'দেবদাস' থেকে 'আশিকি টু'- গানের সুরে প্রেমের নদীর খোঁজ দিয়েছিলেন কে কে

শিল্পীকে চিরবিদায় জানানোর সময় ফিরে দেখা যাক তাঁর ঝুলিতে থাকা সুপারহিট সব গানগুলো।

Piya Saha
৩ মিনিট
'দেবদাস' থেকে 'আশিকি টু'- গানের সুরে প্রেমের নদীর খোঁজ দিয়েছিলেন কে কে

'হাম রহে ইয়া না রহে কাল, কাল ইয়াদ আয়েঙ্গে কে ইয়ে পল'- এই গানের সুর আর কথাই ভরসা আজ শ্রোতাদের কাছে। সত্যি যদি পরের দিন ফের কোনও মঞ্চে কে কে সুরের জাদু দেখাতেন, কলকাতাবাসীই সবথেকে বেশি খুশি হতো।

মঙ্গলবার কলকাতার নজরুল মঞ্চের অনুষ্ঠান-শেষে অসুস্থ হয়ে প্রয়াত হয়েছেন সংগীতশিল্পী কেকে। তাঁর আকস্মিক মৃত্যুর খবর এখনও পর্যন্ত বিশ্বাস করতে পারছেন না কলকাতাবাসী। হতবাক তাঁর সহকর্মীরাও। কী আশ্চর্য সমাপতন! যে গান তাঁর সবথেকে প্রিয়, সেই গান করতে করতেই যে মৃত্যুর দিকে ঢলে পড়ছিলেন কে কে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি নিজেও।

জীবনের থেকে ছুটি নিয়ে নিলেন শিল্পী কে কে। আর তাঁর গলায় শোনা যাবে না কোনও স্মরণীয় গান। চিরকালের মতো থেমে গেল শিল্পীর গলা। ভালবাসা, বিরহে তাঁর গান যেভাবে হৃদয়ে আবেগ নিয়ে এসেছে, তা নয়ের দশকের প্রেমিক-প্রেমিকারা জানেন। নতুন প্রজন্মও তাঁর গানে সমানভাবে আবগে ভাসত। তাই শিল্পীকে চিরবিদায় জানানোর সময় ফিরে দেখা যাক তাঁর ঝুলিতে থাকা সুপারহিট সব গানগুলো।

পুরো নাম কৃষ্ণকুমার কুন্নাথ। ১৯৬৮ সালের ২৩ আগস্ট এক মালয়ালি পরিবারে জন্ম তাঁর। কিন্তু বড় হয়ে ওঠেন দিল্লিতে। দিল্লির মাউন্ট সেন্ট মেরিস স্কুলে পড়াশোনা করেন কৃষ্ণকুমার। এরপর দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কিরোরি মাল কলেজ থেকে স্নাতক স্তরে পাশ করেন। তবে অবাক করার মতো কথা হলো, সুরের জাদুকরের নাকি প্রথাগত কোনও তালিম নেওয়া ছিল না। বলিউডে ডেবিউ করার আগে বিজ্ঞাপনের জগতে চুটিয়ে জিঙ্গল গেয়েছেন কেকে। এগারোটি ভাষায় প্রায় সাড়ে তিনহাজার জিঙ্গল রয়েছে এই তালিকায়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
আলভিদা কে কে! লক্ষ মানুষের মনের কোণে এখনও বেজে চলেছে তাঁর গান

একটা সময়ের কণ্ঠস্বর তিনি, নয়ের দশকে গড়ে ওঠা প্রজন্মের কাছে তো বটেই, আসমুদ্রহিমাচল বহু মানুষের কাছেই কে কে সময়ের চিহ্ন।

এ. আর রহমানের হাত ধরে বলিউডে প্রবেশ। এ. আর রহমানের সুরে 'কাল্লুরি শালে'-তে প্রথমবার গান গেয়েছেন কে কে। এটিই ছিল প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে গাওয়া তাঁর প্রথম গান। ১৯৯৯ সালে 'পল' নামে প্রথম অ্যালবাম মুক্তি পায় তাঁর। এই অ্যালবামের 'ইয়ারো দোস্তি...' গানটি আজও অমলিন। বন্ধুত্বের স্মৃতি উসকে দিতে এই গানের জুড়ি হবে না।

তবে বলিউডে বড় সুযোগ আসে ইসমাইল দরবারের হাত ধরে। সঞ্জয় লীলা বনশালির 'হাম দিল দে চুকে সনম' ছবিতে 'তড়প তড়প' গান গেয়ে বলিউডে জায়গা করে নেন কে কে।শোনা যায়, বনশালি প্রথমবার এই গান শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। পর পর ন'বার শুনেছিলেন এই গান। শুধু হিন্দি নয়, বাংলা, তামিল, তেলুগু, কন্নড়, মালয়ালম, মারাঠি ভাষায় প্লেব্যাক করেছেন তিনি। গুলজারও মুগ্ধ ছিলেন কে কে-র গানে। তাঁর 'মাচিস' ছবিতেও গান গেয়েছিলেন কে কে। ১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপ ভারতীয় ক্রিকেট দলের জন্য 'জোশ অফ ইন্ডিয়া' গেয়েছিলেন।

২০০২ সালে দেবদাস ছবিতে 'ডোলা রে ডোলা', ২০০৬ সালে 'ও লামহে' ছবিতে 'ক্যায়া মুঝে প্যায়ার হে', ২০০৭ সালে 'ওম শান্তি ওম' ছবিতে 'আঁখো মে তেরি', ২০০৮ সালে 'বাঁচনা অ্যায় হাসিনো' ছবিতে ' খুদা জানে', ২০০৯ সালে 'তুম মিলে' সিনেমার 'দিল ইবাদত', ২০১১ সালে 'কাইটস' ছবির 'জিন্দেগি দো পল কি', ২০১৩ সালে 'আশিকি টু' সিনেমায় 'পিয়া আয়ে না', 'মার্ডার টু' ছবির 'মাত আজমা রে', ২০১৪ সালে 'হ্যাপি নিউ ইয়ার' ছবির 'ইন্ডিয়াওয়ালে', পরের বছর 'বজরঙ্গি ভাইজান' ছবির 'তু জো মিলা'- তাঁর সুপারহিট গানের তালিকা শেষ হওয়ার নয়। অনুরাগ কাশ্যপের বিতর্কিত ও মুক্তি না পাওয়া ছবি 'পাঁচ'-এর 'ম্যায় খুদা'-ও অনেক শ্রোতার কাছে অন্যরকম গান হিসেবে সমাদৃত।

১৯৯১ সালে ছোটবেলার ভালবাসা জ্যোতিকে বিয়ের আগে কিছুদিন সেলসম্যানের কাজও করেছেন কে কে।কিন্তু হাঁপিয়ে উঠেছিলেন তিনি। বাবা এবং স্ত্রী-র কথায় পেশা ছেড়ে কি-বোর্ড কিনে মন দিয়েছিলেন সংগীতচর্চায়। একসময় দিল্লি ছেড়ে পাড়ি দেন মুম্বইয়ের উদ্দেশ্যে। কিশোরকুমার, মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন তাঁর অনুপ্রেরণা। কে কে-র মৃত্যুর কথা সামনে আসতেই বন্ধু সুরকার প্রীতম বলেছেন, "কী করে মেনে নেব? ওর গান নিয়ে অনুশীলন ভোলা যাবে! অসম্ভব!" প্রীতমের সুরে একাধিক ছবিতে সুপারহিট সব দিয়েছেন কে কে। 'জন্নত', 'লাইফ ইন আ মেট্রো', 'তুম মিলে', 'লাভ আজকাল'- এমন বহু ছবিতে প্রীতমের সাথে কাজ করেছেন কে কে। প্রাণবন্ত গানপাগল হিসেবেই বলিউড চিনত তাঁকে। মোট ছ'বার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন কেকে। বরাবরই শ্রোতাদের ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন তিনি।

কিন্তু ৫৩-তেই সব শেষ! গতকাল অনুষ্ঠান-শেষে হোটেলে ফিরে যাওয়ার সময় গাড়িতে শীত করছিল কে কে-র। এসি বন্ধ করে দিতে বলেন তিনি। হাতে-পায়ে ক্র্যাম্প ধরতে শুরু করে। তবে হোটেলে ফিরে অনুরাগীদের ডাকে সাড়া দিয়ে ছবিও তোলেন শিল্পী। হোটেলে ফিরেই পড়ে যান তিনি। স্বস্তি বোধ না করায় সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা জানান, রাস্তাতেই মৃত্যু হয়েছে শিল্পীর। তবে মঞ্চেও বারবার ঘেমে যাচ্ছিলেন কে কে। বলেছিলেন আলো নিভিয়ে দেওয়ার কথাও। সময়ের আগেই মঞ্চ ছেড়ে বেরিয়ে যান কেকে। যেমন নির্ধারিত সময়ের আগে চলে গেলেন সংগীতজীবন ছেড়ে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।