এর নাম সুশাসন! ১৩ টি মৃত্যুতে রক্তের দাগ কার হাতে?

রাজ্যে তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল। শান্তি আর সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য়েই শাসকদলকে আরও একবাক সুযোগ দিয়েছিল সাধারণ মানুষ। কিন্তু কোথায় শান্তি, কোথায় সুশাসন! বীরভূমের রামপুরহাট অঞ্চলের বকটুই গ্রামে সোমবার রাতে ১৩ জনের মৃত্যুর ঘটনায় ঘুম উড়ছে গোটা রাজ্যের। সকলেরই প্রশ্ন তুলছেন, এই নৈরাজ্য কি কাম্য! আইনের শাসনে এমনটা কি চলতে পারে!

গতকাল তৃণমূলের পঞ্চায়েত উপপ্রধান ভাদু শেখকে লক্ষ করে বোমা ছোঁড়ে একদল দুষ্কৃতী। সূত্রের খবর,  জাতীয় সড়কের ধারে কোনও এক দোকানে বসে চা খাচ্ছিলেন ওই তৃণমূল নেতা। তখনই ঘটেছে এ ঘটনা। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইকে চেপে কয়েকজন দুষ্কৃতী বকটুই গ্রামে এসে পৌঁছয়। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে তাণ্ডব চালানোর পর তারা কমপক্ষে দশটা বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। ঘটনার পর গতকাল রাতে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আজ সকালে উদ্ধার করা হয়েছে সাতজনের মৃতদেহ। অনেকেই মনে করছেন, ভাদু শেখের খুনের প্রতিশোধ নিতেই এমনটা ঘটিয়েছে দুষ্কৃতীরা। তারা এও মনে করছেন যে খবর চেপে দিতে বেশ কয়েকজনের দেহ লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। ভয়ে গ্রামবাসীদের সকলের মুখে কুলুপ। সামগ্রিক ঘটনার স্বচ্ছ তদন্তের জন্য সিট গঠন করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে রামপুরহাট থানার ও সিকে। এ ছাড়াও সরানো হয়েছে রামপুরহাটের এসডিপিওকে। মঙ্গলবার নবান্নে জরুরি বৈঠকে বসেন মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব ও রাজ্য পুলিশের ডি জি।

গোটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে যা সঙ্গত কারণেই শাসক দলের জন্য অস্বস্তির। গোটা ঘটনা যদি রাতেই ঘটে, তবে সংবাদমাধ্যমে তা এত দেরি করে এল কেন! কারা সংবাদমাধ্যম, পুলিশ--কাউকেই গ্রামে ঢুকতে দিলেন না এই গণহত্যার সময়ে? পুলিশকে প্রথমবার ফিরিয়ে দেওয়ার পরে আর কেন গ্রামে ঢুকল না বাহিনী! রাতের অন্ধকারে যে বাহুবলীরা এই হিংসা ঘটালেন তারা কারা, কাদের হাত আছে তাদের মাথায়! এই গ্রাম কি পশ্চিমবঙ্গের অন্দরেরই কোনো অংশ নয়! সেখানে আইনের শাসন বজায় রাখা কাদের দায়িত্ব! আগের থেকে ঘটনার কোনো পূর্বাভাসই কি পায়নি পুলিশ!

বিধানসভায় তৃতীয়বার তৃণমূল জিতে আসার পর থেকে পশ্চিমবঙ্গে ঘটে চলেছে একের পর এক হিংসাত্মক ঘটনা। গত শুক্রবার দক্ষিণ কলকাতার রিজেন্ট পার্ক অঞ্চলে দিন দুপুরে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় দিলীপ চৌহান নামে এক প্রৌঢ়কে। স্থানীয়দের অভিযোগ সুজিত মল্লিক নামে এক ব্যক্তি এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। দিলীপবাবুকে দ্রুত এস এস কে এম হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও সেদিন বিকেলেই মৃত্যু হয় তাঁর। এ ঘটনার ঠিক পরদিন তিলজলা এলাকায় গুলি এবং বোমাবাজির জেরে সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে গোটা ঘটনায় এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হওয়ায় তাঁকে ন্যাশনাল মেডিকাল কলেজে ভর্তি করা হয়েছে। স্থানীয় বিবাদের জেরেই এ ঘটনা ঘটেছে। এমনটাই জানিয়েছে পুলিশ। গত ফেব্রুয়ারিতে  পুরুলিয়ার টামনা থানার কোটলাই গ্রামে এক মহিলাকে ‘ডাইনি’ আখ্যা দেওয়াকে কেন্দ্র করে শুরু হয় দুই পরিবারের সংঘর্ষ। কিছুক্ষণের মধ্যেই চৈতু কুমার নামে এক ব্যক্তি সুভাষ কুমার নামে আরেক ব্যক্তিকে লক্ষ করে গুলি চালান। সংঘর্ষে তিনজন  আহত হন। সন্ত্রাসের হাত থেকে মুক্তি পাননি খোদ শাসক দলের নেতাও। গত ১৩ মার্চ উত্তর চব্বিশ পরগনার পানিহাটি এলাকায় গুলি করে  খুন করা হয় ৮ নম্বর ওয়ার্ডের   তৃণমূল কাউন্সিলর অনুপম দত্তকে। শরীরে গুলি লাগায় বেলঘরিয়ার এক বেসরকারি হাসপাতালে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর। একই দিনে পুরুলিয়ার ঝালদায় খুন হন দু নম্বর ওয়ার্ডের কংগ্রেস কাউন্সিলর তপন কান্দু। পরপর ঘটে যাওয়া এতগুলো হিংসাত্মক ঘটনার প্রেক্ষিতে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে দেখা গেছে রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে। পশ্চিমবঙ্গের আইন শৃঙ্খলা নিয়ে বিরোধীরা প্রশ্ন তোলায় গত ১৯ মার্চ তিনি বলেন, দুষ্কৃতিরা যদি না থাকে তাহলে তো পুলিশ ব্যাপারটাই উঠে যাবে।

আরও পড়ুন-ঘুমন্ত মানুষগুলোকে কারা মারল! আইনের শাসন কোথায় পশ্চিমবঙ্গে?

অনেকেই এবার বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির মতো সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আটকাতে তৃণমূল কংগ্রেসকে তৃতীয়বার ভোট দিয়ে ক্ষমতায় ফিরিয়েছেন। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নেই এমন মানুষও তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে শান্তির অলিখিত শর্তেই। কিন্তু গত সেই ভোটের সময় যে অশান্তি শুরু হয়েছিল তা থামার নাম আজও নেই। হয়তো প্রেক্ষিত আলাদা, কিন্তু রাজ্যের নানা জায়গায় বারবার তাণ্ডবের ছবি উঠে আসছে। এর দায় তো শাসকেরই! এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই কয়েকদিন আগে হাওড়ার আমতায় ছাত্রনেতা আনিস খানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। সে ঘটনাতেও নাম জড়িয়েছে পুলিশের। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে খাকি উর্দির বিশ্বাসোগ্যতা নিয়ে। অবশেষে এই গণহত্যা, পরিকল্পনা করে এত বড় খুন, যা নিয়ে অস্বস্তিতে একেক বার একেক রকম মত দিয়ে ফেলছেন তৃণমূলের জাঁদরেল নেতারা।  তৃণমূলকে এতদিন পর্যন্ত যাঁরা ‘লেসার এভিল’ বলে মনে করছিলেন, তারা ঘটনার প্রতিবাদে এবার রাস্তায় নামবেন তো? নেতাই নন্দীগ্রামের স্মৃতি ফেরাচ্ছে এই গণহত্যা। যে বুদ্ধিজীবীরা সেদিন নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলেন, আজ তারা মুখ খুলবেন তো! নাকি তাদের গলায় অদৃশ্য বকলেস!

More Articles

;