দশ মিনিটে ডেলিভারি! ডেলিভারি 'বয়'-দের প্রতি আমরা কতটা মানবিক? মহুয়া মৈত্র উসকে দিচ্ছেন যে প্রশ্ন

অর্ডার দেওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই আপনার দরজায় পৌঁছে যাবে খাবার। বর্তমানে বিভিন্ন খাবার ডেলিভারি সংস্থাগুলো এই আশ্বাস দিয়েই গ্রাহক-সংখ্যা বাড়ানোর পথে হাঁটছে। খাবার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় যে কোনও পণ্য সবই এখন মেলে অ্যাপে অর্ডারের মাধ্যমে। আর সেখান থেকেই শুরু প্রতিযোগিতা। কে কার আগে গ্রাহকদের দরজায় খাবার পৌঁছে দিতে পারবে, তা হচ্ছে প্রতিযোগিতার বিষয়। কিন্তু এই পণ্য বা খাবার পরিবহনের দায়িত্বে যাঁরা, সেই ডেলিভারি বয়দের কথা ভাবছে না কোনও সংস্থাই। এই দশ মিনিটের চ্যালেঞ্জ নিতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে ডেলিভারি বয়দের।

ডোমিনোজ থেকে শুরু করে জোম্যাটোর মতো বিখ্যাত খাবার ডেলিভারি সংস্থাও ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে গ্যারান্টিড ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাজার ধরতে চাইছে। ব্যবসার খাতিরে সংস্থাগুলোর এই নীতি নিয়েই এবার সরব হয়েছেন কৃষ্ণনগরের তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। নিজেদের ব্যবসায়িক লাভের জন্য একদল নিরীহ মানুষদের কেন কোম্পানিগুলো ব্যবহার করবে, সেই নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মহুয়া। এই প্রসঙ্গে একটি টুইটে মহুয়া মৈত্র লিখেছেন, "১০ মিনিটে ডেলিভারির এই ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত বা একেবারে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। ট্রাফিক আইন ভেঙে, নিজের এবং অন্যের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে ডেলিভারি বয়দের দিয়ে এই ধরনের কাজ কোনও সভ্য সমাজে চলতে পারে না।আমাদের এই সবকিছু তাড়াতাড়ি চাই কেবলমাত্র দ্রুত পিৎজার জন্য- এটা খুবই খারাপ বিষয়। আমি এই বিষয় নিয়ে সংসদের আগামী বাদল অধিবেশনে কথা বলব।"

গত মার্চ মাসেই জোম্যাটো দশ মিনিটে খাবার ডেলিভারি করার কথা ঘোষণা করে। জোম্যাটোর এই দশ মিনিট ডেলিভারি নীতি নিয়ে বিরোধিতায় সরব হয় গোটা দেশ। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ডেলিভারি বয় দের ওপর এইভাবে দশ মিনিটের ডেডলাইন চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনার বিরোধিতা করে। তখন সংস্থার তরফে জোম্যাটোর সিইও দীপিন্দর গয়াল বিতর্ক থামাতে বিবৃতি দিয়ে জানান যেসব এলাকায় খাবারের চাহিদা বেশি শুধু সেসব এলাকাতেই এই দশ মিনিটের নীতি মেনে চলবে জোম্যাটো। গয়ালের এই বিবৃতির পর ও কিন্তু থামেনি বিতর্ক। ঠিক কী জাদু বলে একজন ডেলিভারি বয় ব্যস্ত শহরগুলির রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে দশ মিনিটে খাবার পৌঁছে দেবে গ্রাহকের দরজায় এর কোনো সঠিক দিশা দেখাতে পারেনি জোম্যাটো।

 

আরও পড়ুন: সামান্য মদ্যপানও ডেকে আনতে পারে চরম ক্ষতি, বলছে নতুন গবেষণা

 

ডেলিভারি বয়দের জীবন


আমরা যদি কেবল ভারতের পরিসংখ্যান ধরি, তাহলে বর্তমানে এখানে ৩০ থেকে ৪০ লাখ ছেলে ফুড ডেলিভারির পেশায় আছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা পরিবারের একমাত্র রোজগেরে সদস্য। দিনে ১৫ ঘণ্টার বেশি সময় ডিউটি। বিনিময়ে যে অর্থ আসে, তাতে আজকের বাজারে সংসার চালানো মুশকিল। একটি সমীক্ষা বলছে, ডেলিভারি বয়দের মাসিক রোজগার ১৫০০০ থেকে ২০০০০। যেদিন কাজ করতে পারবেন না কোনও ডেলিভারি বয়, সেদিন তাঁর বেতন বন্ধ। ডেলিভারি বয়দের ক্ষেত্রে নেই কোনও ছুটি। ঝড়, জল, বৃষ্টি, রোদ যে কোনও পরিস্থিতিতেই খাবার পৌঁছে দিতে তাঁরা সংস্থার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে। আর পাঁচটা চাকরির মতো বোনাস মেলে যখন সেই ডেলিভারি বয় দুর্গাপুজো থেকে ইদ- যে কোনও উৎসবের দিনে ডেলিভারির কাজ করে।

আবার সংস্থার আদেশ না মানলে ঘাড়ে ঝুলছে জরিমানার খাঁড়া। সপ্তাহে পাঁচটা অর্ডার রিজেক্ট হলে সেই ডেলিভারি বয়কেই নিজের পকেট থেকে ৫০০ টাকা দিতে হয় তাঁর সংস্থাকে। সংস্থার বলে দেওয়া পোশাক না থাকলে আরও ৫০০ টাকা জরিমানা। এই রিস্ক ফ্যাক্টর মেনেই প্রত্যেকদিন কাজ করতে হয় ডেলিভারি বয়দের। আবার দ্রুত খাবার ডেলিভারি করতে গিয়ে দুর্ঘটনা তো আছেই। অনেক সময় চাকরির খাতিরে দ্রুত ডেলিভারি দিতে গিয়ে ট্রাফিক ভেঙে জরিমানার মুখেও পড়তে হয় ডেলিভারি বয়দের। এতকিছুর পরেও নেই চাকরির কোনও নিরাপত্তা। জোম্যাটো, সুইগি থেকে শুরু করে বিগ বাস্কেট, গ্রফার্স, উবের ইটস- সব ফুড ডেলিভারি সংস্থাই তাঁদের ডেলিভারি বয়দের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করে। সংস্থার অ্যালগরিদম বাড়াতে না পারলে চাকরি থেকে বসিয়ে দেওয়া হয়। এইসব ঝুঁকি মাথায় নিয়েই আমার-আপনার বাড়িতে বাড়িতে খাবার পৌঁছতে যায় ডেলিভারি বয়রা। এই বিষয়ে এখনও অবধি নেই কোনও সরকারি নিয়ম। মহুয়া মৈত্রর আশ্বাসে কি বদলাবে ডেলিভারি বয়দের জীবন? উত্তর দেবে সময়।

More Articles

;