সেতু বিপর্যয়ও টলাতে পারেনি আসন, মোরবিতে বিজেপির জয়ের মূল কাণ্ডারিকে চেনেন?
Gujarat Assembly Election 2022 : রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চালেই কার্যত কিস্তিমাত করে গেরুয়া শিবির। কান্তিলাল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মোরবিবাসী তাঁকেই মনোনীত করেন।

৩০ অক্টোবর, ২০২২। গুজরাতের মোরবি শহরের মাচ্ছু নদীর দুই তীরে তখন কাতারে কাতারে ভিড় করেছেন সাধারণ মানুষ। লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুলিস, অ্যাম্বুলেন্স। ছোটাছুটি করছে ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্সের লোকজন। সেনা জওয়ানরাও এসে গিয়েছে। কান্না, হুড়োহুড়ির মাঝে সবার ওপরে ঝুলে রয়েছে একটি ভাঙা ব্রিজ। মোরবি সেতু। ৩০ অক্টোবরের সেই অভিশপ্ত দিনটির কথা আজও দেশবাসীর মনে আছে।
সেই দিন, অত ভিড়ের মধ্যে মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তি ছুটে গিয়ে লাফিয়ে পড়লেন জলে। টিউব হাতে নিয়ে নিজেই উদ্ধারকাজে হাত লাগান। আশেপাশের মানুষ তখন এই কাণ্ড দেখে রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়েছেন। কিন্তু বছর ষাটেকের ওই ব্যক্তি নিজের কাজে নাছোড়বান্দা। উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে বেশ কয়েকজনকে বাঁচানও তিনি। মাচ্ছু নদীর দুই ধারে উপস্থিত মানুষজন দেখেন, প্রাক্তন বিধায়ক কান্তিলাল অম্রুতিয়া কোনও কিছুর পরোয়া না করে, তাঁদেরই একজন হয়ে নেমে পড়েছেন জলে।
হঠাৎ এই প্রসঙ্গের উত্থাপন কেন? কারণ, এই মুহূর্তে দেশে ভোটের মরসুম। বছর পেরলেই পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচন। আর গত বৃহস্পতিবার, ৮ ডিসেম্বর গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে। অন্যান্য বারের রেকর্ড ভেঙে ২০২২-এও নিজের সিংহাসন ধরে রাখল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি (BJP)। গোটা রাজ্য জুড়েই নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi), অমিত শাহের (Amit Shah) মুখে হাসি ফুটল।
મોરબીમાં ઝુલતા પુલની દુર્ઘટના ખુબ જ કમનસીબ છે. હું સ્થળ પર જ છું. સૌને નમ્ર અપીલ કે આ દુઃખની ઘડીમાં આપણે સૌ સાથે મળી શક્ય તેટલા લોકોને મદદરૂપ થઈએ.
નોંધ:જે જગ્યાએ બચાવ કાર્ય ચાલુ છે ત્યા ખોટી ભીડ ના કરીએ જેથી રાહતકાર્યમાં કોઈ અડચણ ના આવે.
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Arvind Kejriwal AAP: 'দিল্লির লাড্ডু' পৌঁছে দিয়েছেন গুজরাতের কোটি কোটি জনতার মধ্যে। প্রথমবারের লড়াইয়ে রাজ্যজুড়ে প্রায় ১২.৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন আম আদমি দলের প্রার্থীরা।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Gujarat Legislative Assembly Election : লক্ষ্যপূরণের দায় নিয়ে অসুস্থ শরীরেও এগিয়ে গিয়েছেন। একাধিক বিতর্ক আর দাঙ্গাবাজ তকমার পরেও তিনিই হয়ে উঠেছেন সেরা!
— Kantilal Amrutiya (@Kanti_amrutiya)
গুজরাত ভোটেই অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মোরবি। ব্রিজ ভেঙে পড়ার পর গুজরাত প্রশাসনের ব্যর্থতার প্রসঙ্গ তুলে প্রচার শুরু করে বিরোধী আপ ও কংগ্রেস। কিন্তু সেই মোরবিই সমস্ত রেকর্ড ভেঙে বিজেপিকে জেতাল। সৌজন্যে সেই বছর ষাটেকের ব্যক্তিটি, কান্তিলাল অম্রুতিয়া। মোরবি ব্রিজ ভেঙে পড়ার পর তাঁর উদ্যোগ, উদ্যম দেখে বিজেপি তাঁকে বিধায়ক হিসেবে প্রার্থী করে। রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চালেই কার্যত কিস্তিমাত করে গেরুয়া শিবির। কান্তিলাল প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মোরবিবাসী তাঁকেই মনোনীত করেন।
আরও একবার ফিরে যাওয়া যাক ৩০ অক্টোবরের সেই সন্ধ্যায়। সন্ধ্যা পৌনে সাতটা নাগাদ উনবিংশ শতকে তৈরি ব্রিজটি একেবারে ভেঙে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসনের মতে, অন্তত ৫০০ জন মানুষ ওই মুহূর্তে ব্রিজের ওপর ছিল। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১২৫ জন লোক ওই ব্রিজে উঠতে পারে। তাহলে কেন এতো মানুষ উঠতে পারল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধীরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ভিড়ের ছবিও ভাইরাল হয়ে যায়। প্রসঙ্গত, এই দুর্ঘটনার মাত্র পাঁচদিন আগেই ব্রিজটি জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল। তার আগে দীর্ঘ সময় ধরে মেরামত ও সংস্কারের কাজও হয়েছিল। তারপরও এই দুর্ঘটনায় মাথায় বাজ পড়ে স্থানীয়দের।
রিপোর্ট অনুযায়ী, এই ঘটনায় প্রায় ১৪১ জন মানুষ মারা যান। ১৮০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন। বিজেপির সাংসদ মোহন কুন্দরিয়ার পরিবারের ১২ জন এই দুর্ঘটনায় মারা যান। সেনা, এনডিআরএফ বা ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (NDRF), প্রশাসন, স্থানীয় বাসিন্দা সবাই উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেই দলে ছিলেন কান্তিলাল অম্রুতিয়া। তড়িঘড়ি টিউব নিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে উদ্ধারকাজে সাহায্য করেন তিনি। এই দৃশ্য নেট দুনিয়ায় ভাইরালও হয়। সাধারণ মানুষেরও নজর এড়ায়নি এই ঘটনা।
কে এই কান্তিলাল অম্রুতিয়া? দীর্ঘদিন ধরে গুজরাতে বিজেপির অন্যতম সেনানী ছিলেন তিনি। ১৯৯৫ সালে তিনি প্রথমবার বিধায়ক হন মোরবি থেকেই। তারপর ২০১৭ সাল, দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবেই তাঁর অবতারণা। কিন্তু গত গুজরাত বিধানসভা নির্বাচনে একটু অন্য ফলাফল হয়। ২০১৭ সালে অল্পের জন্য কংগ্রেসের ব্রিজেশ মেরজার কাছে হেরে যান কান্তিলাল। পরে অবশ্য ব্রিজেশ বিজেপিতে যোগদান করে। উপনির্বাচন হওয়ার পর ফের মোরবি থেকে জয়লাভ করেন। হয়তো এবারও ব্রিজেশই বিধায়ক হিসেবে নির্বাচনে লড়তেন।
সমস্ত হিসেব ওলটপালট করে দেয় অক্টোবরের মোরবি ব্রিজ দুর্ঘটনা। ওইদিন কান্তিলাল অম্রুতিয়ার ওই উদ্যম, উদ্ধারকাজের দৃশ্য নজর এড়ায়নি বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। তাই তারই ‘পুরস্কারস্বরূপ’ কান্তিলালকে বিধায়ক পদপ্রার্থী করে ভারতীয় জনতা পার্টি। এলাকাবাসী আর দলের ভরসা ফের ফিরে আসার পর প্রচারে জোর লাগান কান্তিলাল। তার ফলও পান হাতেনাতে। মোরবিতে তাঁর বিপক্ষে ছিলেন কংগ্রেসের জয়ন্তীলাল প্যাটেল। ভোটগণনার শুরু থেকেই তাঁকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে শুরু করেন কান্তিলাল। কার্যত ছক্কা হাঁকান ব্যালট বাক্সে।
অথচ এর ঠিক উল্টো ছবিটাই আশা করেছিল বিরোধী শিবির। মোরবি সেতুর মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি বেসরকারি সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়েছিল সেখানকার পুরসভা। উল্লেখ্য, সেই পুরসভাও বিজেপিরই অধীন। তারপরও এমন দুর্ঘটনা কী করে, সেই প্রশ্ন উঠেছে বারবার। পুরসভা অবশ্য দাবি করেছিল, সঠিকভাবেই রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে। অথচ পরে জানা গেল, সংস্কারের পর স্থানীয় প্রশাসনের তরফে কোনও ফিট সার্টিফিকেটই দেওয়া হয়নি। তার আগেই জন সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছিল সেতু। সেইসঙ্গে ছিল সঠিকভাবে ভিড় মোকাবিলা না করার প্রসঙ্গ। ১২৫ জনের জায়গায় কী করে ৫০০ লোক একসঙ্গে সেখানে উঠে গেল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিরোধীরা। সেই প্রশ্ন আজও জায়েজ।
এত কাণ্ডের পর মুখ পুড়েছিল বিজেপির। কিন্তু সেই খেলা কার্যত একাই ঘুরিয়ে দিলেন কান্তিলাল অম্রুতিয়া। কোনও পাশাখেলা, ঘোড়া কেনাবেচার মধ্যে দিয়ে নয়। বিপর্যয়ের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তার প্রচার – এই পুরো ঘটনাটাই ইউএসপি হিসেবে উঠে এসেছে। নির্বাচনে জিতে আপাতত কান্তিলালের মুখে হাসি। কিন্তু প্রশ্নগুলো মুছে যায়নি এখনও। মোরবি সেতুর ভবিষ্যৎ কী, সেই দিকেও নজর থাকবে গোটা দেশের।







