণ আদায় হওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই। কিন্তু আইনত নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করা ও গুজব ছড়ানোর অপরাধীকে শনাক্ত করাকেই তাঁরা প্রয়োজন বলে মনে করেছিলেন। সে ব্যাপারে সফল হন টম।

স্কারলেট জোহানসন

ফোর্বসের তালিকা অনুযায়ী ২০১৮ এবং ২০১৯-এ অভিনেত্রীদের মধ্যে সবথেকে বেশি পারিশ্রমিক পেতেন স্কারলেট জোহানসন। এ হেন স্কারলেট কেন মামলা করলেন ডিজনির বিরুদ্ধে? কারণ ছিল। করোনাকালে সিনেমাহল চলছিল না তেমন ভাবে। বেশিরভাগ সময়েই মাল্টিপ্লেক্স গুলো বন্ধ থাকত। সে সময় বড় বড় প্রোডাকশন হাউজ গুলি হল-রিলিজের বদলে ওয়েবরিলিজের পন্থা নেয়। ব্ল্যাক উইডো একই সঙ্গে সিনেমাহলে ও ডিজনি+ নামক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পায়। করোনাকালীন সময়েও প্রথম সপ্তাহে ২১৮ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করে ছবিটি। কিন্তু তারপরেই বক্স অফিসের কালেকশন পড়তে থাকে হু হু করে। এ পর্যন্ত মোট ৩৭৮ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছে ছবিটি। ডিজনি জানায় প্রথম কুড়িদিনে স্ট্রিমিং পারচেজেও প্রায় ৬০ মিলিয়ন আয় হয়েছিল। স্কারলেটের বক্তব্য, সিনেমাহলে চলাকালীন ওটিটি রিলিজে ছবির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রচুর, তাঁদের চুক্তিতে এমন কোনও সম্ভাবনার কথা বলা হয়নি। সরাসরি চুক্তিভঙ্গ করেছে ডিজনি। এতে স্কারলেটেরও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এজন্যই ডিজনির বিরুদ্ধে চুক্তিভঙ্গের মামলা আনেন তিনি। মামলায় বলা হয়, চুক্তিতে পরিষ্কার লেখা রয়েছে ‘ব্ল্যাক উইডো’-র ‘থিয়েট্রিক্যাল রিলিজ’ হবে। অর্থাৎ স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে আসতে কমপক্ষে ৯০ দিন সময় লাগবে বলেই ধারণা তাঁর। ৫০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি। প্রথমে ডিজনি এই দাবি উড়য়ে দিতে চাইলেও পরে ৪০ মিলিয়নে রফা করতে বাধ্য হয়।

 


আরও পড়ুন-স্টারডমের দুনিয়া ক্ষমাহীন, পল্লবীদের দুঃখ বেড়ে বেড়ে ক্যানসার হয়ে ওঠে সেখানে

জনি ডেপ

এই ট্রায়ালটিকে শতকের সেরা ট্রায়াল বলা হচ্ছে, হবেও বহুদিন। প্রায় দেড় মাসের এই শুনানির নেপথ্যে রয়েছে এক জটিল কাহিনি। ২০১৬ নাগাদ অ্যাম্বার হার্ড অভিযোগ আনেন জনি তাঁকে শারীরিক নিগ্রহ করেছেন। বিষয়টি আদালতে ওঠার আগেই মিডিয়ায় খবর হয়। গৃহহিংসার অভিযোগের ভিত্তিতে জনিকে ডিভোর্স দিয়ে ৭ মিলিয়ন ডলার খোরপোশ দাবি করেন অ্যাম্বার। মিডিয়ায় বারংবার বলেন, এই টাকার বিন্দুমাত্র নিজের জন্য নয়, চ্যারিটির জন্য। কিন্তু ডেপ টাকা সরাসরি চ্যারিটিতে দিতে গেলে অ্যাম্বার জানান টাকা তাঁর অ্যাকাউন্টেই দিতে হবে। ইতিমধ্যে একটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা আনেন জনি এবং হেরে যান। পৃথিবীর কাছে জনির নির্যাতকের ভূমিকা সন্দেহাতীত হয়ে ওঠে। সবাই ছিঃ ছিঃ করতে থাকে। ভক্তেরা হতাশ হয় ভীষণ। ‘পাইরেটস্‌ অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এর সিক্যুয়েল আটকে দেওয়া হয়, ‘ফ্যান্টাস্টিক বিস্ট’ সিরিজ থেকেও বাদ পড়েন জনি। একের পর এক কাজ হাত হেকে বেরিয়ে যায়। অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ভাবে বিপুল ক্ষতিগ্রস্ত হন। অপর দিকে নির্যাতিতাদের মসিহা হিসাবে নিজেকে তুলে ধরেন অ্যাম্বার। ‘অ্যাকোয়াম্যান’ সিনেমায় প্রচুর আর্থিক লাভ হয় অ্যাম্বারের। ঘনিষ্ঠভাবে অ্যালন মাস্কের সঙ্গেও দেখা যায় তাঁকে।

ইতিমধ্যে জনি অ্যাম্বারের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেন। দাবি করেন অ্যাম্বারের সমস্ত অভিযোগ মিথ্যা। একের পর এক তথ্য প্রমাণ পেশ করতে থাকে জনির লিগ্যাল টিম। বিশেষত ক্যামিল ভ্যাস্কুয়েজ তাঁর অসাধারণ দক্ষতা নিয়ে অ্যাম্বারকে পাল্টা প্রশ্ন করেন। দেখা যায় প্রচুর ভিডিও রেকর্ডিং, অডিও রেকর্ডিং করেছেন দুজনেই। কিন্তু অ্যাম্বারের রেকর্ডিং-এও কোথাও নির্যাতন তো দূরের কথা, সেই বিষয়ে আলোচনাও করতে দেখা যাচ্ছে না খোদ অ্যাম্বারকেই। বরং দু তিনবার অ্যাম্বারেরই জনিকে নির্যাতনের ঘটনা উঠে আসছে কথোপকথনে। এই দাবি জনিও করেছিলেন। অ্যাম্বার তাঁকে নির্যাতন করেছে, করে ভুয়ো মামলা করেছে। তথ্য প্রমাণে দেখা যায় তা সত্যি।

একের পর এক জনির প্রাক্তনেরা জানান, কোনওদিনই তাঁদের সঙ্গে অশালীন ব্যবহার করেননি জনি। তাঁদের গন্তব্য দীর্ঘায়িত হয়নি, তাই আলাদা হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু জনির গৃহহিংসার কোনও ইতিহাস নেই। এমন মানুষ ৫৮ বছর বয়সে এসে নতুন করে নির্যাতন শুরু করলেন–এ ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। অপর দিকে অ্যাম্বারের কিন্তু গৃহহিংসার ইতিহাস রয়েছে। এর আগে যে মহিলার সঙ্গে থাকতেন অ্যাম্বার তিনিই এই অভিযোগ এনেছিলেন। নতুন নতুন তথ্যপ্রমাণ সামনে আসতে থাকে, যা আগের মামলায় তোলার সুযোগই দেওয়া হয়নি। গণশুনানি হওয়ায় এবার জনগণের মত পাল্টাতে থাকে। অ্যাম্বারের পক্ষে সাক্ষ্য দেয় কেবলমাত্র তার বোন। বাকি সমস্ত আগের সাক্ষীরা প্রশ্নের জালে আটকে যান বিশ্রীভাবে। এতটাই এলোমেলো তাঁদের সাক্ষ্য, যে জুরির বুঝতে বাকি থাকে না কেমন ভাবে মিথ্যের জাল বোনা হয়েছে।

রিবাটাল এবং ক্লোজিং স্টেটমেন্টের পর বেশ খানিকটা সময় নেন জুরিরা। রায় দেওয়ার দিন আবার ১৩ ঘন্টার ডেলিবারেশন। পিছিয়ে যায় রায়দানের দিন। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন দর্শকেরা। শেষ পর্যন্ত অ্যাম্বভারকে ভুয়ো অভিযোগের অপরাধে অপরাধী সাব্যাস্ত করা হয়। ৫০ মিলিয়নের দাবি করেছিলেন জনি। সেখানে ১০ মিলিয়ন ক্ষতিপূরণ বাবদ এবং ৫ মিলিয়ন জরিমানা বা পিউনিটিভ ড্যামেজের রায় আসে। সব মিলিয়ে ১৫ মিলিয়ন জেতেন জনি।

বলার অপেক্ষা রাখে না এ রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা সত্যিই ওই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন, তাঁদেরকে জিতিয়ে দিয়েছে এই রায়। যদিও অ্যাম্বার টুইটে দাবি করেছেন, সমস্ত মহিলাকেই নাকি অপমান করা হয়েছে এই রায়ে।

মনে রাখা উচিত, অডিও রেকর্ডিং-এ শোনা গিয়েছিল অ্যাম্বার জনিকে বলছেন, “যাও যাও কেস করো! গোটা পৃথিবীকে জানাও যে জনি ডেপের উপর নির্যাতন চালিয়েছে অ্যাম্বার হার্ড! দেখি, তোমার কথা কে বিশ্বাস করে! ভুলে যেওনা, তুমি একজন পুরুষ মানুষ।” এই মামলা আবারও প্রমাণ করল পুরুষ বা নারী, যে কেউই নির্যাতক হতে পারে। পুরুষ মাত্রেই ক্ষমতাশীল, নারী মাত্রেই অবলা–এধরনের  চিন্তাকাঠামো পিতৃতন্ত্রই তৈরি করে। দিনশেষে আবেগে না ভেসে গিয়ে সঠিক বিচারটা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমার আপনার সবার ক্ষেত্রেই এ নিয়ে কথাবার্তা বাড়ুক। নিঃশব্দ নির্যাতনের সুযোগ বাড়ায়। একে আঁতুড়েই মুখে নুন দিয়ে মারতে হবে। প্রকাশ্যে হোক আর্তনাদও। পৃথিবীর কোনও প্রান্তে কোনও ব্যক্তি যেন অপরের উপর ক্ষমতার আষ্ফালন না দেখাতে পারে। আসুন কথা বলি।

More Articles

;