সত্যজিতের ছবি থেকে হালের দেবদাস, প্রতিটি মুদ্রায় রয়ে গেলেন বিরজু মহারাজ

কালো মুক্ত আকাশের পর্দায় হলুদ বিকিরণ ছড়িয়ে যাচ্ছে। নক্ষত্র নেচে চলেছেন। তিন দোস্ত বচপন, জওয়ানি, বুঢ়াপা—মুদ্রায় মুদ্রায় ফুটে উঠছে। ফুটে উঠছে জীবনের কত কী অভিব্যক্তি। সেই মুদ্রা সেই চলন সেই লয় সেই নৃত্য, যা দেখে রবিশঙ্কর বলেছিলেন, “তুমি তো লয়ের পুতুল!” দোস্তির হাত কি তবে ছুটে গেল? শাঁওলি মিত্র চলে যাওয়ার আঘাত বাঙালির মননে যে চাপ ধরা নৈঃশব্দ রেখে গিয়েছিল, তা আরো ঘনিয়ে উঠল বুঝি। গতকাল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন বিরজু মহারাজ। বয়স হয়েছিল ৮৩।

রবিবার রাতে খেলছিলেন নাতির সঙ্গে। হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন। অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিল্লির সাকেত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়। কিডনির অসুখে জর্জরিত ছিলেন বেশ কিছু সময় ধরে। ডায়ালিসিস চলছিল। অবশেষে ভারতবর্ষের নৃত্যশিল্পের এক অধ্যায় শেষ হল।

মহারাজের জন্ম ১৯৩৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি লখনউয়ের এক নামী কত্থক শিল্পী পরিবারে। জন্মসূত্রে পাওয়া নাম ব্রীজমোহন মিশ্র। কিন্তু সেই নামের বেড়া ভেঙে মানুষের অত্যন্ত কাছের শিল্পী হয়ে উঠেছেন বিরজু। গুরু ছিলেন তাঁর বাবা আচ্ছন মহারাজ। দুই কাকা শম্ভু মহারাজ ও লাচ্চু মহারাজের স্নেহধন্য বিরজুর শিল্পীজীবনের শুরুটা কেটেছে বাবার সঙ্গেই, একই মঞ্চে। কালকা-বিনন্দাদিন ঘরানা ঘিরে জোড়া পায়ের বোল কৈশোরেই নামের আগে জুড়ে দিয়েছিল ‘গুরু’ উপাধি। বাবা মারা যাওয়ার পর প্রথম একক নৃত্য-পরিবেশনা কলকাতাতেই। মন্মথ নাথ ঘোষের বাড়িতে, ১৯৫২ সাল। তখন বয়েস আর কত। মাত্র চোদ্দ বছর। রামপুরের নবাবের দরবার ধন্য হয়েছিল তাঁর ও চরণের পরিবেশনায়। নাচ তাঁর জীবন। তবে তবলা আর কণ্ঠসঙ্গীতেও সমান পারদর্শী ছিলেন।

আরও পড়ুন-নাটকের পথ তীক্ষ্ণ, মৃত্যুর পথ শান্ত; ফিরে দেখা নাট্যযোদ্ধা শাঁওলি মিত্রের যাত্রাপথ

তাঁর ভাওয়ের মুদ্রা ছড়িয়ে গিয়েছে মঞ্চ থেকে বড় পর্দায়। বহু সিনেমায় মহারাজের কোরিওগ্রাফি বারবার মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। সত্যজিতের ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’-তে ওঁর নৃত্য-নির্দেশনায় দুটি গান নির্মিত হয়। ‘কানহা মে তোসে হারি’ একদিকে স্বয়ং গাইছেন খানদানি মেজাজ নিয়ে গলায়, অন্য দিকে নর্তকীর নাচের প্রতিটি মুদ্রা গাঁথা হয়ে যাচ্ছে রসিকের মনেপ্রাণে। ১৯৮৩তে ভারত সরকার মহারাজকে পদ্মবিভূষণে ভূষিত করে। কালীদাস সম্মান পেয়েছেন। এ শতাব্দীর ‘দেবদাস’, ‘বাজিরাও মস্তানি’-র নৃত্যদৃশ্য নতুন প্রজন্মের জীবনে জায়গা করে নিয়েছে। এমনকি ‘বিশ্বরূপম’ ছবিতে নৃত্য-নির্দেশনার জন্য চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন তিনি। রসিকের তিন উমর বচপন, জওয়ানি, বুড়াপা মজেছে মহারাজের নৃত্যে।

নক্ষত্রের পতন হয় না। কালো পটের চিরন্তন পর্দায় সেই জ্যোতি আলো দেখায়, জীবন জুড়িয়ে আনে। জীবন-কথক বিরজুর সেই সাবলীল ভঙ্গীমা কেড়ে আনত মনোযোগ, আপনিই। জীবনের ঘটনা জুড়ে যেত সহস্র বছরের এক নিগূঢ় সাধনার সঙ্গে। এই বুনন বিরজুর নিজস্ব। এই বুননের খুসুসিয়ত নক্ষত্রের অমলিন জ্যোতি। যে আলোর উৎস হারালেও রেশ রয়ে যায় রসিক হৃদয়ের আনাচে কানাচে। কালো অন্ধকার নৈঃশব্দের পর্দা। বিরজু মঞ্চ থেকে নেমে গিয়েছেন। এক বুক জখম নিয়ে অপার্থিব মঞ্চসজ্জার নেপথ্যে জর্জ রক্তাক্ত গলায় গাইছেন-

 মহারাজ, এ কি সাজে এলে হৃদয়পুর মাঝে...

More Articles

;