মাছের কচুরি থেকে মৌরি লজেন্স, অবহেলিত হয়েও টিকে আছে কলকাতার যেসব খাবার

হারিয়ে যেতে থাকা খাবারের তালিকার মধ্যে জলখাবারের বিভিন্ন পদ থেকে কিছু বিশেষ লজেন্স অবধি সবকিছুই রয়েছে।

Raktim Dey
৪ মিনিট
মাছের কচুরি থেকে মৌরি লজেন্স, অবহেলিত হয়েও টিকে আছে কলকাতার যেসব খাবার

কলকাতায় পাওয়া যায় না, এইরকম খাবার খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সেই কলকাতাতেই গত শতকের শেষ অবধি এমন বহু জনপ্রিয় খাবার ছিল, যা বর্তমানে খুব কম দোকানে পাওয়া যায়। তাদের জায়গা নিতে শুরু করেছে নতুন ধরনের বিভিন্ন রকমের খাবার। সেই হারিয়ে যেতে থাকা তালিকার মধ্যে জলখাবারের বিভিন্ন পদ থেকে কিছু বিশেষ লজেন্স অবধি সবকিছুই রয়েছে।

বিভিন্ন রকমের নতুন স্বাস্থ্যকর খাবারের আমদানি সত্ত্বেও সকালের জলখাবারের ক্ষেত্রে কচুরি আজও জনপ্রিয়। কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় বহু কচুরির দোকান রয়েছে। সকাল হলেই সেখানে মানুষের ভিড় দেখা যায়। দাঁড়িয়ে অথবা বসে কচুরি খাওয়া থেকে বাড়ির জন্য কচুরি কিনে নিয়ে আসার লোকের ভিড় এই দোকানগুলিতে লেগেই থাকে। গত শতকের শেষ এবং এই শতকের শুরুতে বিকেলের জলখাবার হিসেবে এক বিশেষ ধরনের কচুরির বেশ চাহিদা ছিল। সেই সময় বিকেলে বহু দোকানে মাছের কচুরি পাওয়া যেত। কিছু কিছু দোকানে মাছের কচুরির সঙ্গে পাঁঠার ঘুগনি বিক্রি করা হতো। সেইসব দোকানে ক্রেতার সংখ্যা অন্যান্য দোকানের থেকে একটু বেশি থাকত। উত্তর কলকাতায় কয়েকটি দোকান শুধু মাছের কচুরি এবং পাঁঠার ঘুগনি বিক্রি করার কারণেই বিখ্যাত হয়েছিল। এই দোকানগুলোর বিশেষত্ব ছিল না তেমন, দেখানোর মতো চটক ছিল না মোটেই। বসে খাওয়ার সুন্দর ব্যবস্থা তো ছিলই না। রংবেরংয়ের সাইনবোর্ড ছিল না। শুধু ছিল মুখে লেগে থাকার মতো খাবারের মনভরানো স্বাদ। বেশিরভাগ দোকানের নাম সেখানকার সাধারণ মানুষ জানত না। দোকানের মালিক অথবা বিক্রেতা অথবা এলাকার নাম থেকেই মানুষের মুখে মুখে দোকানের একটা নতুন নাম ছড়িয়ে পড়ত। বর্তমানে সন্ধের জলখাবার হিসাবে মাছের কচুরির জনপ্রিয়তা অনেকটাই কমে গিয়েছে। সেই কারণেই বহু দোকান মাছের কচুরি বিক্রি করা বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে যেসব দোকানে মাছের কচুরি পাওয়া যায়, সেখানে কচুরির সঙ্গে আলুর দম বিক্রি করা হয়। মূল্যবৃদ্ধি, মানুষের বদলানো চাহিদা সামলে খুব সীমিত কিছু দোকান আজও মাছের কচুরি বিক্রি করে চলেছে। তার মধ্যে বিখ্যাত বাগবাজারের ভূষণের দোকান (কাশিমবাজার স্কুলের থেকে একটু এগোলেই) ও 'নীলাচল' (বসুবাটীর গলিতে ঢোকার মুখেই)। ভূষণের মাছের কচুরি এখন আট টাকা করে, অন‍্যদিকে নীলাচল-এ প্রতি পিস কুড়ি টাকা করে বিক্রি হয়।

  • আপনার জন্য আরও কিছু লেখা
চিকেন স্টু থেকে মালাই টোস্ট, আজও কলকাতার খাবারের সেরা ঠিকানা এই একচিলতে গলি

একটামাত্র গলিতে শুধু খাবারের স্বাদ, গুণমান এবং সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে দামকে সম্বল করেই ডেকার্স লেন হাসিমুখে মানুষের জন্য রকমারি খাবার পরিবেশন করে চলেছে।

কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় আজও বহু ঘুগনি-বিক্রেতা দেখা গেলেও, তাঁদের মধ্যে খুব কম বিক্রেতাই আলুকাবলি বিক্রি করেন। বহু বিক্রেতার মতে, মানুষের মধ্যে আলুকাবলির চাহিদা কমে গিয়েছে। তার বদলে পাপড়ি চাটের, ভেলপুরির মতো খাবারের চাহিদা বেড়েছে। তাই তাদের মধ্যে অনেকেই আলুকাবলি বিক্রি করেন না। এই শতকের শুরুতেও বহু মানুষ, বিশেষ করে পড়ুয়াদের মধ্যে আলুকাবলি খুবই জনপ্রিয় ছিল। আলু, মটর, ছোলা, কাঁচালঙ্কা, নুন, তেঁতুল দিয়ে মাখা আলুকাবলি স্বাদ এবং দামের জন্য হয়তো স্কুলপড়ুয়াদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয় ছিল। বর্তমানে শীতকালে আচার বিক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ার পিছনেও হয়তো মানুষের পছন্দের পরিবর্তন দায়ী। দুই দশক আগেও শীতকালে বাড়িতে বাড়িতে আচার তৈরি করা হলেও আচার বিক্রেতাদের আশপাশেই ছোট ছেলেমেয়েদের ভিড় লেগে থাকত। কাচের বয়ামে তেঁতুল, চালতা অথবা কুলের আচার বিক্রি করা বিক্রেতাদের বর্তমানে খুব কম সংখ্যায় দেখতে পাওয়া যায়।

বর্তমানে লজেন্স বলতে বেশিরভাগ মানুষ ক্যাডবেরি অথবা অন্যান্য সংস্থার চকলেটের কথা বলে। যদিও গত শতকের শেষের দিকেও ক্যাডবেরি এবং নেসলে কোম্পানির বিভিন্ন চকলেট বাজারে থাকা সত্ত্বেও অন্য বহু লজেন্স ছোটদের প্রিয় লজেন্সের তালিকায় ছিল। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মৌরি লজেন্স।বেশিরভাগ মানুষ মৌরি লজেন্স প্রস্তুতকারক কোনও সংস্থার নাম জানত না। এই ধরনের লজেন্সের কোনও বিজ্ঞাপন থাকত না। শুধু মানুষের চাহিদা এবং পছন্দ তার জনপ্রিয়তা বজায় রেখেছিল। এই মৌরি লজেন্স বিভিন্ন ভাবে বিক্রি করা হতো। তার মধ্যে অন্যতম আকর্ষক ছিল, আঙুলের মাপের প্লাস্টিকের বোতলে ভরা লজেন্স। এই প্লাস্টিকের বোতলগুলিতে অনেকসময় মানুষের পরিচিত বিভিন্ন ঠান্ডা পানীয়ের সংস্থার নাম লেখা অথবা লোগো আঁকা থাকত। ছোটরা মোটেই অবুঝ ছিল না। তারা জানত যে, ওই ঠান্ডা পানীয়র সংস্থা মোটেই এই লজেন্স বিক্রি করছে না। তা সত্ত্বেও অনেকেই ওই ছোট বোতলগুলি খুঁজত, কারণ লজেন্স শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সেই বোতল জমিয়ে বন্ধুদের দেখানো যেত। বর্তমানে বিভিন্ন নামী-দামি সংস্থার চকোলেট এবং লজেন্সের যুগে মৌরি লজেন্স নিতান্তই বেমানান হয়ে পড়েছে। তাদের কোনও বিজ্ঞাপন নেই, কোনও নামী প্রস্তুতকারক নেই, ছোটদের মধ্যে তার চাহিদা নেই। খুব অল্প কিছু দোকানে সে এককোণে অবহেলা সহ্য করে পড়ে থাকে। এই একই দশা হয়েছে ললিপপের। চিকেন ললিপপের যুগে মানুষ লজেন্স-ললিপপকে বাদ দিয়ে দিয়েছে। এই শতকের গোড়ায় বিভিন্ন দোকানে আলাদা আলাদা স্বাদের ললিপপ বিক্রি হতো। এই শতকের প্রথমে শতকের বেশ কিছু বছর একটি জনপ্রিয় সংস্থা দু'টি ভিন্ন স্বাদের ললিপপ বিক্রি করত। তারপরেই মানুষের পছন্দ এবং চাহিদার বদল ঘটে এবং ক্রমে ক্রমে ললিপপ বিক্রি খুব কমে যায়।

ভবিষ্যতে হয়তো মানুষ আবার কোনও নতুন নতুন খাবারে প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বর্তমানের বেশ কিছু সহজলভ্য খাবারকে তার পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেবে। অথবা আবার পুরনো সময়ের কিছু খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে। এই বিভিন্ন সময়ে মানুষের পছন্দের তালিকা থেকে বাদ যাওয়া খাবারগুলি এক একটা প্রজন্মের স্মৃতিতেই থেকে যাবে।

লিখেছেন
Raktim Dey
Raktim Dey
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।