ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যাত্রা, যুদ্ধের মধ্যেও ইউক্রেনে থামেনি গান

যুদ্ধকে সঙ্গী করেই কেটে গেল ৪৫ দিন। কিন্তু এখনও মেলেনি কোনও রফাসূত্র। রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ যেন শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের বাতাসে শুধুই গোলা–বারুদের গন্ধ। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে কিভ, খারকিভ–সহ দেশের একাধিক জায়গা। জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দিয়েছে যুদ্ধ। শুরুর দিকে অনেকেই চেষ্টা করেছেন সীমান্ত পেরিয়ে অন্যত্র আশ্রয় খুঁজতে। অনেকে খুঁজেও পেয়েছেন নিরাপদ আশ্রয়স্থল, অনেকে আবার জীবনের ঝুঁকি নিয়েই থেকে গেছেন নিজের দেশে। আত্মীয়-পরিজন,স্থায়ী ঠিকানা, আদরের পোষ্যটাকে হারিয়ে তছনছ হয়ে গেছে জীবন। তবু জীবন থেমে নেই। প্রতি মুহূর্তে নতুনভাবে অন্বেষণ করতে হয়েছে বেঁচে থাকার রসদ। ইউক্রেনবাসীর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে জীবনধারণের এমন ছোট ছোট ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল।

এমনই একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, রুশ মিসাইলের হানায় চারদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে এক ভদ্রলোক বসে আছেন চেলো হাতে। হৃদয়বিদারী সুর তুলেছেন তাঁর বাদ্যযন্ত্রে। পিছনে থাকা উঁচু বিল্ডিংয়ের দেওয়াল ভেঙে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে সব ঘরগুলি। প্রায় ভেঙে পড়া ঘরগুলির একটিতে দেখা যাচ্ছে এক বৃদ্ধকে। ভাঙাচোরা ঘরের ভেতর থেকে অবশিষ্ট প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করে নিচ্ছেন তিনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল এই ভিডিও। নেট নাগরিকদের অনেকেই কুর্নিশ জানিয়েছেন এমন হার না-মানা জীবনের রূপকে। চেলোর সুর তাঁদের মনে করিয়ে দিয়েছে যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক ভয়াবহতার স্মৃতিকে। যেন রোমান পোলানস্কির ‘দ্য পিয়ানিস্ট’-এর দৃশ্য। প্রত্যেকই ইউক্রেনবাসীর পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। অন্য আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ইরপিন শহরের সাংস্কৃতিক ভবনটি পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। তছনছ হয়ে যাওয়া সেই বাড়ির সিঁড়িতে বসে আপন মনে চেলো বাজিয়েই চলেছে একটি ছেলে।

যুদ্ধের দেড় মাস কেটে গেলেও এখনও সাফল্য অধরা রয়ে গেছে রাশিয়ার। উল্টে মুখোমুখি লড়াইয়ে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইউক্রেন। রাজধানী কিভ শহরে কোণঠাসা রুশ সেনাবাহিনী। আন্তর্জাতিক এক সংবাদমাধ্যমের ভিডিও বার্তায় দেখা গেছে, শহরবাসীর অনেকেই ধীরে ধীরে নিজের বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করছেন। কিছু ক্যাফেতে মানুষের আনাগোনাও লক্ষ করা গেছে। সাধারণ জীবনে ফেরার মরণপণ চেষ্টা করছেন নাগরিকরা। যুদ্ধ শুরু হতেই দেশের অনেকে দীর্ঘদিনের জন্য আশ্রয় নিয়েছিলেন বাঙ্কারে বা বিভিন্ন বম্ব শেল্টারে। অনেকে বেরিয়ে আসছেন সেইসব জায়গা থেকে। একটি ভিডিওতে চোখে পড়েছে, ইউক্রেনের সেনাবাহিনী এই মানুষদের ড্রাম, স্যাক্সোফোন বাজিয়ে নতুন এই জীবনে স্বাগত জানাচ্ছেন। 

আরও পড়ুন: অস্ত্রেও রাশিয়াকে টেক্কা, ‘চাণক্য’ জেলেনস্কির কূটবুদ্ধির জোরে এগিয়ে ইউক্রেন

আরেকটি নাচের ভিডিও নেট-নাগরিকদের মন কেড়েছে। ভিডিওটিতে দেখা গেছে, এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও একদল ট্যাঙ্গো ড্যান্সার কিভের একটি পার্কে মিলাঙ্গো গানের তালে পা মেলাচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিও দেখে অনেক ইউক্রেনবাসীই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে খানিক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। নাচের দলের একজন সদস্য, ৪৩ বছর বয়সি ভ্যালেন্টিনা বেলইয়েভার কথায়, ‘আমাদের নাচের কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। কিন্তু সেই মুহূর্তে স্বভাবতই করে ফেলেছি। চারপাশের মানুষগুলিকে জীবিত দেখে ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল। সেনারা প্রথমদিকে একটু সাবধানতা অবলম্বন করলেও, পরে আমদের কিছু বলেনি।’ কান পাতলে এখনও যুদ্ধবিমানের সাইরেন শোনা যায়। কিন্তু জীবন তো কিছুকেই পরোয়া করতে চায় না। তাই যুদ্ধের মধ্যেও, এমনভাবেই বোধহয় জীবন জিতে যায়। 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার শেয়ার করা ছবিতে দেখা মিলছে এক মহিলার। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে গ্যাস, জল, বিদ্যুতের অভাবে অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে রাস্তার ধারের আগুনে রান্না করছেন তিনি।অন্য আরেকটি ছবিতে দেখা গেছে ছোট শিশুকে সাইকেলে চাপিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন এক ভদ্রলোক। রাস্তার ধারে তখনও পড়ে বেশ কয়েকটি মৃতদেহ।

টুকরো টুকরো এই ছবিই প্রমাণ করে দেয়, ইউক্রেনবাসী সাধারণ জীবনে ফিরতে কতখানি মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এখনও পর্যন্ত খারকিভ শহরে থামেনি রুশ বাহিনীর গোলাবর্ষণ। বুকায় প্রাণ হারিয়েছেন বহু সাধারণ নাগরিক। বিভিন্ন দেশের কাছে অস্ত্র-সাহায্য চাইছেন দেশের নেতারা। এই অবস্থায় শান্তিপূর্ণ জীবনে ফিরতে নাগরিকদের আরও কতটা সময় লাগবে, তার উত্তর অধরা।

 

 

More Articles

;