'যেতে নাহি দিব'! করোনায় মৃত, স্ত্রীর জলজ্যান্ত সিলিকন মূর্তি গড়লেন কলকাতার এই বৃদ্ধ
Kolkata Silicone Statue: ভিআইপি রোডে তাঁদের বাড়িতে স্ত্রী ইন্দ্রাণীর প্রিয় জায়গায়, একটি সোফায় এই মূর্তিটি বসে আছে। মূর্তিটির ওজন ৩০ কেজি।
মানুষ চলে গেলে, সমস্ত ধূলিকণাতেও তাঁর থেকে যাওয়া ফুটে ওঠে। সমস্ত কোণায় লেগে থাকে তাঁর থেকে যাওয়া। সমস্ত খুঁজে না পাওয়া জিনিসে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়, নিরন্তর। মানুষ নিরাকারে আস্থা রাখে কমই। প্রেম, শ্রদ্ধা, কাছে পাওয়া, হারানো এমনকী ভয়- সবটুকুই মানুষ আকারে ধরে রাখে, স্মৃতিতে নয় ছবিতে হাত বোলাতে ভালোবাসে মানুষ। কেউ কেউ ছবি নয়, অবিকল মানুষের আকার গড়ে তাকে জড়িয়ে থাকেন। প্রাণহীন দেহ, তবু আকার তো! করোনার দ্বিতীয় ঢেউ কেড়ে নিয়েছে স্ত্রীকে। কেড়ে নিলেই যেতে দেওয়া যায় কি? স্ত্রীর না থাকাই থাকা হয়ে ফুটে ওঠে সতত। সেই ফুটে ওঠা স্মৃতিগুচ্ছ তুলে তুলে তাই মূর্তি গড়েছেন কলকাতার কৈখালির বছর ৬৫-র বৃদ্ধ। তাপস শাণ্ডিল্য অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। নিজের বাড়িতে প্রয়াত স্ত্রীর একটি জলজ্যান্ত সিলিকন মূর্তি স্থাপন করেছেন তিনি, খরচ হয়েছে ২.৫ লক্ষ টাকা!
ভিআইপি রোডে তাঁদের বাড়িতে স্ত্রী ইন্দ্রাণীর প্রিয় জায়গায়, একটি সোফায় এই মূর্তিটি বসে আছে। মূর্তিটির ওজন ৩০ কেজি। সিলিকনের দেহে সেইসব সোনার গয়নাগুলিই রয়েছে যা জীবদ্দশায় সবচেয়ে বেশি পছন্দ করতেন। সিলিকনের মূর্তির গায়ে অসম সিল্কের শাড়ি। ছেলের বিয়ের রিসেপশনে পরেছিলেন এই শাড়িটি। এই প্রাণবন্ত মূর্তির ভাস্কর সুবিমল দাস। সম্পূর্ণ সিলিকন মূত্তি গড়তে সময় লেগেছে ছয় মাসেরও বেশি! ইস্কন মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা, ভক্তিবেদান্ত স্বামীর প্রাণবন্ত একটি মূর্তি দেখেছিলেন তাপস ও ইন্দ্রাণী। মায়াপুরে সেই মূর্তি দেখে ভীষণ পছন্দ হয় তাঁদের। "আমরা এক দশক আগে মায়াপুরের ইসকন মন্দিরে গিয়েছিলাম এবং ভক্তিবেদান্ত স্বামীর এমন প্রাণোজ্জ্বল মূর্তি দেখে আমাদের প্রশংসাই থামে না। তখনই ইন্দ্রাণী আমাকে বলেছিল, যদি আমার আগে মারা যায়, তাহলে তাঁর এইরকম একটা মূর্তি গড়তে,” টাইমস অব ইন্ডিয়াকে জানিয়েছেন তাপস।
২০২১ সালের ৪ মে প্রয়াত হন ইন্দ্রাণী। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস পরে, তাপস শাণ্ডিল্য এমন একজন কারিগরের সন্ধান করতে থাকেন যিনি এই ধরনের কাজ করতে পারেন, এমন মূর্তি গড়তে পারেন। ২০২২ সালের শুরুর দিকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয় ভাস্কর সুবিমল দাসের। শিল্পী সুবিমল হামেশাই জাদুঘরের জন্য সিলিকনের কাজ করে থাকেন। যদিও এই কাজটি তাঁর কাছে ছিল চ্যালেঞ্জিং! বিভিন্ন কোণ থেকে ইন্দ্রাণীর মুখের ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল একেবারে শুরুতে। প্রথমে একটি মাটির মডেল তৈরি করা হয়।
- আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
Kalpataru Day: দুই হাত তুলে সকলকে আশীর্বাদ করলেন ঠাকুর, “তোমাদের চৈতন্য হোক
সুবিমলের সঙ্গে মাটির এই ছাঁচ তৈরির পর্যায়ে প্রায় হাতে হাত লাগিয়েই কাজ করেছিলেন তাপস। ৩৯ বছর একসঙ্গে কাটিয়েছেন তিনি আর ইন্দ্রাণী। স্ত্রীর মুখের কখন কী অভিব্যক্তি, কতখানি বাঁক, কতখানি গভীরতা, কে জানবে আর তিনি ছাড়া? বারাসতের এক দর্জির কাছেও কয়েকবার গিয়েছিলেন তিনি। ইন্দ্রাণী এই দর্জির কাছেই সবসময় নিজের জামা কাপড় তৈরি করাতেন। তিনিই জানতেন সঠিক মাপ।
ভাস্করদের মতে, সিলিকনের ভাস্কর্যের যত্নআত্তি করা মোমের মূর্তির চেয়ে অনেক সহজ। এই ধরনের সিলিকন ভাস্কর্যের দাম পড়ে ২.৫ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকার মধ্যে হতে পারে, তবে তা আরও অনেক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। দেহের রঙ থেকে শুরু করে চুল বসানো, চোখ বসানো এই ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই মূর্তিটির ক্ষেত্রে চুলের গ্রাফটিং সম্পূর্ণ হতে প্রায় ৩০ দিন লেগেছিল!
তবে মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর এমন প্রায় জ্যান্ত দেহ ঘরের মধ্যে থাকবে- বিষয়টিকে ভালোভাবে নেননি অনেকেই। তাপস জানিয়েছেন, পরিবারের কাছ থেকেই বেশ তীব্র বিরোধিতার মুখোমুখিও হয়েছিলেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত পরিবারের অন্যন্যরাও মত দেন। এমনকী তাঁর কিছু আত্মীয় এবং প্রতিবেশীরা সাহায্যও করেন। তাপসের কথায়, যদি কোনও প্রিয় মানুষের মৃত্যুর পর আমরা ঘরে ছবি রাখতে পারি, তাহলে মূর্তি কেন নয়?
তবে ছবি হোক বা মূর্তি, সে প্রাণহীন। না থাকা যেন আরও প্রকট না থাকা হয়ে যায়। বেদনার উপর টলটল করে হারানোর ঘা। বারেবারে তাই মনে পড়ে যায় করোনার দিনগুলি কথা, স্ত্রী হাসপাতালে, তিনিও বৃদ্ধ, ফলে কোয়ারান্টাইনে নিভৃতে, একা অসহায় দুশ্চিন্তায়... ভুলতেই পারেন না সেইসব গ্লানির মুহূর্ত। শুধু এই মূর্তিটুকু সান্ত্বনা, কেউ তো আছে। হোক না নির্বাক, নিঃস্পন্দ, তবু কেউ তো আছে। সঙ্গে না হোক, পাশে। এটুকু সঙ্গ নিয়েই বাঁচতে চান তাপস।















