সন্ধ্য়া-বুদ্ধরাই প্রথম নন, সরকারি খেতাব আগেও ফিরিয়েছে বাঙালি

rudranjan
৩ মিনিট
সন্ধ্য়া-বুদ্ধরাই প্রথম নন, সরকারি খেতাব আগেও ফিরিয়েছে বাঙালি

পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করলেন তিন বাঙালি, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং পন্ডিত অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। পদ্মভূষণ গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিবৃতির মাধ্যমে নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করেন বুদ্ধবাবু। তাঁর স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য বলছিলেন, আজীবন লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেই কাজ করে যেতে চেয়েছেন তিনি, ফলত এই পুরস্কার নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এবং অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য যদিও আলাদা। পদ্মশ্রী প্রদানে রাষ্ট্রের অতিরিক্ত কালবিলম্ব হওয়াতেই তা গ্রহণে অপারগ তাঁরা। সন্ধ্যাদেবীর কন্যা সৌমি সেনগুপ্তর অকপট স্বীকারোক্তি, নব্বই বছর বয়সে তাঁর মতো একজন লেজেন্ডকে পদ্মশ্রী দেওয়া মানে একভাবে তাঁকে অপমান করা। তিনজন খ্যাতনামা হস্তির এই অকপট প্রত্যাখ্যানের ফলে সাম্প্রতিককালে ব্যাপক তর্ক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে সামাজিক মাধ্যমে। অবশ্য বাংলার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে রাষ্ট্রীয় খেতাব ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনা সেখানে বিরল নয়। শিশির ভাদুড়ী থেকে আরম্ভ করে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, নানান কারণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি গ্রহণ করতে অসম্মত হয়েছেন অনেকেই।

১৯৫৯ সালে নাট্য ব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুড়ীকে পদ্মভূষণ পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকার। প্রায় তিরিশ বছর আগে নিউ ইয়র্কের ভ্যান্ডারবিল্ট থিয়েটারে 'সীতা' নাটকের অভিনয় করে তখন শিশিরবাবুর বিশ্বজোড়া খ্যাতি। বাংলাদেশের প্রায় সকল নাট্যাভিনেতার কাছে তিনি 'নাট্যাচার্য'। কিন্তু সকলকে অবাক করে দিয়ে শিশিরবাবু জানালেন যে পুরস্কার তিনি নিচ্ছেন না। আসলে রাষ্ট্রের কাছে পদ্মভূষণ দাবি করেননি শিশিরবাবু। চেয়েছিলেন শুধু একটা জাতীয় নাট্যশালা, যেখান থেকে জন্ম নেবেন নতুন প্রতিভারা। তাঁর কথায় কর্ণপাত করার প্রয়োজন মনে করেনি রাষ্ট্র, অতএব এই প্রত্যাখ্যানের মধ্যে দিয়েই তিনি জানিয়েছিলেন প্রতিবাদ।

শিশিরবাবুর আরও কিছু পরে ১৯৭৪ সালে পদ্মশ্রী ফিরিয়ে দেন সংগীতাচার্য তারাপদ চক্রবর্তী। 'ছায়া হিন্দোলে'র মতো রাগ সৃষ্টি করে তারাপদবাবু হয়ে উঠেছিলেন বাংলার শাস্ত্রীয় সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কোনও অনুষ্ঠানে গান গাইবার আগে তিনি যখন গ্রিন রুমে তানপুরা মিলিয়ে গলা গরম করতেন তখন দরজায় কান পেতে তাঁর রেওয়াজ শুনতেন স্বয়ং উস্তাদ আমীর খাঁ। জ্ঞান গোস্বামীর মতো শিল্পীদের হাতে বাংলা রাগপ্রধান গানের যে ধারা তৈরি হয়েছিল, তাকে সযত্নে বহন করে নিয়ে গেছিলেন তিনি। 'যদুবংশ' ছবির শুরুর দৃশ্যে মিশ্র তিলং রাগে গাওয়া তাঁর 'পূজারিণী খোলো খোলো মন্দির দ্বার' গানের অপূর্ব গায়কী আজও থেকে গেছে দর্শকের স্মৃতিতে। এমন একজন জিনিয়াসকে তাঁর জীবনসায়াহ্নে আসার পর দেওয়া হচ্ছে পদ্মশ্রী, এটা মেনে নিতে পারেননি তিনি। স্বদর্পে ঘোষণা করেছিলেন, পুরস্কার তিনি নেবেন না।

পুরস্কার নেওয়ার ক্ষেত্রে সলিল চৌধুরী বা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠেও প্রকাশিত হয়েছিল ক্ষোভ। ১৯৮৮ সালে পদ্মশ্রীর তালিকায় হেমন্তবাবুর নাম ওঠে এবং '৯২ সালে সলিল চৌধুরীর। দুজনেই পুরস্কার গ্রহণে নিজেদের অনীহার কথা জানান। দীর্ঘদিন ধরে সংগীতচর্চায় জীবন উজাড় করে দিয়েছিলেন তাঁরা। অথচ, রাষ্ট্রীয় খেতাবের তালিকায় যখন তাঁদের নাম উঠল, তখন তাঁর জীবনের প্রায় শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছেন। ফলত এই স্বীকৃতির আনন্দে মেতে ওঠার বিশেষ প্রয়োজন অনুভব তাঁরা করেননি। পদ্মশ্রী না নিলেও দুজনেই সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন।

২০১১ সালে পদ্মভূষণ ফিরিয়ে দেন সরোদশিল্পী পন্ডিত বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত। পণ্ডিত রাধিকামোহন মৈত্রর কাছে সযত্নে সংগীতের তালিম পেয়েছিলেন তিনি। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন সংগীত সাধনা। তাঁর কেদার এবং ছায়ানট শোনার অভিজ্ঞতা যাঁর হয়েছে তিনি জানেন, খাঁটি সুর কীভাবে নিজের বিস্তারে সম্মোহিত করে শ্রোতাকে। পন্ডিত অরুণ ভাদুড়ীর গলায় কমোদ শুনতে খুবই পছন্দ করতেন বুদ্ধদেববাবু, তাই ভালোবেসে তাঁর নাম দিয়েছিলেন 'অরুণ কমোদ'। আশপাশের মানুষেরা তাঁর সোজাসাপ্টা কথাবার্তার সঙ্গে ছিলেন সুপরিচিত। সরকারি খেতাব প্রত্যাখ্যান প্রসঙ্গে যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তখন তিনি বলেন, "আমার হাঁটুর বয়সি লোকজন আমার আগে পদ্মশ্রী পেয়ে গেছে। এখন যদি এই পুরস্কার আমি নিতে যাই তাহলে গানবাজনার জগতে হাসির খোরাক ছাড়া আর কিছুই হব না"।

পদ্মশ্রী বা পদ্মভূষণ, দু'টোর কোনোটাই নিতে রাজি হননি বাদল সরকার। ১৯৭২ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ২০১০ এ পদ্মভূষণ। কিন্তু তার আগে ১৯৬৮ সালেই তিনি পেয়ে গেছেন সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। এক জায়গায় সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে বাদলবাবু জানান, যে কোনও লেখকের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠতম প্রাপ্তি হল সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি। অতএব, পদ্মশ্রী বা পদ্মভূষণ তাঁর না নিলেও চলবে। ১৯৭০ সালে পদ্মশ্রী পুরস্কার ফিরিয়ে দেন প্রখ্যাত অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। যদিও, ২০০৪ সালে তিনি আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন পদ্মভূষণ। বাংলার এভারগ্রিন নায়ক সেবার জানিয়েছিলেন যে দর্শকদের ভাবাবেগে আঘাত করতে চান না তিনি, তাই নিচ্ছেন পদ্মভূষণ।

স্বীকৃতি থাকুক বা না থাকুক। শিল্পী তাঁর নিজগুণেই হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি। রাষ্ট্রীয় খেতাবই তো আর তাঁর শেষ কথা নয়। এই সূত্রেই বলা চলে, রাষ্ট্রের দেওয়া সম্মান যেমন থাকবে, তেমনই গণতান্ত্রিকভাবে তাকে প্রত্যাখ্যান করার অধিকারও থাকবে। এভাবেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বজায় থাকে বাদী-বিবাদীর ভারসাম্য।

লিখেছেন
rudranjan
rudranjan
0 Followers
column image
রৌদ্রছায়ার ফুটবল|এদোয়ার্দো গালেয়ানো: সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো-র অনুবাদ
Srikumar Chattopadhyay
Srikumar Chattopadhyay
column image
আমার মণিদাLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
দু'দশ কদম Rahul Arunodoy BanerjeeRahul Arunodoy Banerjee
column image
আশমানদারি
Aveek Majumdar
Aveek Majumdar
column image
শিখে লিখুন লিখতে শিখুন বাংলাBiswajit RayBiswajit Ray
column image
আমার সাংবাদিক জীবনRanjan BandyopadhayRanjan Bandyopadhay
column image
হাওয়াগাড়ির রূপকথাTarun GoswamiTarun Goswami
column image
তাহাদের শান্তিনিকেতনLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
পাগলের সঙ্গে যাবিLadly MukhopadhayaLadly Mukhopadhaya
column image
ঋতুপর্ণ নির্জন সিনে-মনAbhirup MukhopadhyayAbhirup Mukhopadhyay

আরও পড়ুন

২০২৫ যে শব্দগুলির সঙ্গে পরিচয় করাল

Word of the year: গুগল ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয়রা ২০২৫ সালে যেসব শব্দের অর্থ সবচেয়ে বেশি খুঁজেছে, তা তাদের মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। যেমন—সিজফায়ার অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি, মক ড্রিল অর্থাৎ নিরাপত্তার জন্য মহড়া।

জ্যোতির্ময় দত্ত: লেখালেখির বাইরে এক খ্যাপাটে মানবতাবাদী

Jyotirmoy Dutta: বামপন্থার সমালোচক ছিলেন জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর আদর্শ ছিল রবীন্দ্রনাথ ও মহাত্মা গান্ধীর মানবতা।

ঘৃণার রাজনীতি: এখন লক্ষ্য খ্রিস্টান?

Anti-Christian violence India: মিচেলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে খ্রিস্টান নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৮৩৪টি (গড়ে মাসে ৭০ টি)। ২০২৫ সালে নভেম্বর মাস পর্যন্ত নিগ্রহের ঘটনা ঘটেছে ৭০৬ টি।

এক বাঙালির জেদে জুড়ল দুই বাংলা: টেলিগ্রাফ ম্যান শিবচন্দ্র নন্দী

Seebchunder Nandy: ১৮৫১ সালে কলকাতা-ডায়মন্ড হারবার লাইনের প্রথম সংকেত প্রেরণের সময় শিব চন্দ্র নন্দী ডায়মন্ড হারবার থেকে বার্তা পাঠান, অন্য প্রান্তে ও'শাগনেসির সঙ্গে ছিলেন লর্ড ডালহৌসি।

অন্যের দুঃখে কেন আমাদের মিষ্টি হাসি? শ্যাডনফ্রয়ডার মনস্তত্ত্ব

Schadenfreude: বর্তমান যুগে এই অনুভূতি আগুনের মতো ছড়িয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে। আমরা এখন যাকে 'ট্রোলিং' বলি, তার মূলে রয়েছে এই শ্যাডনফ্রয়ডা।

দেশে দেশে নানাবেশে আছেন সে এক সান্তা ক্লজ

Santa Claus Across Cultures: ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রঙিন চিত্র সংকলনে জর্জ ওয়েবস্টার লিখেছিলেন, সান্তা ক্লজের বাড়ি "নর্থ পোলের নিকটে"।

বিপন্ন ভারতের প্রাচীন পর্বতমালা‍! যেভাবে ধ্বংসের মুখে আরাবল্লী

Aravalli Hills Under Threat: পরিবেশবিদদের মতে, আরাবল্লী কেটে ফেললে দিল্লির দূষণ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেবে।

শৈশবের ‘রিওয়্যারিং’: স্ক্রিনের নীল আলো গিলে খাচ্ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে?

Screen Addiction Destroying the Mental Health: বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল জগতে ডুবে থাকায় শিশুদের মানসিক কাঠামোর এক আমূল পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।