সামান্য মদ্যপানও ডেকে আনতে পারে চরম ক্ষতি, বলছে নতুন গবেষণা

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য বলছে, অত্যধিক অ্যালকোহল গ্রহণের ফলে বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশের আগেই হার্ট নষ্ট হতে শুরু করে।

Piya Saha
৩ মিনিট
সামান্য মদ্যপানও ডেকে আনতে পারে চরম ক্ষতি, বলছে নতুন গবেষণা

অ্যালকোহল স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর, একথা সকলেরই জানা। তবে অনেকে মনে করেন, সীমিত মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ করা একেবারেই নিরাপদ। এতে শরীরের কোনও ক্ষতি হয় না। কিন্তু সদ্য-আয়োজিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে নতুন তথ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, পুর্বানুমানের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে হার্টের ক্ষতি করে অ্যালকোহল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ইউরোপের দেশগুলোতে অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণ অত্যধিক বেশি। ক্ষতিকারক প্রভাবের কথা জানা সত্ত্বেও এখানকার মানুষ তা উপেক্ষা করেই অ্যালকোহল পান করছেন দীর্ঘদিন ধরে। ইউরোপিয়ান সোসাইটি অফ কার্ডিওলজি-তে এই গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার খুঁটিনাটি

নতুন এই গবেষণার জন্য ৪০ বছরের ৭৪৪ জন মানুষকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগ মানুষেরই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং অতিরিক্ত ওজন সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে। এই ধরনের মানুষের মধ্যে হার্টের সমস্যার প্রবণতা বেশি থাকে। পরীক্ষার জন্য এঁদের প্রত্যেককে ১০ গ্রাম করে অ্যালকোহল দেওয়া হয়েছিল। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত এক চিকিৎসক বলেছেন, আগে মনে করা হতো সীমিত মাত্রায় অ্যালকোহল পান করলে শরীরের কোনও ক্ষতি হয় না। তবে এই গবেষণায় বলা হয়েছে, ঠিক কত অ্যালকোহল শরীরের পক্ষে নিরাপদ, তা নির্ধারণ করা কঠিন।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস ও পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বেশ কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে প্রতিদিন ও সাপ্তাহিক অ্যালকোহল গ্রহণ এবং কম ও অতিরিক্ত মাত্রায় অ্যালকোহল পানের ক্ষেত্রে ভিন্ন গ্রুপ ছিল। পরীক্ষার পর দেখা গেছে, অত্যধিক মাত্রায় অ্যালকোহল পানের ফলে মোট ২০১ জন ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা যথেষ্ট উদ্বেগজনক।

একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩৫৬ জন ব্যক্তি কম পরিমাণে অ্যালকোহল গ্রহণ করেন এবং ১৮৭ জন সীমিত মাত্রায় অ্যালকোহল পান করেন। দেখা গেছে, যে কোনওভাবেই অ্যালকোহল গ্রহণ শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা থাকা ব্যক্তিরা যদি অ্যালকোহল গ্রহণ করতে থাকেন, তবে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা ৪.৫ গুণ বেড়ে যায়। পরিমিত মাত্রায় হলেও অ্যালকোহল গ্রহণের কোনও উপকার নেই। প্রতি সপ্তাহে ৭০ গ্রাম বা তার বেশি পরিমাণে সুরা পান করলে হার্ট ফেলিওরের আশঙ্কা বাড়ে। তাই যত দ্রুত সম্ভব মানুষের উচিত, অ্যালকোহল গ্রহণের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, আয়ারল্যান্ডের মানুষের মধ্যে হার্টের সমস্যার পরিমাণ বেশি। তাই ওই দেশের সরকারের উচিত অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণ বেঁধে দেওয়া। এই পরিমাণ প্রতি সপ্তাহে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ক্ষেত্রে ১৭ ইউনিট এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ১১ ইউনিট হওয়া উচিত।

অ্যালকোহল গ্রহণ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের জন্য কতখানি ক্ষতিকারক?

তবে শুধু কিন্তু হার্ট নয়, অ্যালকোহল গ্রহণ শরীরের অন্যান্য অঙ্গের জন্যও ক্ষতিকারক হতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, অত্যধিক মাত্রায় অ্যালকোহল গ্রহণ করলে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। এই ট্রাইগ্লিসারাইড অতিরিক্ত কোলেস্টরলের সঙ্গে (কম ঘনত্ব বা বেশি ঘনত্বযুক্ত) যুক্ত হয়ে হার্টের ধমনির দেওয়ালে ফ্যাট হিসেবে জমতে থাকে। ফলস্বরূপ, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন অ্যালকোহল অ্যাবিউস অ্যান্ড অ্যালকোহলিজম-এর মতে অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে যে যে সমস্যা হতে পারে, সেগুলি হল:

• অ্যালকোহলিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি: এক্ষেত্রে হার্টের আকার বেড়ে যায় এবং পেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে, ঠিকভাবে হার্টে রক্ত চলাচল হতে পারে না।

• অ্যারিথমিয়াস: যে ব্যক্তি এই অসুখে আক্রান্ত হন, তাঁর হার্টবিট খুব বেশি বা খুব কম হয়ে যায়। ফলে সমস্যা দেখা দেয়।

• স্ট্রোক: কোনও ব্যক্তির স্ট্রোক হওয়ার অর্থ রক্ত ঠিকভাবে মস্তিষ্কে প্রবাহিত না হওয়া বা প্রবাহপথে বাধা সৃষ্টি হওয়া। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষগুলির মৃত্যু ঘটে।

• হাইপারটেনশন: এক্ষেত্রে রক্তবাহকে রক্তপ্রবাহের সময় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। রক্তের প্রবাহপথ সরু হয়ে গেলে বা কোনও তরলের পরিমাণ বেড়ে গেলে এই রোগ হয়।

• যেহেতু অ্যালকোহলে অতিরিক্ত ক্যালোরি রয়েছে তাই মদ্যপানের ফলে শরীরে ফ্যাটের পরিমাণ বাড়তে থাকে। শরীরে ফ্যাটের পরিমাণ বাড়লে তা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। দেহের ওজন বাড়তে থাকে মদ্যপানের কারণে। হার্ট ছাড়াও লিভার, কিডনি, যকৃৎ এবং ইমিউনিটি সিস্টেমের মতো দেহের অত্যাবশ্যকীয় অংশগুলো নষ্ট হয়ে যায়।

তবে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য বলছে, অত্যধিক অ্যালকোহল গ্রহণের ফলে বাহ্যিক লক্ষণ প্রকাশের আগেই হার্ট নষ্ট হতে শুরু করে। এক্ষেত্রে তাই অনেকেরই হার্ট অ্যাটাকের পূর্বে বোঝা যায় না। নিজেকে সুস্থ রাখতে মদ্যপান ত্যাগ করতে হবে এইসব মানুষদের। সঙ্গে পুষ্টিকর ডায়েট এবং এক্সারসাইজ করতে হবে।

লিখেছেন
Piya Saha
Piya Saha
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

বিশাখাপত্তনমে গুগলের ডেটা সেন্টার: ডিজিটাল উন্নয়নের দাম দেবে জল ও পরিবেশ?

Digital Thirst of vizag ai data centres: গুগল-আদানি-এয়ারটেলের যৌথ উদ্যোগে বিশাখাপত্তনমে গড়ে উঠছে ১ গিগাওয়াটের এআই ডেটা সেন্টার, বিনিয়োগ ১.২৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু শহরের জলসংকট, কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নৈকট্য আর পরিবেশবাদীদের বিক্ষোভ এই প্রকল্পকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। 'স্টপ বিশাগ ডেটা সেন্টারস'-এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যন্ত নিষিদ্ধ করেছে ভারত সরকার।

চিনির বিকল্প স্টেভিয়া! ঘরের বাগানে রাখা যায় যে ‘মধু পাতা’

Stevia benefits: গাছ থেকে সদ্য তোলা কাঁচা পাতা কিংবা রোদে শুকিয়ে নেওয়া পাতা সরাসরি চা বা যেকোনো পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। এতে চিনির মতো একই রকম মিষ্টতা পাওয়া যায়। স্টিভিয়ার নির্যাস থেকে তৈরি মিষ্টান্ন ডায়াবেটিস রোগীরা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে।

ফুটপাথের ধারের সেই খাবার যেভাবে হয়ে উঠল কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

Kolkata Street food history: সুতানুটি-গোবিন্দপুর-কলিকাতার শ্রমজীবী মানুষের তৃপ্তির জন্য জন্ম হয়েছিল ফুটপাতের খাবারের। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের 'সংবাদ প্রভাকর' থেকে হুতোম প্যাঁচার নকশা, এফএও সমীক্ষা থেকে এফএসএসএআই আইন হয়ে ২০২৫ সালে রাসেল স্ট্রিটে প্লাস্টিক-মুক্ত ফুড হাবের জন্ম। কলকাতার স্ট্রিট ফুড আজও এই শহরের প্রাণ। এই শহরের অন্যতম ঐতিহ্য।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি কেন আরশোলার মৃত্যুতে দুঃখ পেয়েছিলেন?

Sanae Takaichi cockroach story: ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ। সরকারি বাসভবনে গভীর রাতে একা কাজ করতে গিয়ে তিনি একটি আরশোলা দেখতে পেয়েছিলেন। সচরাচর আরশোলা দেখলে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, কিন্তু সেদিন তিনি সেটিকে মারেননি।

স্ট্রেস কি সবসময় খারাপ? কখন স্বাভাবিক চাপ হয়ে ওঠে মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকি?

mental stress: একটি ইঁদুরের উপর পরীক্ষা করতে গিয়ে তারা দেখেছেন, একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ইঁদুরটির মধ্যে স্ট্রেস বাড়ানোর সঙ্গে তার কাজকর্মের মান আরও উন্নত হয়েছে। কিন্তু নির্দিষ্ট সীমা পার করবার পর পরই তার ফলাফল করার সর্বোচ্চ সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে কমতে শেষে সেটা প্রায় শূন্যতে নেমে গিয়েছে।

নিজের সর্বস্ব দিয়ে হাসপাতাল গড়েছিলেন রাধাগোবিন্দ কর

History of RG Kar Medical College and Hospital: আজ যে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল বারবার খবরের শিরোনামে, তার দীর্ঘ ইতিহাস কী? কে ছিলেন রাধাগোবিন্দ কর, যিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে গরিব মানুষের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল গড়ে তুলেছিলেন? প্লেগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞান চর্চা ও সমাজসেবায় তাঁর অবদান আজ কতটা মনে রাখা হয়েছে?

হিরোশিমা-নাগাসাকির আগুন থেকে বেঁচে যাঁরা, কেমন ছিল তাঁদের পরের জীবন?

Hiroshima, Nagasaki: বিস্ফোরণের বহু বছর পর এমিকোর ঘরে মেয়ে এল, আর তারও পর জন্ম নিল এমিকোর নাতনি কাজুমি কুওয়াহারা। নবজাতক নাতনিকে দেখে চিকিৎসকেরা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, "এই বাচ্চা তিন দিনের বেশি বাঁচবে না।" জিনের ভিতরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা দুর্বলতা যেন জন্ম থেকেই জাপটে ধরেছিল ছোট কাজুমিকে।

কেন কম ঘুমেও কেউ সুস্থ, কেউ হারাচ্ছেন স্মৃতি? জানালেন গবেষকরা

sleep deprivation and brain health: গবেষণার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে AQP4 (Aquaporin-4) নামে একটি জিন। এই জিনকে অনেকটা মস্তিষ্কের 'সাফাই কর্মী' বলা যায়। আমরা যখন গভীর ঘুমে থাকি, তখন মস্তিষ্কে শুরু হয় এক বিশেষ পরিষ্কার করার কাজ। সারাদিনে জমে থাকা বর্জ্য এবং আলঝাইমার্স রোগের সঙ্গে যুক্ত ক্ষতিকর প্রোটিন এই সময় ধীরে ধীরে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজে বড় ভূমিকা পালন করে AQP4 জিন।