মধুস্মৃতির ছোটবেলাগুলি চলে গেল নারায়ণ দেবনাথ সঙ্গে, নন্টে-ফন্টে-কেল্টুদের আজ চোখে জল

Madhurima Dutta
৪ মিনিট
মধুস্মৃতির ছোটবেলাগুলি চলে গেল নারায়ণ দেবনাথ সঙ্গে, নন্টে-ফন্টে-কেল্টুদের আজ চোখে জল

হাওড়ার শিবপুর রোডের উপরের ছোট্ট বাড়ি। সামনে গলিতে ১৯৬০-এর দশকের বিকেলবেলার হুটোপুটি। হাফপ্যান্ট বেলার বাচ্চারা দৌরাত্ম্যে মশগুল, এ তার পিছনে লাগছে, একজন অন্য জনের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে ময়দান ছেড়ে পালাচ্ছে। এই পালানোর মধ্যে যে স্নেহের গন্ধ, যে নিপাট কৈশোরের ঘ্রাণ তা কিছুকাল পরেই উঠে আসবে কাগজে। সাদার উপর কালো কালিতে তারা হয়ে উঠবে আমাদের কিশোরবেলার বন্ধু। কারও নাম হবে হাঁদা, অবধারিত ভাবে যার জ্বালানিতে তিষ্ঠোতে পারবে না ভোঁদার মতো বাচ্চারা। কারও নাম হবে কেল্টু, নন্টে আর ফন্টেরা মিলে যাকে নাস্তানাবুদ করে রাখবে! কেউ কেউ হয়ে উঠবে চওড়া ছাতির মধ্যবিত্ত সুপারহিরো বাঁটুল। তারপর এক শীতের সকালে গলির সেই চরিত্রদের সঙ্গে করে চলে যাবেন নারায়ণ দেবনাথ। পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে কমিকসের নেশায় বাংলার কিশোরদের যিনি বড়ো করেছেন আবার সময়ে অসময়ে বড়ো হতেই দেননি কখনও। ৯৭ বছর বয়সে সেই শিল্পী আস্ত একটা ছোটবেলার গন্ধ নিয়ে চলে গেলেন। সঙ্গে যাবে কে? সঙ্গে যাচ্ছে বাহাদুর বেড়াল, কোমর বেঁধেছে! সঙ্গে যাচ্ছেন সুপারিন্টেন্ড্যান্ট স্যার, পিসেমশাই। শয়তানি ফেলে চলে যাচ্ছে কেল্টুদাও। এই শীতে গোলাপি স্যান্ডো আর কালো হাফপ্যান্টে বাঁটুল শিবপুর পেরিয়ে, গঙ্গা পেরিয়ে, বইয়ের তাক পেরিয়ে, বাঙালির কমিকস্ প্রেম পেরিয়ে চলে যাচ্ছে।

মার্ভেল বা ডিসি’র ঝকমকে সুপারহিরোদের মতো বা মিকি, টম, জেরি, ডোনাল্ড ডাকদের সঙ্গে সেই ষাটের দশকের বাংলার ভাব জমাতে অসুবিধা হওয়ারই কথা। টিনটিনকে পর্যন্ত বাঙালি পাড়ায় এনে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচে বসিয়ে দিতে পারলেই শান্তি। বাঙালির নিজস্ব কিছু চরিত্র দরকার ছিল, জাতে বাঙালি, মেধায় বাঙালি, আবার ভেবলে যাওয়াতেও বাঙালি। বাবার সোনারূপোর দোকানে বসে পাড়ার বিচ্ছু বাচ্চাদের দেখতে দেখতে হাঁদা আর ভোঁদার গল্পের জন্ম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আর্ট কলেজে পড়াশোনা করছেন নারায়ণ দেবনাথ। শেষ বছরের পরীক্ষাটা আর দিলেন না। তার বদলে বেশ কয়েক বছর কাজ করলেন বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী সংস্থায়, তৈরি করলেন সিনেমার স্লাইড, লোগোর নকশা করলেন। তারপর ১৯৫০ সালে দেব সাহিত্য কুটিরের সঙ্গে আলাপ এক বন্ধুর মাধ্যমেই। শিল্পী প্রতুলচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় বোলতা ছদ্মনামে বা ছদ্মছবিতেই বলা যায়, কিছু কমিকসের কাজ করছেন। এখানেই প্রথম ইলাস্ট্রেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন নারায়ণ দেবনাথ। ১৯৬২ সালে প্রথম জন্ম হাঁদা-ভোঁদার, শুকতারা পত্রিকায়। পেনসিল আর কালিতে দুই কিশোর হাঁদারাম গড়গড়ি আর ভোঁদা পাকড়াশি আর তাঁদের পিসেমশাই বেচারাম বক্সীর গল্প জনপ্রিয়তার তুঙ্গ স্পর্শ করে মাসিক শুকতারায় নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে। বাঙালির প্রথম নিজস্ব কমিক চরিত্রের প্রথম গল্পের বিষয়টিই ছিল ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ম্যাচ! একটা চরিত্রকে তৈরি করতে তন্ন তন্ন করে রেফারেন্স খুঁজেছেন শিল্পী। রেফারেন্স খুঁজতে খুঁজতে কলেজস্ট্রিটের রাস্তাতেই জন্ম নেয় নতুন চরিত্র।

১৯৬৫ সালে বাংলায় ঢুকে পড়ে আক্ষরিক ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতির সৎ মধ্যবিত্ত বাঙালি সুপারহিরো। ম্যান্ড্রেক, ব্যাটম্যান, সুপারম্যানদের অপার্থিব ক্ষমতার পাশে বিশাল চওড়া বুক, ততটাই সরু কোমর, গোলাপি স্যান্ডো গেঞ্জি আর কালো হাফপ্যান্টের সুপারহিরো বাঁটুল দি গ্রেট। বাঁটুল যে সময় বাংলায় আসে, ভারতের বিশেষ করে বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অস্থির। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আবহে প্রকাশক সম্পাদকদের আর্জিতে নারায়ণ দেবনাথের বাঁটুল তখন ধ্বংস করছে যুদ্ধের ট্যাঙ্কার, যুদ্ধবিমান গুঁড়িয়ে দিচ্ছে নিমেষে। শত্রুপক্ষের কোনও গুলিই বাঁটুলের ছাতি ভেদ করতে পারে না। যে ছাতিতে আটকে রয়েছে একাধিক প্রজন্মের কৈশোর, একাধিক প্রজন্মের মূল্যবোধ, একাধিক প্রজন্মের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।

১৯৬৯-এ হাঁদা-ভোঁদার মতোই দুই চরিত্র নন্টে ফন্টের জন্ম। কিশোর ভারতী পত্রিকায় নিয়মিত প্রকাশ হতে হতেই নন্টেফন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাদের হস্টেল জীবন। হস্টেলে টিকে থাকার রাজনীতি, সুপারিন্টেন্ড্যান্ট স্যার আর ঠাকুরের সঙ্গে বোঝাপড়া। বাড়ির আরাম পেরিয়ে যারা হস্টেল বা মেসের ঘুপচিতে গিয়েছে বাঙলার সেই সমস্ত পড়ুয়াদের কাছে নন্টে-ফন্টের নস্টালজিয়া কোনও দিন বুড়ো হতেই পারে না। কমিকসের মূলে কি নীতিশীক্ষাই প্রবল নয়? কেল্টুদাদের শয়তানি, যে কেল্টু কখনও জেতে না, হাঁদা বারে বারে ভোঁদাকে বিরক্ত করতে চেয়ে যে নিজেই অপদস্থ হয় এর মাঝে কি কিশোরবেলার ছানাপোনাদের কোনও মূল্যবোধের গল্প নেই? আছে কী না নিশ্চিতভাবে হয়তো জানতেন না নারায়ণ দেবনাথও। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি কেবল বাচ্চাদের দেখাতে চেয়েছিলাম জয় পেতে হলে তোমাকে ভোঁদার মতো ভালো এবং স্মার্ট হতে হবে। হাঁদা যে জিতেছে এমন গল্পও রয়েছে অনেক। কিন্তু কখনই তা ভোঁদার ক্ষতি করে নয়।”

এই চরিত্রের পাশাপাশিই বাহাদুর বেড়াল, ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু, সুটকি-মুটকি, পেটুক মাস্টার বটুকলালের মতো চরিত্রদের এনেছেন নারায়ণ দেবনাথ। কিশোর ভারতীতে গোয়েন্দা গল্প ব্ল্যাক ডায়মন্ড রহস্য এবং গোয়েন্দা ইন্দ্রজিৎ রায় প্রকাশ পায় ১৯৭০ সালে। জন্মশতবর্ষে রবিঠাকুরের ছোটোবেলা নিয়ে বিমল ঘোষের রবি ছবির ইলাস্ট্রেশনের কাজ করেছিলেন তিনি। স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে রাজার রাজার ইলাস্ট্রেশনের নেপথ্যেও এই শিল্পী। বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী উপন্যাসের ইলাস্ট্রেশন ‘চিত্রে দুর্গেশনন্দিনী’ দিয়ে বাংলায় গ্রাফিক নভেলের কাজে এক অন্য ঘরানার জন্ম দিয়েছিলেন নারায়ণ দেবনাথ।

দীর্ঘকাল রোগভোগের পরে বাঙালি কমিকসের সম্রাটের সফর শেষ হল ১৮ জানুয়ারির সকালে। সম্প্রতি হাসপাতালেই নারায়ণ দেবনাথের হাতে তুলে দেওয়া হয় পদ্মশ্রী সম্মান। এর আগে ২০১৩ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার এবং বঙ্গ বিভূষণেও সম্মানিত হয়েছেন কমিকস শিল্পী। চেয়েছিলেন, তাঁর চলে যাওয়ার পরে আর যেন বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা নন্টে-ফন্টেদের গল্প অন্য কেউ না লেখেন, অন্য কোনও শিল্পী যেন এই চরিত্রদের আর না আঁকেন। নিজের তৈরি চরিত্রদের সঙ্গে করে, একটা আস্ত ছোটোবেলাকে নিয়ে চলে গেলেন নারায়ণ দেবনাথ, এই শীতে।

লিখেছেন
Madhurima Dutta
Madhurima Dutta
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।