চাপা কান্না থেকে না-বলা কথা, কে কে-র গানে একটা প্রজন্ম যেভাবে বেঁচেছে
তাঁর গান আসলে একটা প্রজন্মের ভাষ্য। তাদের অক্ষরবৃত্তে ঘুরেফিরে আসবে নিজের কথাই। আসলে এই প্রজন্মের 'আমি'-কে সুরের মায়াভাষ্যে আগলে রয়েছে কে কে-র কণ্ঠ।

'জানি বন্ধু জানি তোমার আছে তো হাতখানি... '
জানি আছে, জানি চিরকাল থাকবে তাঁর হাত। আসলে কিছু স্পর্শ হয় অন্তরের, যাকে শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করার মতো শব্দ আজও অভিধানের পাতায় অমিল। এই লেখা কেবল নিজের জন্য, সব মনখারাপে যাঁর সুর বলেছে 'আমি আছি'! আজকালকার কিশোর-কিশোরীদের মতো হাতে অ্যানড্রয়েড ফোন একটা প্রজন্মের কিশোরী বিকেলকে ব্যস্ত রাখেনি। তবে ছিল সিডি প্লেয়ার, যখন প্রথম রং লাগে মনে, তখন এক অচেনা মানুষের গান যেন বুকের ভেতরে তরঙ্গ তুলত! সত্যি কথা বলতে, তখন তাঁর নামটুকুও জানতাম না আমরা অনেকেই। শুধু শুনতাম গান। সেই গান উঠে এল হলুদ পাতার ডায়েরিতে... তারপর থেকেই গেল। তিনি কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ, আসমুদ্রহিমাচলের তিনি কে কে। তাঁর জন্মদিন বলে কথা! আসলে বিখ্যাত মানুষের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন নিয়ে আবেগে ভরপুর লেখা হবে, এ তো স্বাভাবিক। তাঁর গান জুগিয়েছে প্রাণের আরাম। বহু বন্ধুহীন, একলা মানুষের সঙ্গী হয়েছে 'পল... '। অনেকেরই তাঁকে চেনা সেই বিখ্যাত রিয়্যালিটি শো থেকেই। একদল তরুণ প্রজন্ম 'ইন্ডিয়ান আইডল'-এর মঞ্চ কাঁপিয়ে গাইছে 'ইয়ারোঁ'।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
শিল্পীকে চিরবিদায় জানানোর সময় ফিরে দেখা যাক তাঁর ঝুলিতে থাকা সুপারহিট সব গানগুলো।
স্কুলের শান্ত একা মেয়েটা মফসসল ছেড়ে ২০১৫তে পা দিল ঝাঁ চকচকে শহরে। সেখানেও সে এক্কেবারে একা- আজও! তবুও একজন আছে, আজও আছে, তাঁর গানের জাদু নিয়ে। আমাদের যৌবনের প্রথম অধ্যায়ে হাতে পাওয়া স্ক্রিনটাচ ফোনে তখনও আজকের মতো ইন্টারনেট ফোরজি স্পিড দিত না। জীবন তখনও প্রতিযোগিতার মার-প্যাঁচে ব্যস্ত হয়নি। ছিল না ইউটিউবের রমরমা। বড়জোর ছিল আমাদের এয়ারসেলের টুজি ইন্টারনেট। আর ফোনের চিপে গান ডাউনলোড করে শোনার বৃষ্টিভেজা হলদে বিকেল। তারপর সময় এগিয়েছে, একটা প্রজন্মও জীবনে এগিয়েছি হয়তো! বয়স বেড়েছে, মানুষ এসেছে, চলে গেছে। বদলেছে অভিধানে না-পাওয়া শূন্যতার প্রতিশব্দ। বদলেছে শোকের পাশে এসে চুপ করে বসা সেই ছায়া। বদলেছে সবাই! কিন্তু 'Nothing is Permanent'-এর যুগেও ভরসা হয়ে থেকে গেছে কে কে-র গান।
হিন্দি সিনেমার গানের ইতিহাসকে দেখলে দেখা যায়, কে কে শেষ শতাব্দীর নয়ের দশক ও এই শতাব্দীর প্রথম দশকে একাধিক সুপারহিট গান গেয়েছেন। ১৯৯৬ সালে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদের ওপর আধারিত ছবি ‘মাচিস’-এর গানের অংশবিশেষ, বিশাল ভরদ্বাজের সুরে, কিংবা ১৯৯৯ সালে তাঁর জনপ্রিয় অ্যালবাম ‘পল’ বা ২০০৮ সালের ‘হামসফর’ অ্যালবামটির কথা উঠে আসবেই। নিছক তথ্য বলে, ১১টা ভাষায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার বিজ্ঞাপনী জিঙ্গল রেকর্ড করেছেন কে কে। শাহরুখ খান, রণবীর সিংহ কিংবা সলমন খানের নেপথ্য কণ্ঠ হিসেবেও জনপ্রিয় হয়েছে তাঁর গান। অজস্র অনুষ্ঠান করেছেন দেশ-বিদেশে। তাঁর অনুষ্ঠানে মোহিত হয়েছে কয়েক প্রজন্ম।
গান ভালবেসে গান- এই নিয়ে যদি কোনও গবেষণাকেন্দ্রিক লেখা হয়, তাহলে সেখানে কেকে অবশ্যই থাকবেন। আগে একবার লিখলেও হঠাৎ মনে পড়ল 'মাচিস'-এর 'ছোড় আয়ে হম উয়ো গলিয়াঁ... ' কিংবা 'হম দিল দে চুকে সনম'-এর 'তড়প তড়প কে' যেন মোচড় দিয়ে কাঁদিয়ে তুলেছিল ভেঙে যাওয়া বহু হৃদয়কে। কে কে দরদ দিয়ে গাইতেন তাই মঞ্চে 'সাচ ক্যাহ রাহা হে দিওয়ানা' গাওয়ার পরেই গাইতে পারতেন উত্তাল নাচের গান 'আপনি পোড়ে'। তাঁর গানের শিকড়ে যেমন ছিল প্রেমের উদযাপন, তেমনই মিশে ছিল একা, নিঃসঙ্গ মানুষের চোখের নোনা জল।
তাঁর গান আসলে একটা প্রজন্মের ভাষ্য। তাদের অক্ষরবৃত্তে ঘুরেফিরে আসবে নিজের কথাই। আসলে এই প্রজন্মের 'আমি'-কে সুরের মায়াভাষ্যে আগলে রয়েছে কে কে-র কণ্ঠ। যার অস্তিত্বটুকু সম্পর্কে ও জানলেন না কে কে। অথচ অনেকেরই বিজন ঘরের সেই বন্ধু হয়ে রয়ে গেলেন। তাঁর অসংখ্য শ্রোতার সঙ্গে সম্পর্ক আবেগের, হৃদয়ের, আধ্যাত্মিক চেতনার; সেখানে তিনি রেখে গেলেন সুর, কণ্ঠ, গান আর হাজারও মানুষের নানা স্মৃতি। তাঁর ছায়াপথ ধরেই হেঁটে যাচ্ছি আমার মতো একলা পথিক আর আলগোছে বলছি- 'আভি আভি তো মিলি হো/আভি না করো ছুটনে কি বাত্'!
















